অন্ধকারের ঘূর্ণাবর্তে লাখো শিশুর সোনালি ভবিষ্যত্

বাংলাদেশে এখন ভয়ংকর পেশার নাম শিশুশ্রম। এদেশে দিনে দিনে শিশুশ্রম আর শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনই জীবন ধারণ আর দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে দ্বিধাবোধ করছে না শিশুরা। দেশে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু নিষিদ্ধ শিশুশ্রমের শিকার। এদের সোনালি ভবিষ্যত্ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। হয়তোবা আমাদের প্রতিবেশির শিশুটিই অল্প বয়সে বিভিন্ন কঠিন কাজে জড়িয়ে পড়ছে। যে বয়সে তাদের খাতা-কলম নিয়ে স্কুলে যাবার কথা ছিল, ঠিক সেই বয়সে শুধু দারিদ্র্যের কারণে আজ ওরা শিশুশ্রমিক। গত চার বছরে শিশুশ্রমিক বেড়েছে ১০ লাখ। ২০১১ সালের সরকারি একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা এখন প্রায় ৭৯ লাখ। এদের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশুশ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১৩ লাখ শিশু এক সপ্তাহে ১শ’ ৬৮ ঘণ্টার মধ্যে কাজ করছে প্রায় ৯০ ঘণ্টা। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও-র জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরনের। আর এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছে শিশুরা। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে মোটর ওয়ার্কসপে কাজ, ওয়েল্ডিং, গ্যাস কারখানা, বেলুন কারখানা, লেদ মেশিন, রিকশা চালানো, মাদক বহন, বিড়ি শ্রমিক, বাস-ট্রাকের হেলপার, লেগুনার হেলপার, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহশ্রমিক, এমব্রয়ডারি, জাহাজশিল্প, চিংড়ি হ্যাচারি, শুঁটকি তৈরি, লবণ কারখানা, বেডিং স্টোরের শ্রমিক, ইট ভাঙা, ইটভাটা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, ট্যানারি এবং রঙ মিস্ত্রিসহ আরো বিভিন্ন ধরনের কাজ। সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে শিশুদের দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত শিশুশ্রমের দায়ে বাংলাদেশে একজনকে শাস্তি পেতে হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজনকে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে। আবার জাতীয় শিশু নীতিতে ১৪ বছর বয়সের কাউকে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করার বিধান দেওয়া আছে। আইনে শূন্য থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সবধরনের শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ৫ বছর বয়সের শিশুকেও জোর করে নানা ধরনের কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। জানা গেছে, সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইএলও-র ১৮২ নম্বর সনদে স্বাক্ষর করেছে। আইন অনুযায়ী শিশু বিক্রি, পাচার, ভূমি দাসত্ব, বেশ্যাবৃত্তি, অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য শিশু ব্যবহার, মাদক দ্রব্য উত্পাদন ও পাচারে শিশু ব্যবহার করাকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সনদ অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সের কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের অন্যতম বা একমাত্র কারণ হলো দারিদ্র্য। ফলে এসব পরিবারের শিশুরা তাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য শিশুশ্রমে নিয়োজিত হয়। নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য তারা জীবন বাজি রেখে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হয়। এখন সেইসব শিশুর পুনর্বাসন অতীব জরুরি। এরপর থাকে তাদের শিক্ষাদান। কর্মজীবী শিশুদের জন্য বিদ্যালয়মুখী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। আর এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অর্থাত্ শিশুশ্রম নিবারণ করতে হলে প্রয়োজন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ। সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলোর আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবেই জাতি হবে শিক্ষিত এবং দূর হবে শিশুশ্রম নামক ভয়াবহ ক্ষত। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়