কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষানির্ভর প্রকল্প প্রণয়ন করা হউক
প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৪, ২০:৫৯
দেশব্যাপী ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সপ্তাহ’ পালিত হইতেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সম্মিলিতভাবে এই কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে। বর্তমানে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৬৮৮১টি প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে যেইগুলি হইতে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিতেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার এনরোলমেন্টের হার শতকরা ২০ ভাগে উন্নীত করিবার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করিয়াছে। বর্তমানে এই হার মাত্র শতকরা ৪-৫ ভাগ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাক্ষেত্রে তিনটি প্রকল্প কাজ করিতেছে। এই প্রকল্পগুলির মূল উদ্দেশ্য হইতেছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং বর্তমান কারিকুলামনির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যথার্থ সক্ষমতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দিকে লইয়া যাওয়া। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৪ উদ্বোধন করিয়াছেন। তিনি প্রতিযোগিতামূলক চাকুরীর বাজারে টিকিয়া থাকিবার মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মানসম্মত পর্যায়ে লইয়া যাইবার আহ্বান জানাইয়াছেন।
জনসংখ্যা বোঝাও হইতে পারে আবার সম্পদও হইতে পারে। শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী হইলো একটি জাতির জন্য সম্পদস্বরূপ। ফলে বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে যদি জনসম্পদে পরিণত করা যায়, তবে বাংলাদেশ হইয়া উঠিবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিচারে অন্যতম সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র। জনসংখ্যা তত্ত্বে ন্যূনতম নির্ভরশীলতার অনুপাত বলিয়া একটি ধারণা বিদ্যমান রহিয়াছে। একটি হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সালে এই দেশের জনসংখ্যার নির্ভরশীলতার অনুপাত হইবে ০.৪৯ এবং ১২ কোটি মানুষ হইবে কর্মক্ষম ও ৬ কোটি জনসংখ্যা হইবে নির্ভরশীল। যখন যেই দেশে সর্বোচ্চ কর্মক্ষম জনসংখ্যা সম্বলিত এইরকম সর্বনিম্ন নির্ভরশীলতার অনুপাত দেখা যাইবে সেই সময়টাকে সুযোগের জানালা হিসাবে আখ্যা দেন জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে যেই সর্বনিম্ন নির্ভরশীলতার অনুপাত ও সর্বোচ্চ কর্মক্ষম জনসংখ্যার আকর্ষণীয় সুযোগ যখন আসিবে, তাহা কাজে লাগাইতে হইলে শিক্ষা বিশেষত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়া কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে গড়িয়া তুলিবার যথার্থ পরিকল্পনা আমাদের হাতে থাকিতে হইবে। আগামী ২০৩০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম মানুষকে কীভাবে দক্ষ মানুষে পরিণত করা যায় তাহার রূপকল্প এখনই প্রণয়ন করিতে হইবে। এই রূপকল্পে উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী হইবে মাধ্যমিক শিক্ষার বয়সী শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় হইতে ঝরিয়া পড়া শিক্ষার্থী, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং কর্মরত অদক্ষ ও আধা দক্ষ জনগোষ্ঠী।
একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশসহ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির মাধ্যমিক শিক্ষা উপযোগী বয়সের জনসংখ্যা (১১-১৭ বছর) ও কারিগরি বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে এনরোলমেন্টের একটি তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে এই এনরোলমেন্টের হার মাত্র ১.৪৫%, অথচ ভারতে তাহা ৭%, ইন্দোনেশিয়ায় ৪১%, মালয়েশিয়ায় ৪৩% এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৪৪%। অন্যদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা সূচক বিশ্লেষণ করিয়া দেখা গিয়াছে, নেট এনরোলমেন্ট অনুপাত ২০১৫ সালের মধ্যে ৫%, ২০২০ সালের মধ্যে ১০% এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% বৃদ্ধি করিতে হইবে। তাই এই সংক্রান্ত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প আমাদের সামনে নাই। আগামী সময়ে পেশাগত প্রবণতার চাহিদা পূরণের বিষয়টি মাথায় রাখিয়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কার করিয়া যথাযথ কারিকুলাম তৈরি ও বাস্তবায়ন করিবার প্রয়োজন রহিয়াছে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষক নিয়োগ, তাহাদের প্রশিক্ষণ, পুনঃপ্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নে একটি একক কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করা যাইতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে পারিলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নসংক্রান্ত লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা সম্ভব হইবে।