ষোল আনা নাগরিকের এই শহর
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৪, ২০:৫২
‘বিজনেস উইথ এ হিউমেন ফেস’ — বলে একটি কর্পোরেট আইডিয়া সামপ্রতিক সময়ে খুব ব্যবহূত হচ্ছে। এই আইডিয়ার প্রচারকরা সম্ভবত মানবতার মাধ্যমে মুনাফা ধারণাটি আমাদের মগজের মধ্যে গেঁথে দিতে চান। ধনকুবের ফোর্ড কিংবা রকফেলার থেকে বিল গেটস, রূপার্ট মারডক, সিলভিয়া বার্লুসকোনি, হেনরি লুচে, টাটা বিড়লা কিংবা আম্বানী সকলেই সেই অনুসারে মানবতার মাধ্যমে মুনাফা কামাচ্ছেন। আহারে ! ‘ফিল্যানথ্রপি’ শব্দটি যদি সত্যিই এতো সরল কিংবা জলবত তরলং হতো !! ‘ফিল্যানথ্রপি’ শব্দের অর্থ অভিধানে দেয়া আছে জনহিতৈষণা। কিন্তু সত্যিকারের জনহিতৈষণার দেখা মিলবে কেবল পুস্তকাদিতেই। সত্য এই যে বোকা বগারাই কেবলমাত্র ফান্দে পড়িয়া (পড়ে) বোঝে, দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ। লেনদেন ভিন্ন এই পৃথিবীতে কিছুই নিষ্পন্ন হয় না। এই সত্যটি আমরা আরো বেশি করে বুঝতে পারি জুন মাসে। রাষ্ট্র তার অর্থনীতি নিয়ে বেশ ব্যস্তবাগীশ হয়ে ওঠে, কর্পোরেট পুঁজি নানারকম খেল খেলে। উপরিতলের বিশ্লেষণে হয়তো মনে হবে বাহ! আমাদের অর্থনীতি তো ভারি চাকচিক্যময়। কিন্তু সেই চাকচিক্যময় অর্থনীতি যে কী ভয়ংকর রকম আত্মঘাতী সেটা আর ক’জন বিশ্লেষণ করেন ? আই.এম.এফ মাথায় হাত বুলিয়ে প্রায় ৭০০টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক উঠিয়ে দিয়েছে। এবার তাই আমদানিকৃত পণ্যের দাম কমবে। কিন্তু দেশি পণ্য কি পেরে উঠবে ওই জেল্লাদার মোড়কের সঙ্গে ? মোড়কের গায়ে বাংলা বর্ণ দেখলে সুপারশপের ক্রেতারা এমনিই নাক সিটকান। কোথায় সেই বিপ্লবী যুগ, কোথায় রজনীকান্ত সেন আর কোথাই বা গলায় হারমোনিয়াম বাঁধা খদ্দর পরিহিত স্বদেশীরা, যারা মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেয়ার জন্য নিঃস্বার্থ আবেদন জানিয়ে বেড়াবেন ? স্বদেশীদের বদলে এসেছে অনলাইনের সেল বাজার যারা প্রতি মুহূর্তে আপনাকে জানিয়ে দেবে, ইতালির কার্টিয়ার আর ইংল্যান্ডের ম্যাক্স ফ্যাক্টরের সার্ভিস কী ভীষণই না ভালো ! বিদেশি যে কোন পণ্যই বিবেচিত হয় সভ্যতা এবং মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে।
গুলশান-বারিধারার কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বদেশী পোশাক পরিহিত আপনার অনিবার্যভাবেই মনে পড়ে যাবে শেখ সাদীর গল্পের কথা। যিনি পোশাকের বরাতে নিমন্ত্রণালয়ে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে নিমন্ত্রণের খাবারগুলো পোশাকেরই প্রাপ্য ভেবে পোশাকের পকেটেই ভরেছিলেন। শেখ সাদীর দৃষ্টান্ত আমাদের হতাশা আর ক্ষোভের ওপর সামান্য প্রলেপ বুলিয়ে দিলেও আমাদের নৈতিকতা আর দেশি পণ্য প্রেমের যে মৃত্যুঘন্টা বেজে গেছে—সেকথাও অবিরাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন —টাকার অভাবে দেশ গরীব হয় না, দেশ গরীব হয় ভরসার অভাবে। কিন্তু ভরসা করার মতো আমাদের আছে কে? আওয়ামী লীগের মতো আধা প্রগতিধারী, বি.এন.পির মতো অতিশয় সুবিধালিপ্সু, জামায়াতের মতো সহিংস প্রতিক্রিয়াশীল, হেফাজতের মতো অন্ধ আগ্রাসী আর বামদের মতো নিষ্প্রভ নিষ্ক্রিয় শক্তি—এর মধ্যে আপনি কার উপর ভরসা করতে পারবেন? আছে গ্লোবাল পুঁজির পোষা কিছু বুদ্ধিজীবী, আছে পশ্চিমা শক্তির তল্পিবাহক কিছু এজেন্ট। আছে পাঁচটি চ্যানেলের বুভুক্ষু কিছু ক্যামেরা, যাদের কাজ কেবল সংবাদ বিক্রি করা ( লক্ষ্য করুন প্রতিটি সংবাদের শিরোনাম কোন না কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে সংযুক্ত। সংবাদ যখন বিক্রি হয়ে যায় তখন নিশ্চয়ই সে তার নিরপেক্ষতা হারায়)। আছে ৪ হাজারের মতো দৈনিক পত্রিকা যা না পড়লে আপনি কিছুই জানবেন না, আর পড়লে যা জানবেন তার সবই ভুয়া। আমরা বাস করি এমন এক শহরে যেখানে পথের বিভীষিকা মানুষের মুখোমুখি বসবার স্পৃহার মৃত্যু ঘটায়। এই শহর তিল তিল করে লুট করে নিচ্ছে আমাদের সমস্ত প্রাণশক্তি। নিজেদের তৈরি ফাঁদে আটকে আমরা এখন স্খলন লোভ আর রিপুর রূঢ় প্রতিযোগিতায় মত্ত। স্কুল-কলেজের পড়াশোনাকে আমরা পরিণত করেছি জি.পি.এ ফাইভ নামক এক আগ্রাসী দানবের ঘোর পাকচক্রে। জ্ঞানমুখিনতা নয়, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রেও জি.পি.এ ফাইভ পাওয়াটাই এই ফানুস নাগরিক জীবনের লক্ষ্য। তথাকথিত পরীক্ষায় তথাকথিত ভালো নম্বর না পেয়ে কেউ যদি সিলেবাসটিকে গভীরভাবে বুঝতে চায় তাকে পদে পদে হয়রানির মুখোমুখি হতে হবে।
রাজনৈতিক জমিনে সদ্য পদপ্রাপ্ত যে তরুণটি টেন্ডার পারমিটের বাণিজ্যায়নে নিজেকে না জড়িয়ে সত্যিকারের রাজনীতি করতে চায়, ক্লেদাক্ত রাজনীতির খপ্পরে পড়ে একসময় তাকে দলচ্যুত হতে হয়। আছে দেশ বন্দনার নামে টেলিকম কোম্পানীর ছদ্ম দেশপ্রেম প্রদর্শনী যেন আমাদের সংস্কৃতি আমাদের চেয়ে তারাই বোঝে বেশি। ভাষা দিবস, বিজয় দিবসসহ বিবিধ সামষ্টিক চেতনার দিনগুলোতে দেশপ্রেম নামের অলীক জিনিস তারা আমাদের বুঝিয়েই ছাড়বে। বিলবোর্ডে, নিয়নবোর্ডে, সংবাদপত্র আর টিভি পর্দায় সেই উগ্র উত্কট দেশপ্রেমের নমুনা মিলবে। এই নগরীর ফুটপাতের দিকে তাকিয়ে দেখুন, প্রত্যেকেই যেন তাড়া খাওয়া কোন ভীত জন্তু। কেবল মরিয়া হয়ে ছুটছে। ছুটছে তো ছুটছেই। এই ছোটার যেন কোন শেষ নই। যে কোন পথেই হোক, হোক তা নৈতিকতা বিবর্জিত, হোক তা পঙ্কিল, ওপরে এক্কেবারে শীর্ষে ওঠাটাই এই যাপিত জীবন-দর্শনের গোড়ার কথা। কোথায় সরদার ফজলুল করীম ? আমরা কেউ আর তাকে মনে রাখিনি। মনে রাখিনি তার উচ্চ চিন্তা আর সহজ জীবনের দর্শনের কথা। এখন অর্থই যাবতীয় সবকিছুর মান নির্ধারক। তোমার লেক্সাস আমার বিএমডাব্লিউ, অতএব আমি তোমার উপরে। আমাদের দশদিক বলে কিছু নেই, আছে একটাই দিক, তা হলো এভারেস্ট ফুঁড়ে মাথা আকাশ স্পর্শ করলেও আমাদের উপরে ওঠার শেষ হবে না। আমরা মনেও করতে চাই না শতাব্দীর সবচেয়ে প্রাচুর্যবান মানুষটির মন কোন সোনালী, রূপালী ব্যাংকের একাউন্টে নয় বরং ঘুরে বেড়িয়েছে বিম্বিসার আশোকের ধূসর জগতে। কী হবে সেই অশোকের ধূসর জগতে ঘুরে বেড়িয়ে ? তাতে তো কয়েকখানা ধূসর পান্ডুলিপি ছাড়া আর কিছু রেখে যাওয়া যাবে না ? তার চেয়ে বরং নিজেকে কর্পোরেট পুঁজির কাছে বিক্রি করে আমরা একেকজন কর্পোরেট দাস হতেই পছন্দ করি। জীবনের সব দান ছকের নির্ভুল হিসেবে খেলতে চাই। ঠিক থাকা টাইয়ের নট আবার ঠিক করি, পাছে আমাদের শাহরিক রুচি কোনরকম প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
সারাজীবন আত্মসর্বস্ব সফলতা আমাদের তাড়া করে আততায়ীর মতো। আজকের শিশুরা কেউ অমলকান্তির মতো রোদ্দুর হতে চায় না। তাদের নেই অমলকান্তির সেই অপরূপ সারল্য। শব্দরূপ জিজ্ঞাসা করলে তারা কেউ হা করে বাইরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখে না। কল্পনাশক্তিকে ধামাচাপা দিয়ে মুখস্থবিদ্যায় তাদের এমনভাবেই পারদর্শী করা হয়েছে যে শিম্পাঞ্জীর মতো তারাও হয়ে উঠেছে মুখস্থ নকলনবীশ। কিংবা কে জানে তাদের ক্লাসে হয়তোবা বাংলা ব্যাকরণের ব্যবহার নেই। নেই বাংলা শব্দরূপ শেখার তাগিদ। শুধু ইংরেজিটা ঠিকঠাক জানলেই হলো। ইংরেজি ক্ষমতাবান এবং সফলদের ভাষা। সেইটেই ঠিকঠাক জানলে হলো। তাহলে মেকলের উত্তরসূরীদের দাস হয়ে থাকা যাবে আরো কয়েক প্রজন্ম। কী দরকার ক্ষান্ত বর্ষণ কাকডাকা বিকেলের লাজুক রোদ্দুর দেখতে চাওয়ার ? কী দরকার জাম আর জামরুলের পাতায় লেগে থাকা একটুখানি রোদ্দুরের গন্ধ নেবার? তাদের হতে হবে চৌকস, কৌশলী। ভুলেও রোদ্দুর হতে দেয়া চলবে না। সে বাঁচবে কেবল নিজের জন্য। একেকজন এইরকম সাচ্চা স্বার্থপর মানুষ বানাবার জন্য আমরা তাদের পিঠে চাপিয়ে দিয়েছি, তাদের চেয়ে বেশি ওজনদার বইয়ের বোঝা। হাতে আইপ্যাড, কানে আইপড। শিখিয়ে দিয়েছি সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে, কারো দুঃখে মন না দিয়ে কেবল উপরে ওঠার জন্য। এই উপরে ওঠার মানে হলো একটি আদ্যপান্ত বাণিজ্যিক মন তৈরি। আমরা নিজেরাও তো তাই হয়েছি। এক-একটি কর্পোরেট রোবট। ধূলি ধূসরিত এই শহরের দিয়াশলাই বক্সের মতো অফিসে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে অসংখ্য ফাইল কাগজ, ঋণ, ইনক্রিমেন্ট, প্রমোশন, বোনাসের তাড়াহুড়োয় প্রতিনিয়ত আমরা উপেক্ষা করে যাচ্ছি মানবিক জীবন। গঙ্গা ফড়িং নীল কুয়াশা: হিম কাঁচ পোকা, ভিজে মেঘের দুপুর কিংবা বৃষ্টি ভেজা শালিক কোনো কিছুই দেখার সময় আমাদের নেই। জীবন কি তা বোঝার সময় আমাদের নেই। কোনদিন পথ ভুল করে আমরা ধানসিঁড়ি নদীর কাছে যাবো না, পিকাসোর আশ্চর্য আঙুলগুলো দেখার স্বাদ জাগবে না আমাদের কোনদিন। যে জীবন মানবিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, সে জীবনে এসবের জায়গা কোথায়? কি ভালোই না হতো বর্ং ষোলআনা নাগরিক না হয়ে আমরা যদি একেকজন হয়ে উঠতাম একেকটি ধানসিঁড়ি নদী। রবীন্দ্রনাথের সাজেশান অনুযায়ী অন্তত একটা দিন যদি খোঁয়াড়ের মতো অফিস থেকে বেরিয়ে খোপের মতো ফ্ল্যাটগুলোতে ফিরে না গিয়ে যদি পথের মানুষের খবর নিতাম। হায়, ষোল আাানা নাগরিকের এ শহরে, এ এক অলীক স্বপ্ন বটে !!
লেখক: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব