প্রশিক্ষিত নার্স :সমস্যার দুইদিক
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৪, ২০:৪৩
বাংলাদেশে একদিকে নার্স সংকটের কারণে চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হইতেছে, অন্যদিকে হাজার হাজার বেকার নার্স চাকুরীর দাবিতে রাজপথে মিছিল-সমাবেশ করিতেছে। বিষয়টি বিসদৃশ এবং মানিয়া নেওয়া যায় না। নার্সিং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অন্যান্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের চাইতে আলাদা। এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করিয়া কেহ যদি কাজ না পান, তাহলে তাহারা যাইবেন কোথায়? এই বেকারত্বের কারণে তাহাদের জীবন যেমন নষ্ট হয়, তেমনই তাহাদের লেখাপড়ার জন্য রাষ্ট্র যে বিনিয়োগ করিয়া থাকে তাহাও অনর্থক হইয়া যায়। এইভাবে আমরা সকলেই কাঙ্ক্ষিত সেবা হইতে বঞ্চিত হই। সমপ্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করিয়াও দেশের দশ সহস্রাধিক নার্স বেকার। স্বাভাবিকভাবেই তাহারা হতাশ। জানা যায়, নার্সদের পদমর্যাদা লইয়া সৃষ্ট জটিলতার কারণে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া থামিয়া রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণীর কর্মকর্তার অসহযোগিতা ও কালক্ষেপণের জন্য এই সংক্রান্ত নিয়োগ বিধিমালাটি পাঁচ বত্সর ধরিয়া ঝুলিয়া আছে বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও গড়িমসি করিতেছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল যে কোন দেশের সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই এই ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শনের কোন অবকাশ নাই।
নার্স সংকটের কারণে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলিতে রোগীরা যে দুর্ভোগ পোহাইতেছেন তাহা এক কথায় অবর্ণনীয়। সর্বশেষ হেলথ ওয়াচ রিপোর্টে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ২ লক্ষ নার্সের ঘাটতি রহিয়াছে। মহাজোট সরকারের আমলে নূতন করিয়া নার্স নিয়োগ দেওয়া হয় নাই এই কথা আমরা বলি না। ইতিমধ্যে ছয় হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে এবং আরও দুই হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এত নার্স আর কখনও নিয়োগ দেওয়া হয় নাই, ইহাও সত্য। কিন্তু তাহার পরও প্রয়োজনের তুলনায় তাহা নগণ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ডাক্তার ও নার্স অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় তাহা হইল ২.৫:১। জনসংখ্যা ও বেড অনুপাতে নার্সের সংখ্যা হইল যথাক্রমে ৫০০০:১ এবং ১৩:১। একদিকে দেশে নার্সের সংকট রহিয়াছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত নার্সের ব্যাপক চাহিদা আছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ১.৫ মিলিয়ন নূতন নার্স দরকার। এই দুই দিক বিবেচনা করিয়া নার্সিং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ ও তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে নার্সের (মিডওয়াইফসহ) সংখ্যা ২৮ হাজার ৭৯৩ জন। পক্ষান্তরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট চিকিত্সক সংখ্যা ৪৬ হাজার ৯৫১ জন। আর সরকারি-বেসরকারি মিলাইয়া হাসপতালে ও ক্লিনিকে মোট বেডসংখ্যা ৯১ হাজার ১০৬টি। যদিও অধিকাংশ হাসপাতালে নির্ধারিত বেডের চাইতেও বেশি রোগী ভর্তি হয়, তথাপি এই পরিসংখ্যান হইতে ডাক্তার, নার্স ও ভর্তিকৃত রোগী সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। ইহাতে দেখা যাইতেছে, ডাক্তার অনুপাতে নার্সের সংখ্যা সত্যিই কম। অথচ হওয়ার কথা বেশি। আমরা জানি, রোগীর সেবায় একজন নার্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহারা আন্তরিক সেবা দিয়া একজন রোগীকে সুস্থ হইতে সহায়তা করেন। এমতাবস্থায় মানসম্পন্ন চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করিতে হইলে রোগী, ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যাগত সমন্বয় সাধন জরুরি। সুতরাং বেকার নার্সদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিবার পাশাপাশি দেশে নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজের সংখ্যাও বাড়াইতে হইবে। নার্সিং কারিকুলামকে উন্নীত করিতে হইবে আন্তর্জাতিক মানে। বিদেশের বাজার ধরিতে প্রি-সার্ভিস শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়া শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষায় পারদর্শী করিয়া তোলা কর্তব্য।