আলোকপাত
দুষ্টু কুশীলব জন্মে কোথায়
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৪, ২১:৩৪
‘জন্ম হোক যথা-তথা কর্ম হোক ভালো’- স্কুল জীবনে পাঠাভ্যাসের বিষয় ছিলো; কিন্তু গ্রামীণ অশিক্ষিত সমাজে এখনো গালি-গালাজে জন্ম ইস্যুটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। অপরকে ছোট করতে বা মানসিক পীড়ন চালাতে বেজন্মা বলা হয়। কখনো জন্ম গ্রহণের স্থান-কাল উল্লেখ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হয়। তাহলে ব্যাপারটি কি দাঁড়াচ্ছে—জন্মের স্থান কাল পাত্র- সবই কিন্তু ধর্তব্যের মধ্যেই। তাহলে আমাদের সমাজ ও রাজনীতির দুষ্টু কুশীলবদের জন্ম তথা বেড়ে ওঠা আলোচ্য বিষয় হলে এজন্য দোষারোপ করা যায় না নিশ্চয় !
রাষ্ট্রযন্ত্রে অযোগ্য মেধাহীন লোক যখন লালিত হয়, তখন দেশ নিয়ে গভীর চিন্তা করার দরকার আছে। পেশাদারী কাজে মেধাহীনদের লালন আর নূর হোসেনের মত মূর্খের হাতে যখন তৃণমূল রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় তখন সাধারণ মানুষের ঘরের বউ নিরাপদ থাকতে পারে না। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে বড় দল। বড় হবার অনেক সুবিধা যেমন আছে তেমনি অসুবিধাও আছে। কথায় আছে অতি ছোট হয়োনা ছাগলে খাবে, অতি বড়ো হয়োনা ঝড়ে পড়ে যাবে। ঝড়ের কারণ একটিই, দুর্নীতি। ১৮৮৭ সালে লর্ড অ্যাকশন বলেছিলেন, ‘পাওয়ার টেন্ডস্ ট্যু করাপ্ট, অ্যাবসলিউট পাওয়ার করাপ্ট অ্যাবসলিউটলি। গ্রেট ম্যান আর অল-মোস্ট অল-ওয়েজ ব্যাড ম্যান।’ লর্ড অ্যাকশনের উক্তি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। তিনি তার উক্তির ব্যাখ্যাও দিয়েছেন, তিনি এই কথাই বুঝাতে চেয়েছেন- মানুষ খুব সহজেই কু-কর্মে প্ররোচিত হয় এবং এক্ষেত্রে তার শক্তি তাকে প্রলুব্ধ করে। অর্থ সম্পদ এক ধরনের শক্তি; কিন্তু তার চেয়েও বড় শক্তি রাজনৈতিক শক্তি। রাজনৈতিক শক্তি ছায়ার মতো তাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। এভাবে অনুকূল পরিবেশে সে বিশাল ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয় এবং এক সময় সে এর অপব্যবহারে মেতে উঠে।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পরে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একদা বললেন, ‘রাজনীতি করতে এসে অপরাধ করেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ সত্য উচ্চারণের জন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ। রাজনৈতিক অপশক্তি শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিকে কলুষিত করে না, এটি সম্মিলিত সরকার যন্ত্রকে কলুষিত করে। সরকার কাঠামো সফল হতে হতে তার আকৃতিগত কাঠামো বড় হয়। এভাবে বড় হওয়ার প্রয়োজনে যখন দুষ্টু-প্রতিভার অধিকারী জনপ্রতিনিধি ঢুকে পড়ে তখন তারা জনগণের জন্য আর ভালো কিছু করতে পারে না, বরঞ্চ জনগণ এদের হাতে উল্টো নাকাল হতে থাকে। তাই রাজনীতি এবং সরকারের রাষ্ট্র যন্ত্রের সবক্ষেত্রে মেধা ও সততার মূল্যায়ন শিকড় থেকেই প্রয়োজন। কেননা কুচুরিপানা অনেক বেড়ে গেলে উহা পরিষ্কার করা হয়ে ওঠে ব্যয়বহুল এবং কষ্টকর।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরার সুযোগে দেখেছি কাদেরকে কী প্রয়োজনে রাজধানী থেকে দূরে রাখা হয়। কিছু অপরাধীকে খাগড়াছড়ি বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হয় সত্য, তবে অনেক সময়ই যোগ্য মেধাবী এবং তোষামোদী চরিত্রের নয়, এমন লোককের বদলি এবং নিয়োগ হয়ে থাকে দেশের পার্বত্য এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সুযোগ-সন্ধানীগণ রাজধানী ও এর আশে পাশে নিয়োগ পেয়ে বাড়তি পারিতোষিক উপার্জন এবং স্ব-স্ব প্রভুদের তুষ্টিতে নিবেদিত থাকে। মন্ত্রীদের কিন্তু তাদের ছেলে মেয়েদের দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়তে কোন নির্দেশ দিতে হয় না। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে এবং সব সরকারের আমলে। কথায় আছে—‘চাচায় চৌকিদার থানাই আমাগো’। রাজনীতির এই দুষ্টু কুশিলবরা প্রায়ই সমাজের আরেক দুষ্টু চরিত্রের সাথে বিরোধে লিপ্ত থাকে। এভাবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে আরেক দুষ্টের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। এটি বরঞ্চ মন্দের ভালো, কেননা বর্তমানে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা একে অপরকে মেরে কেটে শেষ করছে। এক্ষেত্রে তৃণমূল নেতারা এমনকি গড ফাদাররা ডাইনোসরের মতো হয়ে যায়। বিবর্তনবাদে চার্লস ডারউইন বলেছিলেন, ‘দে আর স্টুপিড।’ অর্থাত্ ডাইনোসররা ছিলো নির্বোধ, কেননা তারা একে অপরকে খেয়ে ফেলতো। ডাইনোসর নির্ভর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কোন সরকারই সফল হতে পারে না। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তির এই ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে আমেরিকা সংবিধান প্রণয়নে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স বা কিছু রক্ষাকবচ নীতি নির্ধারণ করায় অন্যান্য দেশ অপেক্ষা আমেরিকা উল্লেখযোগ্য সফলতা পেয়েছে। আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলি তা কি ভেবে দেখবেন?
লেখকঃ পিএইচ. ডি গবেষক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: mycographia@gmail.com