মেধাবী তরুণের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ

উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত বিশ্বে মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এদের গড়ে তুলতে রাষ্ট্র যে অর্থ ব্যয় করছে তার অনেকটাই অপচয় হয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মেধাবীদের অবিশ্বস্ততার কারণে। মেধা পাচার হওয়ায় উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশ ভুগছে মেধা সংকটে। উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবী তরুণদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত বিশেষ করে চিকিত্সক, প্রকৌশলী ও আইটি দক্ষতাসম্পন্ন বাংলাদেশিদের দেশ ত্যাগ বা নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। যাঁরা নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন তাঁরা প্রায় সবাই বয়সে তরুণ এবং পেশাজীবী। নাগরিকত্ব ত্যাগের কারণ হিসেবে অনেকেই ব্যক্তিগত কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমোদন নিয়েছেন ১ হাজার ৫৮৩ জন। এর মধ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছরেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন ২৯৯ জন। নাগরিকত্ব ত্যাগ বা বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার এ চিত্র অবশ্যই আংশিক। যাঁরা সরকারের অনুমতি না নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন এমন মেধাবীর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। এক সময় এ দেশ থেকে যাঁরা বিদেশে ঠাঁই নিতেন তাঁরা বলতেন দেশে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ না থাকায় তাঁরা বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, দলবাজি, দুর্নীতির ছড়াছড়ি ছাড়াও বাংলাদেশের ডিগ্রির মান কম। এখানে জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, চাকরি ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা না থাকায় মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন। তাদের বেশিরভাগই ফিরছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশৃঙ্খলা ও সেশনজটের ফলে নির্দিষ্ট সময়ে কোর্স শেষ না হওয়ার কথাও সবার জানা। আর গত কয়েক বছরে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসজনিত হতাশার কথা কে অস্বীকার করবে? তার পরও শিক্ষা শেষে চাকরির নিশ্চয়তাও নেই। সরকারি ও সম্ভাবনাময় চাকরির ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ, দলীয় প্রভাব ও দুর্নীতির কার্যকারিতাও এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, দেশের সেরা স্নাতক শিক্ষার্থীরা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার জন্য দেশ ত্যাগ করছেন। তাঁদের বেশিরভাগই আর ফিরছেন না। এভাবে প্রতি বছর প্রায় ৭শ’ থেকে এক হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর দেশত্যাগের ঘটনা এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমালেও শিক্ষা শেষে তাঁরা সেখানেই চাকরি খুঁজে নিয়ে স্থায়ী হয়ে যাচ্ছেন। ফলে দেশ এসব মেধাবী তরুণের সেবা থেকেই শুধু বঞ্চিত হচ্ছে না, এর ফলে দেশে এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণার উত্কর্ষ ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ গত দুই যুগে অনেক দিক থেকে এগিয়েছে। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়াও এখন সময়ের ব্যাপার। যারা বিদেশে চলে যাচ্ছেন দেশে তাঁদের কাজ করার সুযোগ নেই এ কথা বলার অবকাশ না থাকলেও যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষীয় সুনজরের অভাব এ দেশে এখনো প্রকট। যোগ্যতার চেয়ে উেকাচ অথবা ক্ষমতার প্রভাব চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি দেশে সুযোগ পেয়েও ব্যক্তিস্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার হীনম্মন্যতা কাউকে কাউকে দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেও অনেক মেধাবীই এখন মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। এমনকি দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, শিক্ষকরাও অহরহই দেশ ছাড়ছেন বিভিন্নভাবে। তাদের অধিকাংশই আর দেশে ফিরে আসছেন না। সরকারি খরচে শিক্ষালাভ করে এভাবে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে বিদেশে পাড়ি জমানোর মতো অনৈতিক কাজ ঠেকাতে কার্যকর কিছু করার উদ্যোগও দেখা যায় না। তাই বলছি, দেশবাসীর অর্থে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, দেশের সেবায় নিয়োজিত না হয়ে তাঁদের বিদেশে ঠাঁই নেওয়ার এ প্রবণতা দুর্ভাগ্যজনক। গোপালগঞ্জ