লাল সবুজের জন্য অপেক্ষা
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৪, ২১:৩০
ক্রিকেট কিন্তু আমাদের কিংবা আমাদের অগ্রজদেরও ছোটবেলার খেলা ছিল না। হাডুডু, গোল্লাছুট আর ফুটবলের মধ্য দিয়েই অবশ্য এ অঞ্চলের কিশোর-তরুণদের বেড়ে উঠা। একটু পরিকল্পনা করে নিজেদের খেলা বলতে ফুটবলকেই বুঝাতো। গ্রামে তখন আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা হতো। স্কুলের বাইরে বিভিন্ন পাড়ার ক্লাবগুলো এমনকি গ্রামে-গ্রামে কিংবা পাড়ায়-পাড়ায়ও ফুটবলের আসর বসতো। মাঠের বাইরে ধান উঠা শেষে জমিতেও অনেক ফুটবল প্রতিযোগিতা হতো।
ওই সময় গ্রামের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারে কিন্তু একটা ফুটবল থাকতোই। এখনও হয়ত অনেক বাড়িতে ফুটবল থাকে কিন্তু ফুটবলের ওই টান আর খুব একটা বেশি দেখা যায় না। ওই সময় প্রাইমারি কিংবা স্কুলে রাখা হতো ফুটবল, কলেজে থাকতো ফুটবল। ক্লাবেতো থাকতোই। একটু শহুরে এলাকায় শীতকালে দেখা যেত কিছু কিছু ব্যাডমিন্টনের আসর বসতে। কিন্তু সেটা খুবই সীমিত আকারে। কিন্তু ক্রিকেট খেলার ঘটা করে কোন আয়োজন কখনো আমাদের তরুণবেলায় চোখে পড়েনি।
এটা অবশ্য খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। এইতো আশির দশকের কথা। ফুটবলই টানত আমাদের। আবাহনী, মোহামেডান কিংবা ব্রাদার্স ক্লাবের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে যাওয়ার উত্তেজনা থাকতো তরুণদের মধ্যে। স্কুল, কলেজ ফাঁকি দিয়ে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়া তখন প্রায়ই হতো। খেলার দর্শকদের কাছে তখন খেলার তারকা মানেই ছিল ফুটবলাররা। ওই সময় স্যাটেলাইট টেলিভিশনের এত দাপট না থাকলেও ফুটবলার সালাউদ্দিন, বাদল রায়, সালাম মুর্শেদী, টুটুল, কায়সার হামিদ, কাননসহ অনেক ফুটবলার ছিল তারকার মত।
ঢাকা স্টেডিয়াম উপচে পড়তো দর্শকদের ভিড়ে। বিশেষত আবাহনী, মোহামেডান কিংবা ব্রাদার্সের খেলা থাকলেতো কথাই নেই। এসব দলের পতাকা নিয়েও ছিল তখন প্রবল এক উন্মাদনা। ব্যান্ড পার্টি নিয়ে দলে দলে মানুষ স্টেডিয়ামে ঢুকতো ফুটবল খেলা দেখতে। কিন্তু এসবই এখন যেন ক্রমশ গল্প হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই এখন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ উত্তেজনা। বাংলাদেশের প্রায় সব শহরগুলোতে দর্শকরা প্রিয় দলের পতাকা উড়াচ্ছেন, কেউবা জার্সি পড়ছেন তার দলের। রাজধানীর ফুটপাত থেকে বড় বড় শপিংমলগুলোতে এখন এসব বিশ্বকাপের জার্সি, মগ, কলম, চাবির রিং বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বত্রই এখন বিশ্বকাপ। এমনকি বাসা বাড়িতেও এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল।
গত পরশু আমার ছয় বছর বয়সী কন্যা বায়না ধরেছে যে তার জন্য চারটি ব্রাজিল আর একটি আর্জেন্টিনার পতাকা নিয়ে বাসায় যেতে হবে। কারণ সে সকলের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে বাসায় ৫ জনের মধ্যে চারজন ব্রাজিল আর একজন আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই তার জন্য এ পাঁচটি পতাকা চাই-ই। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা চাইলেও বাংলাদেশের পতাকা তার চাহিদার তালিকায় নেই। কিন্তু এইতো কয়দিন আগেও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় কিন্তু সে বারান্দায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল। খেলার প্রথম ভাগেই বাংলাদেশ বিদায় নিলেও তার উত্সাহের কমতি ছিল না।
কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপের আসরের পতাকার মিছিলে এবার বাংলাদেশ নেই। অথচ খেলাটা ক্রিকেট নয়, ফুটবল। যে খেলা সঙ্গে নিয়ে বড় হয়েছি আমরা কিংবা আমাদের আগের প্রজন্ম। কিন্তু সেই ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের উঠারও সুযোগ হয়নি এবার বাংলাদেশের। অথচ এ খেলাটাই সবচেয়ে আপন আমাদের। একেবারে ঘরের খেলা।
কিন্তু সেই ফুটবলের বিশ্বকাপে কবে উঠবে বাংলাদেশের নাম। পত পত করে উড়বে বাংলাদেশের পতাকা। খেলার সময় আমরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা তো বাধ্য হয়ে উড়াই। আমরা তো প্রাণভরে উঠাতে চাই লাল সবুজ পতাকা। সেই পতাকা উড়ানোর জন্য আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তবে এটা ঠিক যে অনেক অপেক্ষাও কিন্তু আনন্দের।
লেখক :সাংবাদিক
saikatasis@yahoo.com