এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কাম্য নহে
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৪, ২০:৪৩
জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু হইলেও এদেশের মানুষ ক্রিকেটকে গত দুই দশকে সবার ওপরে যে স্থান দিয়া চলিয়াছে তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। সেই ক্রিকেট লইয়া যে অঘটনের জন্ম দিয়াছে এদেশের ক্রিকেটের সহিত যুক্ত নীতিবিচ্যুত কতিপয় ব্যক্তি, তাহা লক্ষ কোটি প্রাণকে ব্যথিত করিয়াছে। খেলাধুলায় সাধারণ মানুষের ভালোবাসার প্রতি সম্মান দেখাইয়া প্রায় প্রতিটি সরকারই ক্রিকেটকে আগাইয়া লইতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়াছে। সেইখানে বিপিএল (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ)-এ খেলোয়াড় ও সংগঠকদের সামান্য কিছু অর্থের জন্য দেশের সম্মানকে ধূলোয় লুটাইয়া দেওয়ার ঘটনাটি কোনোমতেই মানিয়া লওয়া যায় না। আইসিসি-এর দুর্নীতিবিরোধী নিরাপত্তা ইউনিটের (আকসু) রায়ে হয়তো দণ্ড পাইয়াছেন কয়েকজন, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যেই ক্ষত সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা কি সহজে সারিবে?
এমনিতেই গত কয়েক বত্সরে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় যোগ্যতাকে নানামাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সরাসরি খেলিতে পারিতেছে না বাংলাদেশ, অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দলগুলির সহিত কোয়ালিফাইং ম্যাচ খেলিতে হইতেছে। টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিস্তরায়নের প্রশ্ন এখনও কার্যত অমীমাংসিত। ইহাছাড়া বিশ্বের প্রধান সারির দলগুলি বাংলাদেশের সহিত কোন সিরিজ খেলিতে অনাগ্রহ দেখাইয়া চলিয়াছে বারংবার। ইহার পরও বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদীদের উচ্ছ্বাসের কমতি নাই, ক্রিকেটকে আগাইয়া নিতে যাহাই করিবার প্রয়োজন তাহাই করিতে বদ্ধপরিকর সকলে।
দুঃখ-দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়গণ যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিতেছেন তাহা একরকম অভাবনীয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, বেতন ভাতাদিসহ নানাপ্রকার প্রণোদনা প্রদানে কোনোরূপ কার্পণ্য দেখায় নাই বলিলেই চলে। দেশের মানুষ খেলার মানোন্নয়নে যখনই দাবি তুলিয়াছে, তখনই সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিয়াছে। কিন্তু সৌভাগ্যবান এদেশের খেলোয়াড়েরা কি কখনও ভাবিয়া দেখিয়াছেন যে, ক্রিকেটে সুযোগ না পাইলে বা সরকারি- বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব থাকিলে তাহারা যে জীবনযাপন করিতেছেন তাহা আদৌ সম্ভব হইত কিনা? পেশাজীবনে ইহার উত্তম আর কি করিতে পারিতেন খেলোয়াড়গণ? সুযোগের অভাবে তো নানামাত্রিক প্রতিভাধর মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালেই ঝরিয়া পড়িতেছে। আজ যাহারা নিজেদের খেলুড়ে যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় উত্সাহবলে দামি ফ্ল্যাট, অর্থ ও গাড়ির মালিক হইয়াছেন তাহাদের বেশিরভাগের পক্ষেই কি ইহা সম্ভব ছিল? কিন্তু কী কারণে তাহাদের এই দায়িত্বস্খলন—আরও অর্থ, নাকি এদেশের মানুষের নিঃস্বার্থ অনুভূতির প্রতি বিদ্রূপ?
বিপিএল-এ ফিক্সিং সম্পর্কিত যে রায় আসিয়াছে তাহা স্বাভাবিক বলিয়াই মনে করি আমরা। ইহাকে আর্থিক দিকের চাইতেও নৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করা হইবে অধিক কার্যকর। শুধু ক্রিকেটেই নহে অন্যান্য খেলাধুলাতেও এইরকম অনৈতিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে খেলোয়াড়দের নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করিতে হইবে। যত উন্নত মেধার অধিকারীই হউন, ইহার সহিত সততা, নিষ্ঠা, মনন ও দেশপ্রেমের সংমিশ্রণ না ঘটিলে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা হইলেও তাহা একসময় দেশের জন্য কাল হইয়া দাঁড়াইতে পারে। কাজেই এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাহাতে না হয় সেইদিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে সর্বাগ্রে। ইহার পিছনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইন্ধন থাকিলে তাহাদেরও খুঁজিয়া বাহির করিয়া সমূলে উত্পাটন করিতে হইবে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে। কেননা ক্রীড়ায় নীতিভ্রষ্টতা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে।