স্মরণ

স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলে ড. নীলিমা ইব্রাহীম

আজ ড. নীলিমা ইব্রাহীমের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী। কালের কপোল তলে স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলে তিনি কি একেবারেই হারিয়ে গেলেন? এই আশঙ্কা-উদ্বেগ কি একেবারেই অমূলক? বাংলাদেশের ঋদ্ধ-বিদগ্ধজনেরা বলেছেন—আমাদের প্রতিদিনের জীবন চর্চায় নীলিমা ইব্রাহীমের মত মানুষদের স্মরণ করা দরকার। কিন্তু তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা, কিংবা তাঁর শত সহস্র ছাত্র-ছাত্রী, অনুসারী, শুভানুধ্যায়ী কি এমন কিছু করেছি যার ওপর নির্ভর করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁর স্মৃতি অক্ষয়-অম্লান হয়ে থাকবে? না—আমরা কেউ কিছু করিনি। প্রশ্ন জাগে আসলেই কি তিনি কিছু করেছিলেন যার জন্যে তাঁকে মনে রাখতেই হবে? আসুন না চেষ্টা করে দেখি। ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর তদানীন্তন বাগেরহাট মহকুমার ফকিরহাট থানার মুলঘর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মগতভাবে হিন্দু এই রমণী ১৯৪৫ সালে ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিক্যাল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে ভালোবেসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯৪৬ সালে ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। অতঃপর তিনি নীলিমা ইব্রাহীম নামেই ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেন। ড. নীলিমা ইব্রাহীমের সমগ্র জীবনকে নানা পর্বে ভাগ করা যায়। তন্মধ্যে তার চাকরি জীবন, সমাজকল্যাণ, নারী উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড, সাহিত্য জীবন, মুক্তিযুদ্ধ পর্ব এবং জীবন সায়াহ্নে এসে তীক্ষ ক্ষুরধার একজন কলামিস্ট হিসেবে তাঁর দৃপ্ত পদচারণা। ১৯৫৬ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু। একই বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত প্রফেসর হিসেবে ১৯৮২ সালের ৩০ জুন তার পরিসমাপ্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে যুগপত্ভাবে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত ও পালি বিভাগের অধ্যক্ষ/সভাপতির দায়িত্ব, সমান্তরালভাবে ১৯৭৭ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের প্রভোস্ট হিসেবে, ১৯৭৪ সালের ১২ আগস্ট থেকে ১৯৭৫ সালের ৬ জুন পর্যন্ত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের গুরুদায়িত্বও তিনি পালন করেন। একজন মানুষের পক্ষে একাধারে এতগুলো দায়িত্ব কিভাবে পালন করা সম্ভব তা ভাবতেও বিস্ময়াভিভূত হতে হয়। কিন্তু সবকিছু করে দেখিয়েছিলেন নীলিমা ইব্রাহীম। আসলে তিনি ছিলেন কর্মযোগী, কর্মই ছিল তাঁর ধর্ম। ধ্যান ও জ্ঞানকর্মই ছিল তাঁর সাধনা, কর্মই ছিল তাঁর আনন্দ। তাঁর সমাজকর্ম, সাহিত্যকর্ম কিংবা কলামিস্ট হিসেবে তাঁর জীবনের যে শেষ পর্ব—এ সবগুলোই তাঁর জীবন চেতনার অবিচ্ছেদ্য প্রান্ত। কর্মব্যস্ত জীবনযাপন করতেন তিনি। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন প্রগতির পথিক। আমৃত্যু তিনি ছিলেন জাতির বিবেকের পক্ষে, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে। যেখানে অন্যায়-অবিচার দেখেছেন, বঞ্চনা অত্যাচার-নিপীড়ন দেখেছেন তার প্রতিবাদ করেছেন, দাঁড়িয়েছেন অত্যাচারিত, নিপীড়িত বঞ্চিতদের পাশে। এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শুভমনস্ক মানুষের নয়নমণি। অর্ধ শতাব্দীকাল মানবতার মুক্তির জন্য যতো আহ্বান এসেছে সবগুলোতে তিনি দিয়েছেন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, নারী মুক্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাগরণ, পূর্ণ জাগরণ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনসহ সুশীল সমাজের প্রতিটি লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সক্রিয় ও সচেষ্ট। আজকে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপক্ষে অবিরাম, অবিচল অবিচ্ছিন্ন ধারায় সংগ্রাম করে চলেছেন তাদের অনেকের তিনি ছিলেন আশ্রয়স্থল। স্বাধীনতা যুদ্ধে লাঞ্ছিত, নির্যাতিত, ধর্ষিতা নারীদের নিয়ে তাঁর লেখা ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ এমন একটি ধ্রুপদী উপন্যাস যার প্রতিটি ছত্রে গুমরিয়ে গুমরিয়ে ফেরে মানবতার আর্তনাদ। স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী যতই আস্ফাালন করুক না কেনো এ উপন্যাসটি তাদের সব কলঙ্কের, কঙ্কালের সারিবদ্ধ সমাবেশ। শুধু কালই নয়, মহাকাল অবধি এ উপন্যাসটি এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের মুখোশ উন্মোচিত করে যাবে। অনন্যসাধারণ অকুতোভয় বিদুষী এই নারী মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তাঁর হাতের দুটি সোনার বালা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠিয়ে দেন। তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী স্মৃতিচারণের একপর্যায়ে বলেছিলেন, ‘এই বালা দুটি যেন আমার চলার পথে প্রেরণা ও শক্তির উত্স হয়ে দাঁড়ায়’। সেই প্রেরণা ও শক্তি এখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কাজ করে কি-না জানি না। তবে এই অসম অসহিষ্ণু সময়ে চারদিকে যখন হিংসা, হানাহানি আর মৌলবাদী ঘাতকদের তত্পরতায় সকলে শঙ্কিত, সন্ত্রস্ত তখন একজন নীলিমা ইব্রাহীমকে বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। এই প্রয়োজন মনে রেখেই আসুন আমরা এমন একটা কিছু করি যাতে নীলিমা ইব্রাহীম নামের এই মানুষটি বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে না যান! লেখক :বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নির্বাহী সম্পাদক, বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক www.banglann.com