প্রশ্নপত্র ফাঁস :সমাধানে আন্তরিকতা চাই
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৪, ২১:৩২
আমাদের দেশে যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নূতন ঘটনা নহে। অতীতে এই সমস্যা রোধকল্পে যথাযথ তদন্ত বা বিচার করা হইয়াছে, তেমন উদাহরণ আমাদের সম্মুখে নাই। বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্র সবসময় ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া গিয়াছে। সত্যিকারের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কোনো সরকার না নেওয়ায় এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু নহে, প্রশ্নের উত্তর কপিও (ফটোকপি করা) ছাত্রছাত্রীদের হাতে চলিয়া যাইবার ঘটনার কথা আমরা পত্রিকান্তরে জানিতে পারিতেছি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের উত্স খুঁজিয়া বাহির করিয়া আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই চক্রকে পরোক্ষভাবে উত্সাহিতই করা হইতেছে। এই কারণে বিসিএস, মেডিক্যালে ভর্তি এবং প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসির মতো পরীক্ষাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস কী করিয়া রোধ করা যায়, তাহা লইয়া চিন্তার ও পরিকল্পনার ইয়ত্তা নাই। শিক্ষামন্ত্রী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সহিত বসিয়াছিলেন কয়েকদিন পূর্বে। নিশ্চয়ই পূর্বাপর আলোচনার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিহত করিবার একটি সুন্দর ও কার্যকর উপায় বাহির হইবে। তবে যাহারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন, তাহাদের প্রতি একটু ভিন্নভাবে দৃকপাত করা যাক। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের সবসময় খলনায়কের চোখেই দেখা হয়, এবং নিশ্চয়ই ইহা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিষয়টিকে যদি আমরা বিপরীত দিক হইতে দেখি, তাহা হইলে ইহা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হইবে না যে, যাহারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করিতে সক্ষম হন, তাহারা প্রকৃতপক্ষে প্রশ্নপত্র গোপন ও নিরাপদ রাখিবার ব্যবস্থার দুর্বল দিকটা উন্মোচন করিয়া দেন। তথ্যপ্রযুক্তির জগতে যাহারা কঠোর নিরাপত্তামূলক ওয়েবসাইট হ্যাকিং করেন, তাহাদের মেধাকে উচ্চ চক্ষে দেখা হয়। কেননা, হ্যাকিং এক ধরনের অপরাধ হইলেও এই সকল হ্যাকার কোনো সফটওয়্যার কিংবা ওয়েবসাইটের দুর্বল দিকসমূহকে চক্ষে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেন তাহা হ্যাকিং করিয়া। ফেসবুক জাতীয় অতি জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের কর্তৃপক্ষ তাহাদের নিরাপত্তা ভাঙিবার মতো মেধাবী হ্যাকারদের ঘোষণা দিয়া পুরস্কৃত করেন। ইহার মাধ্যমে তাহারা দেখিতে চান কোথায় কোথায় নিরাপত্তার গলদ রহিয়াছে। আমাদের দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস সাধারণত অ্যানালগ পদ্ধতিতে হইলেও তাহা ছড়াইয়া পড়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরিয়া। যাহারা ফাঁসের সহিত যুক্ত, তাহারাই যদি ভূত তাড়াইবার সর্ষেরূপী ভূত হয়, তাহা হইলে তাহাদের চিহ্নিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য খুব শক্ত কাজ নহে। আর যদি অন্যভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্ভব হয়, তবে বলিতে হইবে, যাহারা এই কাজ করেন, তাহারা দেখাইয়া দেন কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা রহিয়াছে। তাহার মেরামত আবশ্যক।
প্রশ্নপত্র ফাঁস হইলে যাহা হয়, বিপুল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী গভীর হতাশায় ডুবিয়া এই বার্তা আহরণ করে—অসততা ব্যতীত উন্নতি সম্ভব নহে। টিকিয়া থাকাও সম্ভব নহে। যাহারা প্রশ্নপত্র পায়, তাহারা প্রমাণ পাইল অসততা ও দুর্নীতির ভয়ানক শক্তি—যাহা তিলকে তাল করিতে পারে, যাহা অমেধাবীর গায়ে ‘তুখোড় মেধাবী’র লেবাস লাগাইয়া দিতে পারে। প্রশ্নপত্র বঞ্চিত কোনো মেধাবী ছাত্র দেখিল, কী করিয়া সত্যিকারের মেধাবীও মধ্যমানের ছাত্র হইয়া যাইতে পারে। শিক্ষাজীবনে এই পরম শিক্ষা তাহারা অর্জন করিল—দুর্নীতি ও অসততার আশ্রয় না লইলে জীবনের ষোল আনাই মিছা হইয়া যাইতে পারে।
এই বার্তাটাই ভয়াবহ। কেননা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নির্বিচারে সকলকে অসত্ ও অন্যায় পথে চলিতেও উত্সাহিত ও প্রলুব্ধ করে। এই নৈতিক স্খলনের বোঝা তখন তাহারা সারা জীবন বহন করিবে। তাহারাই যখন ভবিষ্যতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হইবে, তখনও তাহারা নৈতিক স্খলনযুক্ত কর্ম করিতে ও তাহা লালন করিতে দ্বিধা করিবে না। জাতি হিসাবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিপদের আশংকা এই জায়গাটাতেই। সত্যিকার অর্থে, আমরা যে সকল ক্ষেত্রেই ছোট-বড় নৈতিক স্খলনের দৃষ্টান্ত দেখিতে পাই, তাহার কারণও এইখানে সুপ্ত রহিয়াছে। শিক্ষার হার বাড়িয়াছে, তাহারা লইয়া যেমন সমালোচনা আছে, তেমনি তাহার সুফলতার দিকটাও তাত্পর্যপূর্ণ। শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধসহ অন্যান্য ব্যবস্থা সরকার নিশ্চয়ই আন্তরিকতার সহিত গ্রহণ করিবে।