[ বা জে ট ]
বাজেটে কর ব্যবস্থা :দাতা, গ্রহীতা,
অনাগ্রহী সবাই একই পথের পথিক
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৪, ২১:৪০
আজকের আমার লেখার মূল প্রতিপাদ্য কর এবং কর ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা। কারণ কর এমনই একটি স্পর্শকাতর বিষয়, যেখানে করদাতা খুশি না, যিনি কর দেন না তিনিও অখুশী এবং যিনি কর নেন তিনিও অসন্তুষ্ট।
অপরদিকে করের কারণ-অকারণ নিয়ে যারা সমালোচক বা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে ভালোবাসেন, তাদের অনেকের ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য “যিনি কর দেন; তাকে চোর হতে হয়, যিনি কর দেন না; তাকে চোরের খাতায় নাম লিখাতে হয় আর যিনি কর নেন তিনিও একই দলের সদস্য।”
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিজ্ঞানী, লেখক এবং সমাজ বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন কর সম্পর্কে এক মন্তব্যে বলেছিলেন, “Certainly? In this world nothing is certain but death and taxes”.
তবে একথাও সত্য যে, এই কর ব্যবস্থায় যদি কোন গুণগত পরিবর্তন আনতে হয় তাহলে এই তিন গোষ্ঠীরই সমন্বয়ে তা করতে হবে। একজনকে বাদ দিয়ে অন্য দুজনের সমন্বয়ে কর আদায়ে গুণগত পরিবর্তন হবে না, তেমনি করের টাকাও বাড়বে না।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এ ধরনের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও অসুস্থ পরিবেশ নিয়েই আমার এই লেখা। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে কর কাঠামো নিয়ে শুধু গবেষণা নয়, বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আর যে সরকার, দেশের কর কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংস্কারের সাহস ও উদ্যোগ নিবেন, তারাই দেশের অর্থনীতির জন্য আগামী প্রজন্মের কাছে নন্দিত হবেন এবং দেশের রাজস্বখাত বর্তমান অপেক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী ও সকলের কাছে স্বচ্ছ হবে বলে আমার ধারণা। কারণ সংস্কার করের অর্থ ব্যবহার প্রশ্নে সরকারের জবাবদিহিতা বর্তমানের তলানী থেকে উপরে নিয়ে আসবে, কর ব্যবস্থা নিবর্তনমূলক না হয়ে, প্রগতির খাতায় লিপিবদ্ধ হবে।
গত ৫ জুন বৃহস্পতিবার সংসদে ঘোষিত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেট নিয়ে প্রতিবারের ন্যায় এবারও নানা কথা, নানা মন্তব্য, সমালোচনা এবং প্রশংসা সবই হচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং সরকারকে খুশি রাখতে চায় এমন মালিকানার বেসরকারি খাতের টেলিভিশন খুললে বাজেট নিয়ে যে আলোচনা তার বেশিরভাগ হল; বাজেট আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে, বাজেট বিনিয়োগ বৃদ্ধির সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং বাজেটের প্রায় সবই ভাল। শুধু প্রয়োজন সকল দলমত নির্বিশেষে সর্বাত্মক সহযোগিতা।
অপরদিকে বাজেট সমালোচনায় যারা নিজেদের কম-বেশি ক্ষমতার বিপরীতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তারা পরম বিজ্ঞভাবে বলছেন এটা একটা নির্ভেজাল নির্বাচনোত্তর বাজেট। বিগত জুন মাসের ২০১৩-১৪ অর্থবছরের (চলতি অর্থবছর) জন্য ঘোষিত বাজেটকে এরাই আখ্যা দিয়েছিলেন, ২০১৩-১৪ বাজেট একটি নির্ভেজাল প্রাক-নির্বাচন বাজেট। তবে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত বাজেট ঘোষণাকালে, বাজেটের সার্বিক কাঠামো ও বরাদ্দের অগ্রাধিকার সম্পর্কে খোলামেলাই বলেছেন, ‘এই বাজেটে সরকারের বিগত বাজেটের অসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মসূচির বাস্তবায়নও অগ্রাধিকার পেয়েছে’। প্রস্তাবিত বাজেটে পদ্মা সেতু, চট্টগ্রাম-ঢাকা সড়কের উন্নয়ন, বিদ্যুত্ খাতের অগ্রাধিকারসহ বেশকিছু অবকাঠামোগত প্রকল্প অগ্রাধিকার ও অর্থ বরাদ্দ অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যেরই বহি:প্রকাশ। কিন্তু আমার কাছে প্রায়শই মনে হয়, আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়ন ও ঘোষণা এবং জুন মাস শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট পাস সবই যেন একটি অসম্পূর্ণ দলিল এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপির আনুষ্ঠানিকতা। ইচ্ছে করেই বাজেটকে অর্থনীতির ঐতিহাসিক দলিল বলিনি। কিন্তু কেন? এই নিয়ে কথা বলার আগে, নয়া অর্থবছরের বাজেট জনমনে কর কাঠামো করের মাধ্যমে সম্পদ আহরণ নিয়ে যে সংশয়, উদ্বেগ এবং আশা-নিরাশার মেঘ তৈরি হয়েছে তা নিয়েই আজকের প্রতিবেদনটি শেষ করতে চাই।
শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বাজেট ও কর একে-অপরের পরিপূরক। তবে শিল্পোন্নত দেশে সরকারকে যেকোন কর কাঠামো ব্যবস্থায় ও করারোপ ক্ষেত্রে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বিষয়টি ভীষণভাবে গুরুত্ব পায়। যা আমাদের মত দেশে এই বালাই থেকে সরকার ও অর্থমন্ত্রী এখনও Immune (ইমিউন) বা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাই সরকারের নতুন কর আরোপ, কর বেয়াত, করের ব্যাপ্তি সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা মূলত যে পরামর্শ ও হিসেব-নিকেশ ধরিয়ে দেয়, তা কর আদায়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়ে যায়।
যদি সার্বিক বাস্তবতার কারণে বছর শেষে রাজস্ব আদায় না হয় তাহলে দায়ী করা হয় বিরোধী দলের হরতালের ন্যায় কর্মসূচি, আর তা না হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা খরা, এটাও যদি না হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বা বিশ্বে যে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন চলছে তারই প্রভাবে রাজস্ব কার্যক্রম কার্যতভাবে সফল হয়নি। আর এ যুক্তি যদি না টিকে তাহলে দেশের মুদ্রানীতি ঘোষিত রাজস্ব কার্যক্রমকে কোন সমর্থন যোগাতে পারেনি, তাই বাজেটের কাঙ্ক্ষিত অর্থ আসেনি। এ ধরনের খাড়া যুক্তির সাথে ক্ষমতাসীন সরকারকে চোখ বুজে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই। কারণ জনগণের কাছে রাজস্ব কার্যক্রমের কর্মকর্তাদের কোন দায়বদ্ধতা থাকলে অবশ্য এ ধরনের বক্তব্য টিকত না।
২০০১৪-১৫ কর ব্যবস্থা : নতুন বছরের জন্য কর কাঠামো ও আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় রাজস্ব কার্যক্রমের আওতায় নতুন বাজেটে অর্থ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাজেট প্রস্তাবে (২০১৩ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে সংসদে পেশকৃত বাজেট) এই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা।
যদিও সংশোধিত বাজেটে এই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় পুন:নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেকের হিসেবে, চলতি অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা মূল বাজেটের প্রস্তাবে রাখা হয়েছিল তা অপেক্ষা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হবে। এ কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিগত অর্থবছরে (২০১২-১৩) আমাদের নীট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অতএব রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নানা অর্থনৈতিক সমস্যায় পার হয়ে আশা বছরটিতে রাজস্ব আয় বিগত বছর অপেক্ষা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি প্রায়ই অসম্ভব।
অতএব সহজ-সরল অঙ্কে বলা যায়, সরকারকে নয়া বছরে ন্যূনপক্ষে ২৭ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কর বা রাজস্ব আদায় করতে হবে।
সরকারের ঘোষিত নীতিমালা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অধীন যে কর বা অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ করা হবে তার শতকরা সাড়ে ৩৮ ভাগ আসবে আয়কর থেকে আর শতকরা ৩৭ ভাগ আসবে ভ্যাট মূল্য সংযোজন করের মাধ্যমে এবং শতকরা প্রায় ২৪ ভাগ আদায় করা হবে শুল্ক বা কাস্টমস খাতের মাধ্যমে।
বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রত্যক্ষ করের আওতায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষের TIN (টিন) ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর আছে এবং এদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ কর দেয়।
এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১ ভাগেরও কম। বর্তমানে যাদের আয় বছরে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার নীচে তারা কর প্রদানের আওতায় নেই। ৩ লাখ টাকা যাদের আয় তাদের বছরে আয়ের শতকরা ১০ ভাগ এবং ৩০ লাখ টাকার উপরে যাদের আয় তারা বছরে শতকরা ২৫ ভাগ হারে আয় কর দেয়ার কথা।
কয়েকটি দেশে করের অবস্থান :তবে এক্ষেত্রে আমরা পাকিস্তানিদের থেকে ভাল আছি। পাকিস্তানে সে দেশের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৫৭ ভাগ বা মোট ১৯ কোটি মানুষের মাত্র ৭ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ আয়কর দেয়। পাকিস্তান কর ফাঁকির প্রশ্নে স্বর্গরাজ্য বলা যেতে পারে। সেখানে যার যত ক্ষমতা তিনি তত কর ফাঁকি দিতে পারেন। বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার পৃষ্ঠা কর সম্পর্কিত যে দলিল তৈরি করেছেন তাতেও ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের মানুষের হিসেব একভাবে রাখতে পারেনি। তবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেখানে শতকরা ২ থেকে ৩ ভাগ লোক আয়কর দেয়।
২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে ভারতে যারা বছরে ২ লাখ টাকার নীচে আয় করেন তারা করের আওতা থেকে বাইরে। যারা ২ লাখ থেকে ৫ লাখ রুপি আয় করে তাদেরকে শতকরা বাত্সরিক আয়ের ১০ ভাগ, ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ রুপি পর্যন্ত আয় করে তাদের শতকরা ২০ ভাগ হারে এবং যারা ১০ লাখ রুপির অধিক বছরে আয় করে তাদেরকে শতকরা ৩০ ভাগ হারে আয়কর দিতে হয়। নয়া অর্থবছরের জন্য ভারতের এই ৩০ ভাগ হারের কর আদায়ের নমুনা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়েছে।
বর্তমান পৃথিবীতে কোরিয়ান দেশসমূহ এবং এশিয়াতে জাপানী জনগণ বেশি কর দেয়। জাপানে বছরে ২ লাখ ২৮ হাজার ৮৮০ ডলার কেউ আয় করলে এর শতকরা ৫০ ভাগ তাকে কর দিতে হয়। তবে গড়ে জাপানীরা তাদের আয়ের শতকরা ২৩ ভাগ পর্যন্ত আয়কর দেয়।
কর ও কর ফাঁকি :কর আদায় ও কর ফাঁকি নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা ও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখন থেকে কয়েক হাজার বছর আগেও কর নিয়ে বিভিন্ন রাজ-রাজাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে কর আদায় বা কর ফাঁকি দেয়ার কারণে। এশীয় অঞ্চলে কর নিয়ে বহু জেল-জুলুম-অত্যাচারের নানা তথ্য আছে। অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের এই ‘কর’ ও ‘কর ফাঁকি’ নিয়ে সাহিত্য ও নাটক রচনার ইতিহাসেও ঘাটতি নেই।
মৌর্যগুপ্তের আমলেও রাজা তার প্রজাদের কাছ থেকে কি কৌশলে কিংবা জোরপূর্বক কর আদায় করতে পারে তা নিয়েও রাজা মৌর্যগুপ্তের অর্থ ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌটিল্য তার কর আদায়ের নানা প্রেসক্রিপশন ইতিহাস ঘাঁটলে সে তথ্য পাওয়া যায়।
বৃটিশ আমল বা তার আগে বা পরে ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময় রাজ-রাজা ও জমিদারদের কর আদায়ের ইতিহাস কালি দিয়ে মাখা। বেশিরভাগ জমিদারের প্রজাদের প্রতি অমানবিক অত্যাচার ও জোর করে কর আদায়ের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিশীল অধ্যায়কে বাদ দিয়ে পারিবারিক জমিদারীর ইতিহাস সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর লেখা ‘রায়তের কথা এবং বত্যনিকের পত্র’ উল্লেখ করা হয় যে, জমিদারী প্রথা হস্তান্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও আগ্রহী ছিলেন না। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যুক্তি ছিল, এ প্রথায় জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে না।
তথ্যমতে, ১৮৯৪ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারী অধীন জমির খাজনা বাড়িয়ে দেন এবং বৃটিশ মার্টিন কোম্পানির কাছ থেকেও নয়া জমিদারী ব্যবস্থাপনা ক্রয় করেন। এই সময় জমিদারদের বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রতিবাদ ও বিপ্লব মাথাচাড়া দিয়েছিল, তা ঠাকুর পরিবার শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এই সময় শিয়ালদহের ইসমাইল মোল্লা নামে জনৈক কর প্রদানের বিদ্রোহীকে দমন করাও সম্ভব হয়েছিল।
করের সাথে সাধারণ মানুষের জীবন-যৌবন জড়িয়ে থাকার ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দীর। সভ্যতার সাথে সাথে কর আদায় ও প্রদানের নিয়মনীতি পাল্টেছে কিন্তু কর প্রদানকারীর ও গ্রহণকারীর সম্পর্ক প্রায় একই রয়ে গেছে।
মৃত্যুর হাত থেকে যেমন কারো রেহাই নেই, তেমনি করের জাল থেকে কারো মুক্তি নেই। যে ব্যক্তি আয়কর দিবেন না, তিনি হয় মূল্য সংযোজনের কিংবা আমদানি কর বা উন্নয়নের করের আওতায় আসবেন। যারা এইগুলোর একটির মধ্যে পড়ে না, তারা সরকারের বিদ্যুত্, জ্বালানি তেল বা অন্য কোন সার্ভিস সেক্টরের উপর বসানো নয়া করের দায় বহন করবেন। যেমন পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্যের উপর ভর্তুকি প্রত্যাহার বা মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়া হলে পরিবহন খাতে যে ব্যয় বাড়বে, তা যাত্রীসাধারণের ঘাড়েই আসবে। এর মধ্যেও যারা আসবেন না, তাদেরকে সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে যে অনুত্পাদনশীল খাতে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে, তার ফলশ্রুতিতে সংশ্লিষ্ট পণ্যের যে মূল্য বাড়বে তা সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লেও বর্ধিত পণ্যের মূল্য আকারে করের বোঝা বইতে হবে। এর বাইরেও দেশের সকল স্তরের মানুষকে এক অলিখিত করের মধ্যে জীবন চালাতে হয়। তা ভিক্ষার ফকির থেকে শুরু করে দেশের সবচেয়ে ধনীকেও কর দিতে হয় আর এই অলিখিত করের নাম ‘চাঁদা’। শহর কিংবা গ্রামের হাট-বাজারে ভিক্ষার জন্য কোথায় কাউকে বসতে হলে, হয় তিনি এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অধীনে বা দলীয় মাস্তান থেকে শুরু করে বহু পথ-ঘাটে চাঁদা দিলেই সে অবাধে ভিক্ষা করার সুযোগ পাবে। আর অপরাধীকে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিকে তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প সরকারিভাবে পরিচালনার নানাবিধ কর ও বাইরে নানা ধরনের ঘুষ, চাঁদা, পূজা-পার্বণ কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা সরকারি বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের জন্য তাকে ‘স্পন্সর’ হওয়ার কাহিনী এদেশে এখন ‘করের’ উপর কর হিসেবে চেপে বসেছে বলে অভিযোগ।
কর নিয়ে গাল-গল্প অনেক করা যাবে, নাটক, সাহিত্য ও কবিতা চর্চাও সম্ভব। কিন্তু কর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিভাবে অর্থবহ এবং করদাতারা কর প্রদানে উত্সাহী হবে এটাই বড় প্রশ্ন। আর এ সমস্যার সমাধানে আমার মত সাংবাদিক বা অর্থনীতিবিদরা শুধু সঙ্কট তুলে ধরতে পারবে কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের হাতে।
বাংলাদেশের নয়া অর্থবছরের কর ব্যবস্থাপনার কথাই বলা যাক। অন্যান্য করের বিষয়ে না ঢুকে শুধু আয়করের হিসেব নিলে আগামী অর্থবছরে বাজেটে ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা আয় কর বাবদ সরকারি কোষাগারে আনার হিসেব দেয়া হয়েছে। এই আয় চলতি অর্থ বছর (২০১৩-১৪) থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা যা ১০ মাসে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।
নয়া বছরে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি-শ্রেণীখাত থেকে আদায় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে বসানো উেস কর থেকে আসবে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা যা মোট অর্থ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ৬৩ হতে ৬৫ পর্যন্ত। বাকি অর্থ, বড় বড় কোম্পানী ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে আসবে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। নয়া বছরে করের আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন প্রার্থীদেরও আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকর বা আয় বৃদ্ধির সুযোগ কতটা হবে তা পুন:বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
সরকারের বাজেট হিসেবে কর আয়ের হিসেব না হয় মিলানো গেল কিন্তু করদাতাদের কর প্রদানে হয়রানি বা কর দেন না, কিন্তু দিতে চান, তাদের সীমাহীন উদ্বেগ এবং যারা কর আদায় করেন তাদের মধ্যে দুর্নীতি সার্বিক রাজস্ব কার্যক্রমকে যে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে তার সমাধান কিভাবে হবে এটাই আমাদের বড় প্রশ্ন।
আমার মনে হয়, নিম্নোক্ত কয়েকটি পদক্ষেপ দেশের রাজস্ব কার্যক্রমকে বর্তমান অপেক্ষা অধিকতর কল্যাণকামী ও প্রগতিশীল কর কাঠামো বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে এবং কর দাতার সংখ্যাও কাঙ্ক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
(১) কর মানে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ। আর এই অর্থ ব্যবহারে অন্যান্য উন্নত দেশের ন্যায় সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে, যাদের কর দেয়ার সামর্থ্য আছে, তারা কর প্রদানে হয়তো এগিয়ে আসবে।
(২) কর প্রদানে কাউকে বেশি সুবিধা বা ন্যায্য সুবিধা থেকে কেউ বঞ্চিত হচ্ছে, এ ধরনের চেতনাবোধ থেকে সাধারণ করদাতাকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে, বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য কর রেয়াত বা আইন প্রণেতাদের জন্য গাড়ির আমদানি শুল্ক মওকুফের সুবিধা সার্বিক রাজস্ব কার্যক্রমের দুর্বলতা থেকে মুক্ত করতে হবে। যা কর দাতার মনস্তাত্ত্বিক এবং চিন্তা-চেতনায় বৈষম্য বিষয়টি লোপ পাবে।
(৩) আয়করের আইন-কানুন সমানভাবে বলবত্ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রয়োজন। একই সাথে আয়করের ব্যবস্থাকেই কেটে-ছেঁটে বাস্তবসম্মত করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। কারণ ব্যক্তিগত শ্রেণীর আয়কর খাত থেকে যে ১৫০০ হতে ২০০০ কোটি টাকা পাওয়া যায়, তা মোট চাহিদার খুবই কম। এর চেয়ে পরোক্ষ ও কর্পোরেট করের সাহায্যে এই অর্থ আয়ের পথ করা যায় কিনা তা এ মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখা দরকার। এ কথাও ঠিক ‘পরোক্ষ কর পরিচালনা সহজতর এবং প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা নয়’ এটা মেনে নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার করা গেলে বাজেটে কর প্রদানের ক্ষেত্রে একটা সমতা আনা যেতে পারে। যারা কর ফাঁকি দেন এবং যারা কর দিতে অনাগ্রহী তাদের মধ্যেও রাজস্ব কার্যক্রমের উপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ “The difference between tax avoidance and tax evasion is the thickness of a prison wall”. এ কথাটি সকলের উপলব্ধির সময় এসেছে।
লেখক :সাংবাদিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক