স্বপ্নের দেশ কোথায়
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৪, ২০:৩৮
ছোটবেলায় তোমার কাছে শোনা বাবা। আইউব-বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নার পক্ষে জনমত গঠনে বঙ্গবন্ধুর সহযোগী ছিলে তুমি। গোপালগঞ্জের বিল এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় একাজে ঘুরে বেড়িয়েছো তোমরা। ছোট্ট একটা টাবুরা নৌকায় তোমরা ঘুরতে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। যেন অন্তহীন এক পরিভ্রমণ। একনাগাড়ে ঘুরতে ঘুরতে কখনও কখনও ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েছো। ঘুমে তোমাদের দু’জনের চোখ ভেঙে এলেও একসাথে ঘুমাওনি। বঙ্গবন্ধু কিছুটা সময় ঘুমিয়ে নিয়েছেন, তুমি থেকেছো জেগে। এরপর কিছুক্ষণের জন্য তোমার পালা। এভাবেই কেটেছে তোমাদের সেসব দিন। ওই সময়ের আন্দোলনে তোমরা সফল হতে পারোনি। এজন্য হতাশ হয়ে বসেও থাকোনি। আবার নবোদ্যমে সতত প্রাণধারায় উত্সারিত হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েছো তোমরা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই কারারুদ্ধ হন নেতা, বঙ্গবন্ধু। তোমরা, তাঁর সৈনিকরা, নিজ নিজ কাঁধে তুলে নাও মহান দায়িত্ব। তুমি বেছে নাও ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণার বনগাঁও। সেখানেই থিতু হয়ে বসে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আসা শরণার্থীদের দেখভাল করা, স্লিপ দেয়া, আবাসনের ব্যবস্থা করা এবং বেছে বেছে সক্ষম যুবকদের বের করে ট্রেনিং-এর জন্য ক্যাম্পে পাঠানো। ওই সময় তোমার দিন যে কতটা কষ্টে ও ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে তা তোমার পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কেইবা অমন ভাবে জানে!
সে সময়ের অর্থাত্ মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ বার বার তোমাকে কলকাতায় যেতে বলেছেন। তোমাকে জনমত গঠনের জন্য বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগও নিয়েছিল প্রবাসী সরকার। কিন্তু তুমি কলকাতায় কিংবা বিদেশে যাওনি। তোমার কথা ছিল একটাই :সীমান্তবর্তী এলাকায় থেকে আর্ত মানবতার সেবা করা। সে দায়িত্ব তুমি নিষ্ঠার সাথে পালনও করেছো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আসলের সাথে কৃত্রিম ও মেকি সংগ্রামীরা নিজেদের জায়গা পোক্ত করে নিতে তত্পর হয়ে ওঠে নতুন সরকারে, রাজনীতিতে এবং ক্ষমতায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে অংশটি কলকাতার শ্রীনিকেতন জাতীয় হোটেলে বিলাসবহুল আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করেছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারাই সবার আগে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কেউকেটা প্রমাণে। আর তোমাদের মত যাঁরা শুধু কাজ করেই গেল কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করে, তাঁরা ধীরে ধীরে চলে যান প্রদীপের পাদদেশের অন্ধকারে।
তেয়াত্তরের নির্বাচনে দলের কয়েকজন নেতা তাদের মন্ত্রিত্বের পথ সুগম করতে বিরোধিতা করে তোমাকে কীভাবে হারিয়েছে, তা এখনও সেই সময়ের মানুষদের জানা। জাল ভোট, বিদেশি ধুয়া তোলা, গাড়ি ছিনতাই, হিন্দুঅধ্যুষিত এলাকায় খড়ের পালায় আগুন দেয়াসহ দলীয় প্রার্থীকে হারানোর সব আয়োজনই দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছিল তারা। যে দেশের জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তুমি কাজ করে গেছো, তেয়াত্তরে সেই দেশ তোমাকে কেমন নাকানি-চুবানিটাই না খাওয়ালো! পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশইতো চলতে থাকলো উল্টো পথে। এরপর পতনের সবগুলো রাস্তাই যেন খুলে যায় তোমার সামনে। উন্মাদনার সাথে সেই প্রতিটি রাস্তাই তুমি মাড়াতে থাকো ব্যর্থ আক্রোশে, আত্মজদের প্রবল বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে। মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাহাত্তরের সংবিধান। সেই সংবিধান নাকি আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। বাঙালির বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ধুয়া তুলে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে কত সুচারুরূপেই না চলছে নির্যাতন, নিপীড়ন। রামুর ঘটনা, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী অভয়নগর, দিনাজপুর, রংপুরসহ সারাদেশ যেন হয়ে ওঠে বিলাপের তীর্থপীঠ। ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ বলে একটা কথা আছে বাংলা ব্যাকরণে। ছেলেবেলা থেকে ওই শব্দটির সঠিক অর্থ ঠিকমত বুঝিনি। ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আব্দুল হাইকে রবীন্দ্রসঙ্গীত লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন তত্কালীন গভর্নর মোনায়েম খান। তা কীভাবে সম্ভব সে কথাটার মানেও এতকাল ঠিক বুঝিনি। বাবা, আমি এখন অনেক সাবালক হয়েছি। আজ আমি কাঁঠালের আমসত্ত্বের মানে বুঝি, আরও বুঝি কীভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে হয়। তুমি চলে যাওয়ার নয় বছর পরও একটি প্রশ্ন আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে—তোমার স্বপ্নের দেশ কোথায় বাবা?
লেখক :গৌরচন্দ্র বালার ছোট ছেলে