তারুণ্যের জননন্দিত গল্পকার

ইমদাদুল হক মিলন। দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। তিনি গল্প, উপন্যাস এবং নাটক এই তিন শাখাতেই উপহার দিয়েছেন জনপ্রিয় রচনা। লেখক হিসেবে তিনি এপার-ওপার দুই বাংলায়ই তুমুল জনপ্রিয়। তার ‘নূরজাহান’ উপন্যাসটি দুই বাংলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। এই সময়ের তরুণদের কাছে তার গল্প ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আমাদের এবারের আয়োজনে পাঠকদের জন্য জনপ্রিয় এই লেখক বলেছেন তার তরুণবেলার গল্প। অনুলিখন করেছেন খালেদ আহমেদ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের জন্ম বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানার বাড়িতে। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে। বেড়ে উঠেছেন পুরোনো ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। ‘অধিবাস’, ‘পরাধীনতা’, ‘কালাকাল’, ‘বাঁকাজল’, ‘নিরন্নের কাল’, ‘পরবাস’, ‘কালোঘোড়া’, ‘মাটি ও মানুষের উপাখ্যান’, ‘পর’, ‘কেমন আছ’, ‘সবুজপাতা’, ‘জীবনপুর’ প্রভৃতি তার বিখ্যাত বই। তার লেখা দেড় শতাধিক নাটকের মধ্যে ‘কোন কাননের ফুল’, ‘বারো রকম মানুষ’, ‘রূপনগর’, ‘যুবরাজ’, ‘কোথায় সেজন’, ‘আলতা’, ‘একজনা’, ‘নীলু’, ‘তোমাকেই’, ‘ছোছা কদম’, ‘আঁচল’, ‘খুঁজে বেড়াই তারে’, ‘কোন গ্রামের মেয়ে’, ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’ বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, এস এম সুলতান পদক, জাপান রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড, মাদার তেরেসা পদক ছাড়াও কথাসাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখায় ‘চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক’ পেয়েছেন। এই গুণী মানুষটির কাছে তার তরুণবেলার গল্প জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে কয়েক মুহূর্ত হারিয়ে গেলেন সেই সোনালি দিনগুলোতে। বাস্তবে ফিরে আমাদের সামনে মেলে ধরলেন তার গল্পের ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স ষোল বছর। তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আমি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলাম। ’৭১ সালে বাবা মারা যাওয়ায় আমার যে স্বপ্ন ছিল সেটা আর পূরণ হয়নি। সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। আমাকে অসেক স্ট্রাগল করতে হয়েছিল। অনেকগুলো ভাইবোন আমরা। ওই তরুণ বয়স থেকেই টিউশনি করতাম। নিজের পড়াশোনার খরচ নিজে চালাবার চেষ্টা করতাম। তাই আমার অন্যান্য বন্ধুরা যেভাবে তারুণ্যের আনন্দ ভোগ করতে পেরেছিল, আমি তা পাইনি। বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত বা আড্ডা দিত, তখন আমাকে হয়তো টিউশনি করতে হতো। আবার কখনো কখনো বই পড়তাম। ছোট থেকেই আমার বই পড়ার ঝোঁক ছিল। অত বই তো আর কিনে পড়তে পারতাম না। গেন্ডারিয়ায় একটা পাঠাগার ছিল। সময় পেলেই সেখানে গিয়ে বই পড়তাম। এই পাঠাগারে বই পড়তে পড়তে লেখালেখির বিষয়টা মাথায় এলো। যাই হোক সেটা অন্য প্রসঙ্গ। যেই তরুণবেলার কথাটি বলতে চাই, তা হলো আমার তরুণবেলাটা দুঃখ-বেদনা ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে কেটেছে। অনেক কষ্ট করেছি, টিউশনি করেছি, নানা চড়াই-উত্ড়াইয়ের মধ্যেও সংসারে সহযোগিতার চেষ্টা করেছি। আবার কিছু আনন্দও ছিল। যেমন আমার বন্ধুরা সবাই খেলাধুলায় ভালো, লেখাপড়ায় ভালো। মোট কথা আমি গেন্ডারিয়া হাই স্কুলে পড়তাম। এরপর জগন্নাথ কলেজে পড়তাম। আমার বন্ধু সার্কেলের সবাই ছিল খুবই মেধাবী। কেউ খেলায় ভালো করছে, কেউ গান ভালো করছে, কেউ ছবি ভালো আঁকছে, কেউ লেখালেখির চেষ্টা করছে। সব মিলিয়ে আমরা যে দলটি ছিলাম, সেই দলটা পরবর্তীকালে চাঁদের হাট নামের একটা সংগঠনের সাথে যুক্ত হলাম। ওই সংগঠন শুরু হয় ’৭৪ বা ’৭৫ সালের দিকে। তখন একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল পূর্বদেশ। ওই পত্রিকার ছোটদের পাতার নাম ছিল চাঁদের হাট। সেটা ঘিরেই ওই সংগঠন। আমার তরুণ বেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে চাঁদের হাটে। সেই সময় আমার সঙ্গে চাঁদের হাটে ছিল ফরিদুর রেজা সাগর, আফজাল হোসেন, হানিফ সংকেত, আব্দুর রহমান, আলীমুজ্জামান, দিদারুল আলম। যারা এখন প্রত্যেকেই খুব বড় বড় জায়গায় আছেন। আমার শ্লোগান ছিল—আমরা সুন্দর হবো। তাই সুন্দর হওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়াটা দরকার সেই ভাবে আমরা কিছু নীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আফজাল ছবি আঁকছে, সাগর লেখালেখি করছে, কেউ ছবি তুলছে, আব্দুর রহমান খুব ভালো ছড়া লিখছে, দিদারুল আলম খুব ভালো বক্তৃতা দিচ্ছে, হানিফ সংকেত উপস্থাপনা করার চেষ্টা করছে। সাংবাদিক শাহ আলমগীর ও যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলমও আমাদের সাথে চাঁদের হাটে ছিল। এই যে গ্রুপটা আমরা ওই সময় প্রতিদিন বিকেলে চাঁদের হাটকে কেন্দ্র করে একত্রিত হতাম। কখনো পূর্বদেশে অফিসে বা কখনো সাগরের খাবারদাবার রেস্টুরেন্টে বসতাম। সেখানে আমরা আড্ডা দিতাম ঠিকই। কিন্তু আড্ডার মূল বিষয়বস্তু ছিল কীভাবে নিজেকে ডেভেলপ করা যায়? আমি লেখার চেষ্টা করছি। কীভাবে দুটো ভালো বই পড়লে ভালো লেখক হওয়া যাবে, কোন সাহিত্য সম্মেলনে গেলে লেখকদের কথা শুনে ভালো লেখার প্রতি অনুপ্রাণিত হওয়া যাবে—এই সব বিষয়গুলো অর্থাত্ নিজেকে তৈরি করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমাদের তরুণ বেলাটি পার করেছি। এখনও আমি যখন আমার পেছনের জীবনটার দিকে তাকাই তখন মনে হয় জীবনে যা কিছু পাওয়ার ওই বয়সে পেয়েছিলাম। ভালো বন্ধুদের পেয়েছিলাম, তাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছিলাম। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একটা বিষয় ছিল—সবাই আমরা একে অপরকে ফিল করতাম। কেউ একটা সেক্টরে কাজ করছে, সে আরও ভালো করতে চাইলে তখন সবাই তাকে সে বিষয়ে হেল্প করত। সেজন্য আমার বন্ধুরা আজ সবাই বড় বড় জায়গায় এসে দাঁড়াতে পেরেছে। আর এই দাঁড়াবার পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছিল আমাদের তরুণবেলায়।’ এই প্রজন্মের তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের তারুণ্যের সময়টা যেমন ছিল এখনকার তরুণরা সেটা আর পাবে না। সময় অনেক বদলে গেছে। ওই সময় আমরা অনেক আদর্শ নিয়ে চলার চেষ্টা করেছি, সত্ থাকার চেষ্টা করেছি, লেখাপড়ায় মনোযোগী থাকার চেষ্টা করেছি। আমাদের সময় এত খোলা দরজা-জানালাও ছিল না। এখনকার ছেলেদের হাতে মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেটসহ সারা পৃথিবীর দরজা তার সামনে খোলা। টেলিভিশন, এত চ্যানেল, এত সংবাদপত্র সবমিলিয়ে পুরো বিশ্ব এখনকার তরুণদের হাতের মুঠোয়। আমাদের সময় অনেক বন্ধুদের বাড়িতে ল্যান্ডফোন ছিল না। একটা ফোন করতে হলে টেলিফোন অফিসে যেতে হতো। অথবা কারো অফিসে গিয়ে রিকোয়েস্ট করে ফোন করতে হতো। এখন সব কিছুই বদলে গেছে। তাই এখনকার তরুণদের অফুরন্ত সম্ভাবনা, অফুরন্ত সুযোগ। এই সুযোগটাকে যদি তারা কাজে লাগাতে পারে তবে বাংলাদেশের চেহারাটা তারা বদলে দিতে পারবে। আর একটা জিনিস আমি সবসময়ই বলি—সেটা হচ্ছে দেশ বদলায় কিন্তু তরুণরাই। তাদের হাতেই দেশের কল্যাণ সাধিত হয়। যেমন—আমাদের ক্রিকেট টিম। এই ক্রিকেট টিম কিন্তু সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের মুখ আলোকিত করেছে। ওই ক্রিকেট টিমে কারা? তরুণরা। সুতরাং তরুণরাই দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনে। যদি আমরা অতীতের দিকে তাকাই—’৫২-র ভাষা আন্দোলনে ছিল তরুণা, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থানে ছিল তরুণরা, ’৭১-র মুক্তিযুদ্ধেও তরুণদের অবদান সবচেয়ে বেশি। প্রত্যেকটি আন্দোলনে তরুণরাই কিন্তু এগিয়ে আসে সবার আগে। এখনো আমি বিশ্বাস করি যে, অতীতের মতো আজকের তরুণরা যদি দেশটাকে ভালোবাসে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে চায় তবে সত্ভাবে যার যার জায়গা থেকে দেশের জন্য কাজ করে যেতে হবে। তবেই যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, এই দেশ সোনার বাংলাদেশ হবে।’