সুখবর নিয়ে এসো সুষমা

নিখুঁত, সুষমামণ্ডিত মুখচ্ছবি। চেহারায়, আচরণে, বাক-ভঙ্গিতে সুপ্রতিষ্ঠিত স্বরাজ। তাঁর নাম সম্পূর্ণাও হতে পারত। নামের সঙ্গে মুখের, সূক্ষ্ম রুচিবোধ, তীক্ষ্নবুদ্ধি এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার এমন সাদৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। কপালে বড়ো, গোলাকার শান্তিনিকেতনি টিপ। সিঁথিতে সুরঞ্জিত সিঁদুর, পরনে শাড়ি। মাথার পেছনে দীর্ঘ একগুচ্ছ চুলের খোঁপা। ২৪ জুন, ভারতের দ্বিতীয় মহিলা বিদেশমন্ত্রী ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে যখন নামবেন, বহু অচেনা মুখ তাঁকে চিরায়ত বঙ্গবধূর সাক্ষাত্ প্রতিমা ভাবলে অবাক হব না। একসময়, কেন জানি, তাঁকে আমাদেরও বাঙালিকন্যা মনে হত। পরে ভুল ভেঙ্গেছে। তবু আজও তাঁকে আদলে, সুশীল কথাবার্তায় পরমাত্মীয় মনে হয়। মোদীর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁর আসন দ্বিতীয়, তৃতীয় না চতুর্থ? এ প্রশ্ন তাঁকে নিয়ে ওঠে না, উঠছে না। অটল বিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানির স্নেহধন্যা এবং গ্রহণযোগ্যতায় সবার আপনজন বলে পরিচিত সুষমা স্বরাজকে বিদেশমন্ত্রী মনোনীত করে প্রশস্ত পররাষ্ট্রনীতির বার্তা ছড়িয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয়ত, প্রথম বিদেশ সফরে তাঁকে পাঠাচ্ছেন এমন একটি আত্মীয় দেশে—যার উত্থান আর বিজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় ভাবাবেগ। সুষমা তখন চন্ডিগড়ের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের মেধাবী পড়ুয়া। সক্রিয় ছাত্র রাজনীতিতে প্রবল ইন্দিরা বিরোধী হলেও, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সমর্থন তাঁর একরোখা। সেখানে কোনো আপোষ নেই, বিরুদ্ধ রাজনীতির সদর্থক পদক্ষেপের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে দ্বিধা নেই ক্যাম্পাসে, ক্যাম্পাসের বাইরেও। বলাবাহুল্য, সত্তর-একাত্তরে ভারতীয় রাজনীতির উদীয়মান আলোয় তিনিও উদ্ভাসিত হয়ে উঠছেন, একই সঙ্গে কংগ্রেসের ভেতরে বাইরে অন্য নব্য তুর্কিরাও উচ্চকিত। কেউ কংগ্রেস পন্থি, কেউ বা প্রবল বিরোধী। কিন্তু বাংলাদেশের ৯ মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবার বুকে সহমর্মিতার সমবন্যা। দেশের ভেতরে বিপুল জনসমর্থন ছাড়া বাইরের প্রবল বিরোধিতার মোকাবিলা করা ইন্দিরা আর তার দলের পক্ষে একা কি সম্ভব? আশ্রিত এক কোটির ওপর শরণার্থী। তাদের রসদ যোগাতে হচ্ছে, জোগাড় করতে হচ্ছে অর্থ এবং অস্ত্র। সামনে লড়ছে বাংলাদেশের মুক্তিসেনা। পেছনে ভারতীয় ফৌজ। যে ফৌজকে হরিয়ানার আম্বালা সেনা ছাউনি থেকে পশ্চিম আর পূর্বদিকে ঘন ঘন ট্রেনে, ফৌজি ভ্যানে ছুটতে দেখেছেন সুষমা। এসব দেখতে দেখতে বাংলাদেশের বিপর্যস্ত, শঙ্কিত, অত্যাচারিত মানুষের ছবি ভেসে উঠেছে তার চোখে। হূদয়ের একপাশে মানব দরদ, অন্য কিনারে দেশপ্রেমের উদ্বোধন। আবার পূর্ববঙ্গে নারী ধর্ষণের খবরে বিচলিত চিত্র। এরকম অবস্থায়, স্বদলের ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধ মতামত আঁকড়ে ধরে তাঁর মতো সংবেদনশীল তরুণীর বসে থাকা কি সম্ভব? না, তিনিও ঝাপিয়ে পড়লেন স্বেচ্ছাসেবায়, শরাণার্থীদের রসদ সংগ্রহে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সুষমার এসব স্মৃতির ভাবাবেগের সঙ্গে পরিচিত। তাই তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যতম দক্ষ, দৃঢ়চেতা, অভিজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল সদস্যকে প্রথম বিদেশ সফরে ঢাকাতেই পাঠাচ্ছেন। এটাকে শুধু ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ট দেশের প্রতি সৌহার্দ্য রক্ষার বার্তা ভাবা ঠিক হবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৌশলপূর্ণ ভিন্নতর ইঙ্গিত। যা পাকিস্তানের উদ্দেশে, পূর্বভারতকেও লক্ষ্য করে। তা হচ্ছে এই যে, দিল্লির আমলাতন্ত্র পাকিস্তানকে যতটা গুরুত্ব দেয়, বাংলাদেশকে কেন জানি সেরকম ওজন দিতে রাজি নয়। পূর্ব ভারতে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, পাকিস্তানের হাতে পরমাণুবোমার গদা আছে বলেই কি দিল্লি নজরে তার ‘মর্যাদা’ একটু বেশি? অথচ সীমান্তের আয়তনে, ব্যবসাবাণিজ্যের পরিধিতে, সাংস্কৃতিক সমগোত্রীয়তায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা শুধু নিবিড় নয়, অনেক গভীর এবং অতলস্পর্শী। দিল্লিতে যে সরকারই আসুক না কেন, ঢাকা কৃতজ্ঞতাবোধ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শর্তকে কখনো অস্বীকার করবে না। সুষমার প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে মোদীও বুঝিয়ে দিলেন, ঢাকাই দিল্লির সর্বোত্তম কুটুম্ব। ভারসাম্য অটুট রাখাই তাঁর ঘোষিত সুশাসন ও পররাষ্ট্র নীতির ধর্ম। শেখ হাসিনার হূদয়-ছোঁয়া চিঠি: প্রধানমন্ত্রী তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত সব দেশের শীর্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁর পূর্ব নির্ধারিত বিদেশ সফর নিয়ে ব্যস্ত। আসতে পারেননি। নিজের ঘনিষ্ঠ নেত্রীকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদীকে অভিনন্দনের যে অভিজ্ঞানপত্র পাঠিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, তা কূটনৈতিকতার অনেক ঊর্ধ্বে। পোশাকি সৌজন্যবোধেরও ওপরে—বাংলাদেশকে আপনার আরেক ঘর ভাববেন। এখানে আপনি সব সময় স্বাগত। পারস্পরিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণের ইতিহাসে মুজিব কন্যার মর্মস্পর্শী এই চিঠি মাইলফলক হয়ে থাকবে। মোদীর স্বভাবে যুক্তি আর আবেগ দুটিই একসঙ্গে কাজ করে। হাসিনার চিঠি স্পর্শ করেছে তাঁর আবেগকে। তাই নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখা এবং পারস্পরিক আত্মীয়তার পথে যেসব তুচ্ছ ঝামেলা সমস্যা হয়ে আছে, তা তিনি শুরুতেই ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা বিদেশমন্ত্রী (২২ আগস্ট ১৯৬৭ থেকে ১৪ মার্চ ১৯৬৯)। জোট নিরপেক্ষ দেশগুলির সম্পর্ক নির্মাণে তাঁর অবদান আর সাফল্য অসামান্য। তখন চীন আর আমেরিকার সঙ্গে সদ্ভাব সব সময় একখাতে প্রবাহিত হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও পারস্পরিক বোঝাপড়া একদা তিক্ত হয়ে ওঠে। তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর দৃঢ়তায় শুধু এই দুই দেশই নয়, তাঁদের মিত্ররাও হার মেনেছে। ভুট্টো জমানার কয়েকবছর বাদ দিলে পাকিস্তানও বদলায়নি। ছিদ্রান্বেষী নই। তবু স্বীকার করতে হয়, সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি ইন্দিরার বাধ্যতামূলক নির্ভরতায় ভারত খুব বেশি উপকৃত হয়নি। এই ভুল ইতিহাস অবশ্যই কোনো একসময় খতিয়ে দেখবে। মোরাজি ও বাজপেয়ির আমলে পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন সূচিত হয়। পাকিস্তান, চীন কাছাকাছি চলে এল। বাংলাদেশ কিঞ্চিত্ দূরে সরে গেল। লালকৃষ্ণ আদভানি সীমান্ত সমস্যা মেটাতে চেয়েছিলেন। বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিজেপির আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ শাখা। আঞ্চলিক রাজনীতির স্বার্থে তারা অর্থহীন ভাবাবেগকে ইস্যু করল। এবারও করতে পারে। তবে বাংলাদেশ সফরে আসার ১২ দিন আগে, ১১ জুন, সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সংক্রান্ত বিতর্কের প্রথম বক্তা সুষমা স্বরাজ মহাভারতের মহান পুরাণচরিত্র ভীষ্মের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে চমকে দিলেন সদনকে। বললেন, পঞ্চপান্ডবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য যুধিষ্ঠীর ভীষ্মের কাছে সুশাসনের মন্ত্র জানতে গেলে ভীষ্ম তাঁকে বললেন, অতীতের সমালোচনা করে বর্তমানকে, বর্তমানের দায়িত্বকে সমসাময়িক প্রয়োজনীয়তাকে ভুলে থাকা ঠিক নয়। অতীত যদি ভালো হত, তার দিকে তাকিয়েই মানুষ ব্যস্ত থাকত। অতীতকে বদলাতে চাইত না। মহাভারতের এই ঘটনা স্মরণ করে কী বলতে চান বাগ্মী, সুপণ্ডিত এবং বহুভাষাবিদ সুষমা? প্রতিবেশী যে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসে ভবিষ্যতের নতুন প্রজন্মের চাহিদা পূরণই কি তার উদ্দেশ্য? এদিন সংসদে অসাধারণ ভাষণ দিলেন আরো দুইজন। একজন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রায় এক ঘন্টা। আরেকজন তৃণমূলের নবনির্বাচিত সাংসদ সুগত বসু। সম্পর্কে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রোপৌত্র। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সুপরিচিত ইতিহাসিক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দুজনের বক্তৃতা শুনতে হল, শুনতে এঁরা বাধ্য করলেন। মোদীর ভাষণে উঠে এলো অভিন্ন, শ্রেষ্ঠ ভারত গড়ার সুদৃঢ় সংকল্প এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রসঙ্গ। ভোটের প্রচার সভার মোদীর এবং নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে, আবেগে, শব্দচয়নে এতো তফাত্? মোদী সব অর্থে দায়িত্বশীল, গ্রহণশীল, পরমত সহিষ্ণু নেতা হয়ে উঠতে চাইছেন। ‘সত্তায় ছিলাম কি ছিলাম না, এটা কোনো প্রশ্ন হতে পারে না। নারী নিগ্রহ, বলাত্কার বা পুনে হত্যাকাণ্ড (আই টি ইঞ্জিনিয়ার) —এই ধরনের যে কোনো অবিচার আর ব্যভিচার রুখতেই হবে। কোনো ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের দাদাগিরি বরদাস্ত করা চলবে না। জাতপাত ও সম্প্রদায়গত বিভাজনকেও রুখতে হবে। ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সম্পর্কের সুদৃঢ় নির্মাণ প্রার্থনা করছি। চারদিন আগে, এক একান্ত সাক্ষাত্কারে বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র মুখতার আব্বাস নকবি বললেন, বিদেশীনীতির পরিবর্তন নয়, সার্কভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ অশেষ। সংকীর্ণতা বা আঞ্চলিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া হবে না। ঐতিহাসিক সুগত বসুর অসামান্য ভাষণেও ভেসে উঠল বিদেশনীতিকে সংহত, ভারসাম্যময় করে তোলার প্রস্তাব। সমবয়স্ক ঐতিহাসিকের তথ্যবহুল, যুক্তিপ্রবণ ব্যাখ্যায় আমরা অভিভূত। সুগতকে অভিনন্দন। সংসদে প্রবেশ করেই তাঁর সমাজ দর্শন এবং উপমহাদেশের সৌহার্দ্য রক্ষার আর্জি যৌথভাষায় ঘোষণা করল, তাঁর লক্ষ্য অনেক দূর—আসামাঁ সে আগে আওর কুছ হ্যায়।’ একইভাবে বিজেপির সদস্য হয়েও শ্রীমতী গান্ধীর উত্তরসূরি ভাবভঙ্গি থেকেও প্রকারান্তরে আমরা জেনে গেলাম-বাংলাদেশের জন্য সুসংবাদ নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ফিরবেন আতিথ্যপনা আর আপ্যায়নের উচ্ছ্বাসে মুগ্ধ হয়ে, সাফল্যের উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে এটা কেবল তাঁর একার, তাঁর সরকারের আকাঙ্ক্ষা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের শুভবুদ্ধির অপেক্ষমাণ প্রত্যাশা। অনুমান নয়, সম্ভাবনার অঙ্ক: প্রত্যাশা ছিল—ঢাকাকে ভারত বাংলাদেশের সুরচিত সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন নরেন্দ্র মোদী। এই লেখার মধ্যভাগেই কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এবার যথাসম্ভব সংক্ষেপে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কী কী বিষয় উঠতে পারে, বলা জরুরি। তবে আগেই বলে রাখছি, কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা আর বাস্তব সবসময় একপথে চলে না। নিয়তি আর রাজনীতির অদৃশ্য শক্তি অনেক সময় পরিবেশের সুন্দরকে হটিয়ে দেয়। সকলের কাম্য, অযাচিত আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সুষমার আসন্ন সফর সুহানা আর ফলদায়ী হয়ে উঠুক। এ কামনার সঙ্গত কারণ আছে। ভোটের প্রচারে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর নরেন্দ্র মোদী বার বার বলেছেন, ঘরে-বাইরের সমস্যা নিয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। নদীর সঙ্গে নদীকে মিশিয়ে দিতে চাই। নিছক প্রতীকী অর্থে তাঁর বয়ানকে বেছে নেয়া ঠিক হবে না। একথা বলতে হচ্ছে, কেননা সার্ক রাষ্ট্রনেতাদের প্রতি তাঁর সৌহার্দ্যময় উদিত আসক্তি। দ্বিতীয়ত, সুষমার বিদেশ সফরে সার্ক-এর প্রধান প্রবক্তা বাংলাদেশকে প্রথম গুরুত্ব। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সুষমার হাতেই তুলে দিচ্ছেন হূদয়ের বার্তা। চতুর্থত, সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর আলোচনার শুরু এবং সুষমার সঙ্গে অভিজ্ঞ কর্মঠ পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিদলকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র, সৈয়দ আকবর উদ্দিন জানালেন—প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিদেশনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জুন মাসেই ভুটান যাচ্ছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। বিদেশমন্ত্রীও প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রে যাবেন। সেটি কোন্ রাষ্ট্র? অবশ্যই বাংলাদেশ। প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননের সঙ্গে কথা বলেছেন মোদী। জানতে চেয়েছেন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরিস্থিতি। তারপরেই ঘোষিত হয়ে গেল সুষমার ঢাকা সফরের কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বিদেশ মন্ত্রকের অফিসারদের কাছ থেকে বাংলাদেশে জামাত-এ-ইসলামীর ভারত বিরোধী রাজনীতির গড়ন, বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন এবং আইএসআই -এর কলাকৌশল কতটা গাঢ়, সর্বগ্রাসী—বিশদভাবে জানতে চেয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশ জঙ্গি ও উগ্র মৌলবাদীদের দখলে যাওয়া মানেই দুই দেশের নিরাপত্তার বিপদ। অতএব সদ্ভাব ও পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখতেই হবে। গত পাঁচ বছরে জঙ্গিদের উত্খাত করে বাংলাদেশ যেসব কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, তার প্রশংসা করে সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সবদিক খতিয়েই মনে হচ্ছে, সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, ছিটমহল সমস্যা এবং তিস্তার জল বণ্টনের ঘোষিত- অঘোষিত বিবাদ মেটাতে ভারত একান্ত আগ্রহী। সুষমার বয়স যখন ২৫:বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রবেশ করলেন হরিয়ানা বিধানসভায়। জনতা দলের বিধায়ক। সংসদীয় রাজনীতির শুরুতেই দেবীলাল মন্ত্রিসভার পূর্ণমন্ত্রী। এরপর জনতা দল ছেড়ে প্রণয় শুরু বিজেপির সঙ্গে। এবারও তিনি জোট সরকারের শিক্ষা এবং খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রী। হরিয়ানা বিধানসভায় তিন বছরেই প্রমাণিত হয়ে গেল তাঁর দক্ষতা। সহযাত্রীরা জেনে গেল উদীয়মান বাগ্মী নেত্রীর ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল। ’৮০ সাল থেকে ১৯১৪—লোকসভা আর রাজ্যসভায় একটানা তার উপস্থিতি। হেরেছেন মাত্র একবার, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়ার কাছে ২০০৪ সালে, কর্ণাটকে। কিন্তু তার আগেই অটল বিহারির মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, পরে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। ২০০০ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত আবার কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। এটা হয়ত নিছক জল্পনা অথবা কল্পনা। বছরখানেক আগেও রাজধানীতে তার মুখচ্ছবিতে ভাবী প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখেছেন কেউ কেউ। কিন্তু বিজেপি এরকম ঘোষণা করেনি। সুষমাও সম্ভবত এরকম স্বপ্ন দেখেননি। দল তাঁর অবলম্বন, দলই তার মতাদর্শ। কিন্তু যখন যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন, সেখানে এঁকে রেখেছেন আত্মবিশ্বাসী, মেধাবী এবং স্বপ্নদর্শী জনপ্রতিনিধির সুশিক্ষিত স্বাক্ষর। এসব কারণেই ভাবতে অসুবিধা হয় না যে, স্থল ও জল নিয়ে কিছু কিছু সমস্যার সুরাহার পথ তিনি খুঁজবেন এবং ভারত ও বাংলাদেশকে অটুট সম্পর্কের বন্ধনে মেলাবেন তিনি । তিস্তার জল নিয়ে কী কী প্রশ্ন উঠতে পারে, বাধা আসবে কি আসবে না, এসব কানাঘুষো কানে এলেও বৈঠকের আগে বলা বা আভাস দেয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক। স্পর্শকাতর বিষয়টির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, মুখ্যমন্ত্রীর সদিচ্ছা পুরোপুরি জড়িত। মমতা দিনকয়েক আগেই বলেছেন, বাংলাদেশকে আমরা ভালোবাসি। ছিটমহল সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চাই। তিস্তা নিয়ে তিনি মুখ খোলেননি। উনি যখন এ ব্যাপারে নিশ্চুপ, আমরা তখন হাতের কলম আর কালির অপব্যবহার করব কেন? সাংবাদিকতার নামে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা, মন্তব্য করা এক ধরনের ধৃষ্টতা। এই পাপ যেন স্পর্শ না করে আমাদের। বরং চাই যেরকম হাসি নিয়ে ঢাকা যাচ্ছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী, ঠিক সেরকম হাসির দ্যুতি ছড়িয়ে সুসংবাদ বয়ে আনুক তাঁর সুষমার স্বরাজ। প্রসঙ্গত এটুকুই বলতে পারি, ১১ জুন সংসদে মমতাকে বোন বলে সম্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মমতা এখনো তাকে দাদা বলে ডাকেননি। কবে ডাকবেন কে জানে? ডাকলেই কি জননায়ক বোনের দিকে এগিয়ে আসবেন? ফুল আর সদিচ্ছার ফল হাতে? লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা