জন্মদিন

কবির জন্য শুভ কামনা

বাংলা কবিতার দুর্দিন চলছে, এমন অভিযোগ এখন প্রায়ই শোনা যায়। তবে এখনো নতুন প্রেম, ভালোবাসা, দৃষ্টি বিনিময় কিংবা বিরহ-বেদনা কবিতাই ফিরছে মুখে মুখে। বাংলাদেশ কবিতার দেশ। আর কোনো দেশ নেই যেখানে গান এসেছে কবিতার রূপে, গীতি কবিরা যে সব কবিতা লিখেছেন সেগুলোই গান হয়ে ফিরছে। এই যে কবিতার জয়-জয়কার কবিতার প্রতি বাঙালির শাশ্বত প্রেম তার উত্স রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা পঞ্চ কবিকে ধরলেও বলতে হয়, বদলে যাওয়া সমাজে কবি এসেছেন, নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে, নব পরিচয়ে। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত দেশটি যখন হতাশা, ক্রোধ আর বিষণ্নতায় মোড়ানো, নতুনভাবে জেগে ওঠার অপেক্ষায়, আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন জীবন বোহেমিয়ান, বাউল এক কবি, না আছে তার চাল না চুলো, জীবন বোধে, জীবন-যাপনে স্বতন্ত্র ধরা-বাঁধা ছকের একেবারে বাইরে তিনি, কোথায় দিন কোথায় রাত্রি যাপন নিজেও জানেন না। মসজিদের বারান্দা থেকে চায়ের দোকান কিংবা প্রেস ঘরে, ছাপাখানায় জীবন কাটানোর মত বাউন্ডুলে নবীন নজরুল তিনি। এ যেন যৌবনের কণ্ঠস্বর, রাজনীতি তখন সর্বগ্রাসী, রাজনীতিহীন জীবন কল্পনার অতীত, কিন্তু কবি সেই রাজনীতিকে থোড়াই তোয়াক্কা করলেন। লিখলেন: “কিন্তু আমি আর কবিতা লিখবো না। পল্টনের ভরা সমাবেশে আমি ঘোষণা করছি, আমি আর কবিতা লিখবো না।” বলছেন বটে, অন্যদিকে এভাবেই হয়ে উঠছে ঢাকা তথা দেশের কবিতা। সেখানেই থেমে থাকেনি তার কাব্য ভাবনা, বড় মায়ার দেশ আমাদের। সজল শ্যামল নীরব কবিতায় আবেশ জাগানো মানুষের মনে নাগরিক ভাবনা ডানা মেলছিল মাত্র, সাহসের কবি, যৌবনের কবি মুখের ওপর বলে দিলেন: “আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই, বলে দেবো স্ট্রেটকাট: ভালোবাসি।” এভাবে নাগরিক বাঙালি শামসুর রাহমান ও আহসান হাবিবের পাশাপাশি খুঁজে পেল অন্য এক কবির ভুবন, যার একদিকে গীতিময়তা অন্য প্রান্তে সভ্যতার নতুন স্পন্দন। দেশে তখন ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে, শান্ত বাংলাদেশ ভেসে গেছে অযাচিত অনাহুত রক্তের বন্যায়, জাতির জনকের হত্যার পর স্তব্দ দেশের কবিতা কি পারবে জ্বলে ঊঠতে? সেকি প্রতিশোধ স্পৃহায় পুড়ে ছাই হবে? নাকি মানুষের অশান্ত বিক্ষুব্ধ মনে এনে দেবে শান্তির অমিয় ধারা? যেই চাল-চুলোহীন বোহেমিয়ান মানুষটি লিখছেন, ‘আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আমি আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম। আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি। আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।’ এই ভালোবাসা আমাদের জাতিকে দিল নতুনভাবে শোক সহ্য করার অপার শক্তি। ভালোবাসাই যে তার প্রধান উপজীব্য। এক সময় তিনি রাজনীতি, আদর্শ, চাষাভুষোদের জীবন, সমাজতন্ত্র, প্রেম ও ভালোবাসা মিলে শহরে-গ্রামে জনগণের হূদয়ে হূদয়ে ঢুকে পড়লেন। রচিত হল অসাধারণ গদ্য। জীবন কথা, স্মৃতিআলেখ্য আরো কত ধরনের নতুন বিষয়। এই কবি তাই বলতে পারেন খুনীর গর্ভ মাতৃগর্ভে নয় খুনীর গর্ভ সমাজ গর্ভে। এই দর্শন আছে বলেই তিনি আর কোনো ফ্রেমে থাকেন না। একে একে সব আদর্শ সব চেতনা আর দেশপ্রেম ধারণ করে হয়ে ওঠেন একক ও অভিন্ন। আমি খুব অবাক হই, পোড়ার দেশে, রাজনীতির অপ উদ্ভাস আর সামাজিক দুর্নীতির সমাজে এমন ঋষি কবি জন্মালেন কিভাবে? কিভাবে আজো তিনি তা ধরে রেখেছেন। এখন তিনি গ্রামবাসী। জন্মদাত্রী গ্রামে স্কুল পাঠশালা-চিত্রশালা ও শহীদ মিনার স্থাপন করে কবির চেয়েও বড় মানুষের জীবনযাপন করছেন। আনন্দময় জগতের এই কবি আমার প্রিয় অগ্রজ নির্মলেন্দু গুণের জন্মদিন আজ। জন্মদিনে অমৃত কুম্ভের কবিকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি। যিনি লিখতে পারেন: আমার ছিল না মুক্ত মাতৃভূমি। শৃঙ্খলহীন স্বাধীন দেশ:/ শতবর্ষের শত সাধনায় পেয়েছি তোমার বাংলাদেশ। এ কারণেই নির্মলেন্দু গুণ ও বাংলাদেশ আজ মিলে-মিশে একাকার। সিডনি থেকে