আরব বসন্ত ও মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্র

এক নজরে আরব বিশ্বের দিকে তাকালে মনে হবে যে রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র অধ্যুষিত এই অঞ্চলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে চলেছে। কারণ অনেকগুলো আরব দেশে ইতোমধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে । গত ৩রা জুন সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেল, সমপ্রতি মিশরেও একজন সাবেক জেনারেল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন এবং খুব সহসাই দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইরাক ও আলজেরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ক’মাস আগে। কুয়েতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে,তিউনিশিয়ায়ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের প্রথম ভাগে। আরব বিশ্বের বাহ্যিক চিত্র এমনটি হলেও বাস্তবতা যাচাই করতে গেলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হবে যে, প্রকৃত গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার ব্যাপারে আরব নেতারা এখনো আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেননি। এছাড়া এ অঞ্চলের দেশগুলোতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া একটি বিশেষ গোষ্ঠির ছলনা ও প্রতারণার বেড়াজালে আটকা পড়ে আছে। এই অঞ্চলের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোও স্বৈরাচারী ও একনায়কতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠির মূলোত্পাটন করতে সফল হয়নি। ২০১০ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্তের সময় অনেক শ্লোগান ও প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়েছিল, যার খুব সামান্যই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ঐ সময় গণতন্ত্র, মুক্তি ও সামাজিক ন্যাযবিচার প্রতিষ্ঠার যে ডাক দেয়া হয়েছিল,তা অনেকের কাছে এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে চলেছে। মিশরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা হলে দেখা যাবে, ২০১১ সালে আরব বসন্তের জোয়ারে সাবেক স্বৈরাচার হোসনি মোবারকের পতনের পর দেশটিতে দুই বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে পার্লামেন্ট ও সুপ্রিম কাউন্সিল নির্বাচন এবং গণভোট। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এত সব বাহ্যিক আয়োজন সত্ত্বেও ক্ষমতার কলকাঠি মঞ্চের আড়ালে ফৌজি কর্তাদের হাতেই রয়ে গেছে। সামপ্রতিক নির্বাচনে দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন তাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেও জনগণের গ্রহণযোগ্যতা তিনি পাননি। কারণ দেশটির বেশিরভাগ জনগণ এই নির্বাচন বয়কট করেছেন। নির্বাচনের পর সরকারি প্রচারমাধ্যম থেকে ৪৬ শতাংশ ভোট পড়ার কথা দাবি করা হয়। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, এই হার ২০ শতাংশের মতো হবে। আর বামপন্থি প্রার্থী হামদিন সাবাহি দাবি করেছেন ভোটার উপস্থিতির হার কোন ভাবেই ১৫ শতাংশের বেশি হবে না। ফলে জেনারেল সিসি খণ্ডিত মিশরের প্রেসিডেন্ট। এছাড়া মিশরের বর্তমান সংবিধানে দেশের বেসামরিক নাগরিকদেরকে সামরিক আদালতে বিচারের অধিকার দেয়া হয়েছে, যে কোন ধরণের সভা-সমাবেশ ও মিছিলের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। এ সবই গণতান্ত্রিক নীতিমালার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক । সিরিয়ায় গত ৩রা জুন মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে পুরো দেশে নয়, ভোটের এই আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল শুধু সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই। এবারের নির্বাচনে মাহের হাজ্জার এবং হাসান আল-নওরি নামের দুই অপরিচিত মুখ প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে দেশটির পশ্চিমা সমর্থিত বিরোধী দল ন্যাশনাল কাউন্সিল নির্বাচন বর্জন করেছে এবং দলটির নেতা আহমেদ আল-জেরবা ভোটের দিন সবাইকে ‘ঘরে অবস্থানের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। লিবিয়ায় মোয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর ২০১২ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের পর লিবিয়ায় নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও ফৌজি কর্তাদের মোকাবিলায় নির্বাচিত সরকার বা প্রশাসন শক্তিশালি কোন ভূমিকা পালন করতে পারেনি। অন্যদিকে আরব বসন্তের সূচনা হয় তিউনিশিয়ায়। এই দেশ থেকেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণমানুষের মনে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের আগুন দাবানলের মত গোটা আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। একমাত্র এই দেশের রাজনৈতিক নেতারা গণজাগরণের চেতনা কিছুটা হলেও হূদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছেন বলেই মনে হয়। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় মতাদর্শের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশের সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। আবার লেবানন ও ইরাককে আরব বসন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। গণজাগরণের ধাক্কা থেকে এই দেশ দুটি অনেকটাই নিরাপদে ছিল। আলজেরিয়ার গণতন্ত্রও ফৌজি কর্তাদের ও শাসক শ্রেণীর অনুকম্পা এবং স্বার্থের উপর নির্ভরশীল। গণজাগরণের ধাক্কা জর্ডান ও মরক্কোকে শঙ্কিত করলেও সেখানে সংবিধানসহ শাসন যন্ত্রে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে রাজার অবাধ ক্ষমতাকে সীমিত করার কোন উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় আরব গণজাগরণের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে চলছে আলোচনা-পর্যালোচনা। আন্দোলন কারীরা এখন যেন মোহমুক্ত হয়েছেন এবং স্তিমিতও হয়ে গেছেন। তবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাদের মনে সাহস যুগিয়েছে। অতএব,এই সচেতনতা ও সাহসকে অবলম্বন করে পথ চলা অব্যাহত থাকলে একদিন প্রকৃত গণতন্ত্র ও মুক্তি এ অঞ্চলকে উদভাসিত করবেই। লেখক : রেডিও তেহরানের সাবেক পরিচালক kmhoque¦yahoo.com