দিনে অন্তত দু’টি পরোপকারের কাজ করুন
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৪, ২১:৫৭
একদিন আমি আমার এক ভাবীর সাথে কথা বলছিলাম। তিনি একটি দৈনিক পেপার ও একটি পাক্ষিক ম্যাগাজিনের সম্পাদক। তারপরে কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের দেখাশুনা করেন। যা হোক তাঁর সাথে ঐদিনের আলাপ-আলোচনার কথায় আসি। ভাবী একপর্যায়ে আমাকে বললেন—নাসির দিনে অন্ততপক্ষে দু’টি পরোপকারী কাজ করবে। তাহলে দেখবে একসময় তুমি একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারবে। তিনি আরো বললেন—ঐ দু’টি পরোপকারী কাজের তুমি কোন বিনিময় নিবে না, সম্পূর্ণ সেবামূলক। ভাবীর একথাটা তিনি ধর্মীয় চিন্তা থেকে বলেননি। তিনি কথাটা বলেছেন মানবিক দিক থেকে। ভাবীকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম কি কি কাজ পরোপকারী কাজের মধ্যে পড়ে? তিনি বললেন—ধর্ তুমি পথ চলতে গিয়ে দেখলে যে একজন বৃদ্ধ রাস্তা পার হতে পারছে না, তুমি গাড়ি থেকে নেমে ঐ লোকটাকে রাস্তা পারাপারে সহায়তা করলে, আবার দেখলে তোমার বাসার কাজের বুয়া তার ছেলেটাকে টাকার অভাবে পড়াতে পারছে না, তুমি কাজের বুয়ার ছেলেটার পড়ার খরচ বহন করবে। ধর্ পথ চলতে তুমি দেখলে যে একটি লোক মাথায় একটা বস্তা টেনে উঠাতে পারছে না, তুমি লোকটাকে সাহায্য করলে অর্থাত্ তার সাথে একসাথে বস্তাটা ধরে তার মাথায় তুলে দিলে। তুমি দেখলে যে একজন হতদরিদ্র অভুক্ত আছে তোমার কাছে একপেট খাবারের জন্য মিনতি করছে, তুমি তাকে ৫০টি টাকা খরচ করে একবেলা খাইয়ে দিলে। তুমি দেখলে যে রাস্তায় দু’টি লোক ঝগড়া করে মারামারির পর্যায়ে চলে গেছে। তুমি গাড়ি থেকে নেমে লোক দু’টিকে থামানোর চেষ্টা করলে। ভাবী এরকম অনেক কথা বললেন। আমি এরপর থেকে দিনে অন্তত দু’টি পরোপকারী কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্বেচ্ছায় পরোপকারের কাজ কিন্তু ছোট-খাটো কোন ব্যাপার না। এখানে অনেক কথা আছে। যে স্বেচ্ছায় দিনে দু’টি পরোপকারের কাজ করে বা করার চেষ্টা করে সে তো পরের ক্ষতি করতে পারে না। সে তো কাউকে আক্রমণ করতে পারে না। সে পরের পাকা ধানে মই দিতে পারে না। যে আক্রমণ করে না, শুধু আক্রান্ত হলে তা প্রতিহত করে, সেই সমাজের একজন মানবদরদী লোক। আমরা যদি সবাই এই শপথ নেই যে আমরা প্রত্যেকে পরোপকারী হবো, কেউ পরের ক্ষতি করব না। তাহলে আমাদের সমাজে আর কোন সমস্যাই থাকবে না। পাঠক, একটু ভেবে দেখুন তো তাহলে আমাদের সমাজটা কত সুন্দর হতে পারে। ভাবী আরো বললেন— তুমি ঘুষ খেয়ে টাকা বানিয়ে হজ্ব করে হাজী হয়ে আসলে, কি? সে হজ্ব আল্লাহ গ্রহণ করবে? সেটা হবে আল্লাহর সাথেই প্রতারণা করা। ঘুষ না খাওয়াও পরোপকারের মধ্যে পড়ে। তুমি ঘুষ খেয়ে খেয়ে টাকা বানিয়ে নাম কেনার জন্য একটা মসজিদ করে দিলে। এতে কি তোমার পুণ্য হবে ? এটাও তো আল্লাহর সঙ্গে প্রতারণা করা। হাজী মোহম্মদ মোহসীন একজন বড়মাপের দাতা ছিলেন। ঐরকম দাতা এখন দেশে নেই। আমরা যদি প্রত্যেকে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র হাজী মোহাম্মদ মোহসীন হই, তাহলেও তো দেশের সব সমস্যা দূর হয়ে যায়। আমরা যদি কেউ আক্রমণকারী না হই তাহলে তো আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। আমরা যদি প্রত্যেকে যাকাত দেই, আমরা যদি কেউ কর ফাঁকি না দেই তাহলে দেশ বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবে না। দেশ থেকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্য বিদায় নিবে। যারা দেশের টাকা চুরি করে, হুন্ডি করে, ভুয়া এলসি করে টাকা বিদেশে পাচার করে, বিদেশি ব্যাংকে হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স বানায়, বিদেশে বাড়ি কিনে, বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে নিজের আখের গুছিয়ে নেয় তা তো হবে দেশের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সেটা হবে দেশের মানুষের সর্বনাশ করা। দেশের মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেয়া। শুনেছি দেশের রাস্তাঘাট বিভিন্ন প্রজেক্ট করতে মন্ত্রণালয় থেকে প্রজেক্ট পাস করাতে ১০%-২০% ঘুষ দিতে হয়। সরকারের টাকা তো দেশের জনগণের টাকা। দেশের জনগণের টাকায় দেশের মানুষের জন্য রাস্তাঘাট করার জন্য ঘুষ দিতে হবে কেন? যে সমস্ত ব্যবসায়ী রাতারাতি ধনী হবার জন্য ১০০ টাকার পণ্য ৩০০ টাকায় বিক্রি করে তারাও মানুষের ক্ষতি করে। আপনি ব্যবসায় লাভ করুন তবে সে লাভ মানুষের গলা কেটে না, সহনীয় লাভ করলেই মানুষ বাঁচবে। যে সমস্ত কন্ট্রাক্টর রাস্তাঘাট, ব্রীজ নির্মাণ করতে গিয়ে বড় অংকের টাকা চুরি করে নিম্নমানের কাজ করেন তারা শুধু দেশের ক্ষতিই করেন না, তারা রানা প্লাজার ধসে পড়া ইমারতের জন্যও দায়ী থাকবেন। তারা হাজার হাজার মানুষ হত্যার জন্যও দায়ী থাকবেন।
আসা যাক যুদ্ধের কথায়। একটি F-১৬ যুদ্ধবিমান তৈরি করতে যে খরচ হয় সে টাকা দিয়ে দু’টি অত্যাধুনিক হাসপাতাল গড়া যায়। যুদ্ধবিমান, মারণাস্ত্র তৈরিতে বিভিন্ন দেশ হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে। এই টাকা যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয় তাহলে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য চিরতরে বিদায় নিবে। পৃথিবীতে যত এটম বোম তৈরি হয়েছে তাতে যে ইউরেনিয়াম ব্যয় করা হয়েছে ঐ ইউরেনিয়াম দিয়ে বিশ্বকে বিদ্যুতের আলোয় সর্বক্ষণ আলোকিত করা সম্ভব। বিশ্বের সমস্ত বৈদ্যুতিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
প্রিয় পাঠক, আপনারা যারা এই লেখাটি পড়বেন তাদের কাছে আমার অনুরোধ— আপনারা প্রত্যেকেই দিনে অন্তত দু’টি পরোপকারী কাজ করুন এবং পরের ক্ষতি করা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখুন। আশাকরি তাহলে দেশে কিছুটা হলেও শান্তি বৃদ্ধি হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও সাবেক ছাত্রনেতা