[ শ্র দ্ধা ঞ্জ লি ]

প্রিয় শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম

১৯৬৮ সালের কথা। বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে জেলা ভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এতে আমি পটুয়াখালী জেলায় প্রথম হই। যথারীতি বাংলা একাডেমীতে পুরস্কার নিতে আসতে হয়। সেখানে আমি একজন সরদার ফজলুল করিমের সাথে পরিচিত হই। পরিচয় তো খুব সামান্য। যা অসামান্য তা হচ্ছে তার এবং কবীর চৌধুরীর যৌথ স্বাক্ষরে আমাদের দেয়া সনদপত্র। বাবা সে সনদপত্র বাঁধিয়ে টানিয়ে রেখেছিলেন। আমার বড় ভগ্নিপতি সে সনদপত্রে তার নাম দেখে আমাকে বললেন সরদার সাহেব এই গলাচিপাতেই (পটুয়াখালীর সাগর পাড়ের উপজেলা) বেশ কিছুটা সময় ছিলেন। কিভাবে ছিলেন? তাঁর এক ভাই এখানে সাবরেজিস্ট্রার ছিলেন। তার কাছে থেকেই তিনি পড়াশুনা করতেন। ভগ্নিপতি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে তাঁর সম্পর্কে জানতেন। স্মৃতিধারণ করে তিনি বল্লেন, কৈশোরেই তিনি রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাঁর ছিল সহজ-সরল যাপিত জীবন। অতিসাধারণ দামের জামা, ছেঁড়া পাজামা, পায়ে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। কৈশোরের ভাবালুতায় আমার মন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল সেই সরদার ফজলুল করিম। ১৯৭৩ সালে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। একদিন ক্লাসে এলেন অতিসাধারণ হালকা-পাতলা গড়নের একজন মানুষ। পরিচয় দিলেন তিনি সরদার ফজলুল করিম। প্রথম ক্লাসেই তার আলো ছড়ানো কথায় মুগ্ধ হলাম। কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করলাম। আমি বললাম আমার বাড়ি গলাচিপা। তিনি উত্সুক হলেন। আমার ভগ্নিপতির নাম বললাম। তিনি গভীর আবেগের সাথে এক এক করে সকল প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের নাম ধরে জিজ্ঞাসা করছিলেন, তারা কেমন আছেন। আমি অবাক হলাম তার তালিকা থেকে ক্ষেত-মজুর আসমত ভাইয়ের নামও বাদ যায়নি। ছোট্ট শহর গলাচিপার প্রবৃদ্ধির খবর নিলেন। আর সি ও অফিসের সেই রেনট্রিটি এখনও আছে কিনা - সেই স্টীমার চলে কিনা খবর নিলেন। পরে আমি একবার হাজির করলাম আমার সেই ভগ্নিপতিকে কলা ভবনের টিচার্স লাউঞ্জে। গল্প করলেন দুজনে। পরে তার আরও কাছাকাছি হতে গিয়ে দেখেছি লেখাপড়ার ব্যাপারে তিনি যতটা আগ্রহী ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততায় তাঁর অত আগ্রহ ছিল না। এবার ক্লাসের কথা বলি। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রদর্শনের মত ক্লাসিক্যাল বিষয়ে অধ্যাপনা অত সহজ নয়। বিষয়টির প্রতি তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা আমাদের বিস্মায়িত করতো। ততদিনে তাঁর অনুদিত রিপাবলিক বেরিয়েছে। যে অসামান্য পাণ্ডিত্যে অসাধারণ ধীশক্তি রিপাবলিকে অনুরণিত হয়েছে তারই প্রতিফলন ঘটতো তাঁর বক্তৃতায়। আমার মনে পড়ে না তিনি ক্লাশে আসতে ১মিনিট দেরি করেছেন অথবা নির্ধারিত ক্লাস নেননি। পড়াতে গিয়ে এতই আবিষ্ট হতেন যে আমরা মজা করে তাকেই বলতাম প্লেটো। জাহাঙ্গীরনগরের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে প্রথম থেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রাষ্ট্রদর্শন পড়িয়ে আসছি। সরদার ফজলুল করিম সে ক্ষেত্রে আমার মডেল। আমার প্রেরণার উত্স। তিনি বলতেন সিনসিয়ার শিক্ষকের অনেক দায়। শিক্ষক হয়েছো সিনসিয়ার হয়ে সব সময় থেকো। সরদার স্যার এক সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিকী অনুষদে খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকের শিক্ষককে ক্লাসে নিতে ভুল করিনি। অনুরোধ উপরোধ করে জটিল বিষয়কে উপস্থাপনের জন্য এক এক সময় আমার ছাত্রদের সামনে উপস্থিত করতাম। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত আমার লেখা ‘পাশ্চাত্য রাষ্ট্রদর্শন’ বইটি সালাম করে তাঁর হাতে দেই। তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। আমি সরদার ফজলুল করিমের পিছু ছাড়িনি। ফুলার রোডের বাসায় দেখেছি তাঁর নিরাভরণ জীবন। অস্বাভাবিক সন্তানের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। শিক্ষাজীবন শেষে তাকে খুঁজে পাই মধুবাগের বাসার চিলে কোঠায় অসংখ্য বইয়ের মাঝে ডুবে থাকতে। অভিমানের সময়টায় তিনি যখন এক রকম অজ্ঞাত বাস করছিলেন তখন সেখানে আমাকে দেখে অবাক হয়েছিলেন তিনি। যখন শুনেছি কোথাও সরদার স্যারের উপস্থিতি - এশিয়াটিক সোসাইটি অথবা স্যার যদুনাথ সরকার হলে - মুখোমুখি হয়েছি। জীবন শেষে ভুলে যেতেন অনেককিছু। প্রতিবারেই বলতে হতো- স্যার! আমি লতিফ। তিনি উত্তর করতেন ও গলাচিপার লতিফ। জীবন সায়াহ্নে প্রতিটি অনুষ্ঠানে-জন্মদিনে অথবা সংবর্ধনা সভায় বলতেন; আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞাসা করে আপনি কেমন আছেন? তখন আমি বলি কেমন এর ‘ম’টি বাদদিয়ে বলুন কেন আছি? অতিসাধারণ জীবনযাপনের কারণে সাধারণ মেহনতি মানুষের কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। তার থেকে শোনা গল্প, তিনি রিকশায় যাচ্ছেন কেউ হয়তো তাকে পা ছুঁয়ে সালাম করে চলে যাচ্ছে। জনারণ্যে তার পরিচয় পেয়ে লোকেরা যখন তার প্রশংসা করতেন তখন তিনি সঙ্কুচিত হতেন। তার কাছ থেকে শোনা একটি গল্প এ রকম : ষাটের দশকে পাকিস্তানী শাসকদের হুলিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এক বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। ভোর রাত্রে বাড়ি ঘেরাও হলো। তাকে ড্রয়িংরুমে আনা হলো। পাকিস্তানী অফিসার পাঠান টাইপের ‘ইয়াবরা’ যে সর্দারজীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাঁকে দেখে সন্দেহ পোষণ করলেন। স্যারও সে সন্দেহের পুরো সুযোগটা নিলেন। বললেন: ‘মাইনে ফজলুল করিম হ্যাঁ। লেকিন সর্দার ফজলুল করিম নেহি হ্যায়।’ মোটা বুদ্ধির পাঠান চলে গেল। স্যারও ভেগে গেলেন। পাঠানরা আবার যখন নিশ্চিত হয়ে ফেরত এলো- তখন ‘পাখী ফুরুত’। তিনি কৈশোর থেকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত স্বকীয় আদর্শ ও বিশ্বাসে দৃঢ় ছিলেন। বিরল মেধার অধিকারী হিসেবে ১৯৪৮ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। ঢাকা কলেজ থেকে দ্বিতীয় স্থান দখল করে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সমাদৃত বিষয় দর্শনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স উভয় ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করেন। ১৯৪৮ সালে যোগদেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময়ে কমিউনিস্টদের প্রতি পাকিস্তান সরকারের দমনপীড়ন বেড়ে গেলে পার্টির নির্দেশে চাকরি ছেড়ে দেন। আজীবন কমিউনিস্ট এ মহান শিক্ষক কখনও পার্টির নির্দেশনার বাইরে যাননি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কমিউনিস্টদের সঙ্কট সময়ে অন্যদের মত তিনি সুবিধেজনক অবস্থান গ্রহণ করেননি। নিজ আদর্শ অনুসরণ করতে গিয়ে ১১বছর কারাবরণ করেন। এসব নিপীড়ন নির্যাতন সত্ত্বেও কখনই থেমে থাকেনি তার জ্ঞান সাধনা। দর্শনের দুরূহ টেক্সট বুক অনুবাদে বাংলা সাহিত্যে তার অবদান কালজয়ী। বিশেষত তাঁর অনুদিত প্লেটোর রিপাবলিক এক অনবদ্য সৃষ্টি। অনন্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে, এরিস্টটলের পলিটিক্স, প্লেটোর সংলাপ, এঙ্গেলস-এর এন্টিডুরিং, রুশোর সোস্যাল কন্ট্রাক্ট এর বাংলা অনুবাদ। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ হচ্ছে নানা কথা, নানা কথার পরের কথা, নূহের কিশতি ইত্যাদি। মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর পটভূমি রচনায় তার ছিল দার্শনিকের ভূমিকা। ফরাসী বিপ্লব রচনায় যেমন রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা তেমনি আমাদের দেশের যেসব বুদ্ধিজীবী লেখনির মাধ্যমে আমাদের স্বাধীকারের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছিলেন সরদার ফজলুল করিম তাদেরই একজন। ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক সংগ্রামের কিশোর ফজলুল করিম লড়াইয়ে নেমেছিলেন, পরবর্তীকালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তিনি তাত্মিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা রাখেন। দেশ বিভাগের পরবর্তীকালে যুব সমাজকে প্রগতিশীল আন্দোলনে এবং যুক্তফ্রন্ট পরবর্তী সাংবিধানিক সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। আমরা অনেকেই জানি না যে, তিনি ঊনিশ শ’ ছাপ্পান্ন সালে পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য ছিলেন। এই সময়ের কায়েমি স্বার্থবাদ বিরোধী সংগ্রামে সকল গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিকে পূর্ব বাংলার সপক্ষে ঐক্যবদ্ধকরণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ঊনিশ শ’ ছাপ্পান্ন থেকে একান্তর সাল পর্যন্ত নিরন্তরভাবে তিনি স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি রচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এই সময় তিনি বারবার কারাবরণ করেন। ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জনের পরই তিনি মুক্তিলাভ করেন। আমার প্রিয় শিক্ষকের মূল্যায়নের ভিত্তি হচ্ছে তাঁর জ্ঞান ও মনীষা। তাঁর জীবন সাধনা দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন ‘নলেজ ইজ পাওয়ার, নলেজ ইজ ভার্চু’ জ্ঞানই শক্তি জ্ঞানই পুণ্য। একজন শিক্ষকের বড় কীর্তি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানানুবর্তি করা। আমার মত নগণ্য ছাত্রের মধ্যেও তিনি ‘দার্শনিকতা সঞ্চারিত’ করতে পেরেছেন আমার জীবনে এর চেয়ে পরম সম্পদ আর কিছু নেই। জীবনানন্দকে অনুকরণ করে বলা যায়, ‘সকলেই শিক্ষক নয় কেউ কেউ শিক্ষক’। তিনি এক মহান শিক্ষক নি:সন্দেহে। আজকে বাংলাদেশে যখন জ্ঞান চর্চার আকাল, তখন সরদার ফজলুল করিম হতে পারেন আমাদের শিক্ষককূলের অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ। রাজনীতিকরা পেতে পারেন তাঁর থেকে নিপীড়ন নির্যাতনে আদর্শের মাঝে টিকে থাকার অটুট প্রেরণা। এ শিক্ষা ও দীক্ষার মাঝে নির্মিত হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। সে লক্ষ্যে তাঁর মৃত্যু শোক আমাদের জন্য জ্ঞানশক্তিতে রূপান্তরিত হোক—এ আমাদের প্রার্থনা। লেখক :প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় Email: abdullatifmasumju@gmail.com