বিদায় সরদার ফজলুল করিম

চলিয়া গেলেন দার্শনিক শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শনিবার মধ্যরাত্রে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাহার বয়স হইয়াছিল ৮৯ বত্সর। বাংলাদেশের গড় আয়ুষ্কালের তুলনায় ইহা দীর্ঘ হইলেও এই মৃত্যুর শূন্যতা যে বহুদিন ধরিয়া অনুভূত হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। তাহা শুধু এই কারণে নয় যে, অর্ধশতকেরও অধিক সময় ধরিয়া দারিদ্র্যক্লিষ্ট ও পশ্চাত্পদ একটি সমাজে ক্লান্তিহীন ও নিঃস্বার্থভাবে তিনি জ্ঞানের আলো বিতরণ করিয়া গিয়াছেন, বরং মানুষ হিসাবেও তিনি ছিলেন আদর্শস্থানীয়। তিনি ছিলেন সত্যিকারের এক শিক্ষক। ছিলেন পথপ্রদর্শক। আর এই ভূমিকাটি যে, কেবল শ্রেণিকক্ষ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না তাহাও অবিদিত নহে। এই কথা সত্য যে, সকল সমাজেই মেধাবী মানুষ আরও অনেকেই আছেন, তবে সরদার ফজলুল করিমের মধ্যে মেধা, মনুষ্যত্ব ও দেশাত্মবোধের যেই অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়াছিল তাহার উদাহরণ সর্বদাই অতি অল্পই বলা যায়। বস্তুত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ হইতে শুরু করিয়া বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ অবধি সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়িয়া মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার যে মশাল প্রজ্বলিত হইয়াছিল এবং যাহারা ‘সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং’-এর আদর্শকে শিরোধার্য করিয়াছিলেন, সরদার ফজলুল করিম ছিলেন তাহার বা তাহাদের যথাযোগ্য উত্তরসূরি। সরদার ফজলুল করিমের জন্ম ১৯২৫ সালে—বরিশালের উজিরপুর উপজেলার আটিপাড়া গ্রামে। মাধ্যমিক পর্যন্ত সেইখানেই লেখাপড়া করিয়াছেন। সাধারণ পরিবেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হইয়াও যে অসাধারণ হওয়া যায়—স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করিয়া সেই দৃষ্টান্তও স্থাপন করিয়া গিয়াছেন তিনি। দর্শন বিভাগের প্রভাষক হিসাবে কর্মজীবনের শুরু করিয়াছিলেন ১৯৪৬ সালে। কিন্তু মাত্র এক বত্সরের ব্যবধানেই স্বেচ্ছায় সেই চাকুরীতে ইস্তফা দিয়াছিলেন রাজনীতির প্রয়োজনে। রাজনীতির জন্য ইহাই একমাত্র ত্যাগ স্বীকার নহে, বার বার কারাবরণ করিয়াছেন। প্রায় একটি যুগ কাটাইয়া দিয়াছেন কারার অন্তরালে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছেন ভাষা আন্দোলন হইতে মুক্তিযুদ্ধ অবধি স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে। স্বাধীনতার পর আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়াছিলেন শিক্ষক হিসাবে। তবে দর্শন নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী—উভয় ক্ষেত্রেই সাদামাটা ও নিরহঙ্কার এই মানুষটির অনন্য মেধা ও নিষ্ঠার উজ্জ্বল নিদর্শন হইয়া আছে তাঁহার রচিত ও অনূদিত গ্রন্থাবলি। তন্মধ্যে প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট, এ্যাঙ্গেলসের অ্যান্টি ডুরিং, পাঠপ্রসঙ্গ, চল্লিশ দশকের ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ এবং দর্শনকোষ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তি সরদার ফজলুল করিম চলিয়া গিয়াছেন। রাখিয়া গিয়াছেন তাঁহার অসামান্য কর্ম এবং অনন্য জীবনাদর্শ। কর্মের মধ্যেই তিনি বাঁচিয়া থাকিবেন—এই কথা যেমন সত্য, তেমনি মানুষ হিসাবেও যে তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রেরণার উত্স হইয়া থাকিবেন তাহাও নিঃসংশয়ে বলা চলে।