বাবা দিবস
‘আয় খুকু আয়’
মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৪, ২১:৩৪
এই চলমান বিশ্বে বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে নানা দিবস পালন করা হয়ে থাকে এবং প্রত্যেকটি দিবস পালনের পেছনে নিগুঢ় তাত্পর্য থাকে, যা শিক্ষণীয় ও অনুসরণীয়। এই যে শিশু দিবস, মা দিবস, ভ্যালেন্টাইন ডে, মে দিবস, ইত্যাদি চলে আসছে। আর এর সাথে সমধিক গুরুত্ব নিয়ে বাবা দিবসও যোগ হয়েছে। অবশ্য অনেকে বলে থাকেন যে, বাবা তো সব সময় বাবা, তার আবার বিশেষ দিবস কি? প্রশ্নটি সঠিক হলেও, এই নিয়ামকের পিছনে চির সত্য ও রহস্য চলমান। কেননা বাবা এবং মায়ের তেইশটি করে ক্রোমোজম নিয়ে মোট ছেচল্লিশটি ক্রোমোজমের সুবাদে একটি শিশুর এই ভবে আগমন ঘটে। আর সেই সূত্র ধরে পিতা-মাতাই তো আদি শিকর এবং মেডেল’স তত্ত্বের আবর্তে ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জনপদে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, “বাপ কা বেটা”। তাছাড়া বাপের বংশের সাথে একটি সন্তানের পরিচয় অধিক বহন করে থাকে এবং আনুভূমিক সূত্র ধরে সন্তানরা সহায় সম্পত্তির মালিক হয়ে থাকে। এদিকে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার পেছনে মায়ের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এবং গুরুত্ব অধিক হলেও বাবার অবদান কম নয়। এটা সত্য যে, মায়ের মতো বাবার সাথে সন্তানের রক্তের বাধনে বাঁধা। আর মা আভ্যন্তরীণ পরিসরে পরিচর্যা করলেও, বাইরের রাহু থেকে সন্তানকে মুক্ত রাখতে বাবার বিকল্প নেই বললে চলে। আর এ কথা আমরা জোর গলায় বলতে পারি যে, বাবা ও সন্তান একে অন্যের একই রক্ত প্রবাহে প্রবাহমান। অবশ্য, এর স্বপক্ষে যুক্তি হলো, কেউ যদি বিপদ সংকুল হিংস্র জীব বা বাঘ-ভাল্লুক শিকার করতে যায়, তাহলে বাবা ও তার সন্তানসহ এক সাথে যেতে হয়। কেননা শিকারের প্রাক্কালে বাবা কিম্বা সন্তান বিপন্ন হলে সহজাত কারণেই জীবন ভয়ে কেউ ছেড়ে আসতে পারে না। এ বিষয়টি ব্যবহূত আগ্নেয় অস্ত্রের লাইসেন্সে বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে। এই তো কয়েক মাস আগে সুন্দরবনে একজন মাওয়ালী বাবা ও তার ছেলে মধু সংগ্রহের সময়, বাবা হিংস্র বাঘ দ্বারা আক্রান্ত হলেও ছেলে জীবন দিয়ে বাবাকে রক্ষা করেছে। আর এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। তাছাড়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে-সন্তানকে নিয়ে সেই বিখ্যাত গান “আয় খুকু আয়...”, আজ সারা বাংলায় একটি বাস্তবভিত্তিক কিংবদন্তী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেহেতু সন্তানের কাছে বাবা একজন দেবতা এবং এরই সূত্র ধরে বাবা দিবস প্রত্যেক সন্তানের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে থাকে। যাহোক, পিতৃ দিবস হিসেবে প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে কম বেশি পালিত হয়। এক্ষেত্রে মা দিবসের অনুকরণে পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এ দিনটি বিশেষভাবে তাত্পর্য বহন করে থাকে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ যে, “ফাদার’স ডে তথা বাবা দিবস সেলিব্রেশনের” ক্ষেত্রে দেশ ভেদে নানা বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। এ দিবসটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়। প্রায় দেশে সন্তানরা বাবাকে শুভেচ্ছা বা Wish করে থাকে। এতদ্ব্যতীত সন্তানের মানসিকতা অনুযায়ী কেউ কেউ পিতাকে কোনো না কোনো উপহার দিতে খুব পছন্দ করে। আর পিতারাও ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে গিফট পেয়ে বেশ অভিভূত হয়ে যান। আবার এ গিফট দেয়ার ব্যাপারেও দেশভেদে নানা রকম বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও ছেলে-মেয়েরা বাবাকে কার্ড বা ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে পিতৃ দিবসের শুভেচ্ছা জানায়। এদিকে কোন কোন দেশে পিতাকে ছেলে-মেয়েরা নেকটাইও উপহার দেয়। আবার অনেক দেশে পিতৃ দিবসকে ঘিরে কেক কাটার আয়োজনও করে থাকে। দেশভেদে স্বকীয় আচার-অনুষ্ঠান ও কৃষ্টির উপর ভিত্তি করে বাবা দিবস সেই আঙ্গিকে প্রতিপালিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যাই পালন করা হোক না কেন, মূলত এই দিবসে সন্তানরা তাদের স্ব স্ব মনের রাজত্বের সিংহাসনে বাবাকে বসিয়ে থাকে। এ সত্যটি আমাদের জাতীয় কবি দিব্য চোখে দেখতে পেয়েছিলেন এবং বাবা ও শিশু সন্তান এক আত্মার আত্মীয় এবং একে অন্যের ধারক ও বাহক। এক্ষেত্রে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুরই অন্তরে”।
লেখক :গবেষক