বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্রাজিলের সাম্বা নৃত্যকথা
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৪, ২০:৪৫
বিশ্বকাপের সুবাদে সারা বিশ্বের চোখ এখন ব্রাজিলের দিকে। ফুটবল আর সাম্বা—সারা বিশ্বের কাছে এই দুটো যেন ব্রাজিলের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পাঁচবারের ফুটবল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দেশটির ফুটবল প্রেমের কথা কে না জানে। এবার জানা যাক সাম্বা নৃত্যের কথা।
বহু বছর আগে এক দল সাদা মানুষ ইউরোপ থেকে পাড়ি দিয়েছিল দক্ষিণের দিকে। দখল করেছিল এক দেশ, যাকে আমরা এখন ব্রাজিল নামে জানি। আর তাদের সঙ্গে আমদানি করেছিল কালো মানুষদেরও, যারা ছিল এই সাদা মানুষদের ক্রীতদাস। সেই রকমই এক কালো মানুষ এক দিন সাদা প্রভুদের অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে পালিয়ে গেল জঙ্গলে। সেখানে হঠাত্ই সে দেখে এক সুন্দরী মেয়ে লুকিয়ে আছে। মেয়েটি ব্রাজিলের আদি বাসিন্দা, সাদা মানুষরা যাদের ‘ইন্ডিয়ান’ বলে ডাকত। সেও পালিয়েছে এই সাদা মানুষ, অর্থাত্ পর্তুগিজদের কবল থেকে মুক্তি পাবে বলে। তারপর যা হয় আর কী! দুই জনে সেই জঙ্গলেই ঘরকন্না পাতল। কিন্তু তারা একে অন্যের ভাষা বুঝতে পারত না। তাই শরীরের অঙ্গভঙ্গির সাহায্যেই চলত তাদের কথাবার্তা। তাদের সন্তানরা সৃষ্টি করল এক নতুন জাতি, ‘মেস্তিসো’—কালো বাবা আর আদিবাসী মায়ের সন্তান। মেস্তিসো শিশুকে বলা হত জাম্বা। আর জাম্বার পিতামাতার শরীরী কথোপকথনই রূপ নিল এক নৃত্যে। নাম সাম্বা।
এটা নিছকই গপ্পো। তবে অন্যান্য আরও বহু গল্পের মতোই, যাদের মধ্যে একটা যুক্তিও লুকিয়ে থাকে। বিভিন্ন জাতি একে অন্যের সংস্পর্শে আসছে, তাদের মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে এবং সেই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজাও চলছে—এ গল্পের রূপক দিকটি এটাই। এবং সেটাই সাম্বার উত্পত্তি ও বিবর্তনের যুক্তি।
কিন্তু কথা আরো আছে। সাম্বার একটা কেতাবি ইতিহাসও আছে। তখন পশ্চিম আফ্রিকা থেকে দলে দলে ক্রীতদাস নিয়ে আসা হচ্ছে ব্রাজিলের বাজারে। ঔপনিবেশিক রোশনাই ও ক্যাথলিক গির্জার জাঁকজমকে ঝলমলে উত্তর ব্রাজিলের বাইয়া শহর ক্রীতদাস ব্যবসার কেন্দ্রস্থল। সেখানেই গড়ে উঠল আফ্রো-ব্রাজিলিয় সংস্কৃতির এক নতুন ধারা। অ্যাঙ্গোলার মানুষরা তাদের গ্রামে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে যে সাম্বা নাচে মেতে উঠত, তার ছন্দ ছড়িয়ে গেল পর্তুগিজ উপনিবেশের সামাজিক ধমনীতে। যদিও সাম্বার ছন্দ উঠে এসেছিল আফ্রিকা থেকে সুর, ছন্দ বা কাঠামোতে মিশে যাচ্ছিল ইউরোপীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারা। যেমন আঠারো শতকে ব্রাজিলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল পশ্চিম আফ্রিকার লুন্ডু নৃত্য। পরে সে নৃত্যের সঙ্গে মিশে গেল ফ্রান্সের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার কোম্পানির মারফজ আসা পোলকার চলন। পোলকা এবং লুন্ডু মিলে তৈরি হল ব্রাজিলের এক নতুন নৃত্যশৈলী—ম্যাশিশ। পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলিয় সাম্বা সৃষ্টিতে এক বড়ো ভূমিকা নেয় এই ম্যাশিশ নৃত্য।
১৮৭০ সালে সাম্বার মতো লোকনৃত্যকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠল। কিন্তু ইতিহাসের একটা উল্টো পিঠও থাকে। শ্বেতাঙ্গকরণের এই এলিট প্রকল্পটি বাধা পেল অর্থনীতি ও রাজনীতির পরিবর্তনের কাছে। ১৮৭১ সালে পাস হল ‘ল অফ ফ্রি উম্ব’। ক্রীতদাস-সন্তানদের দাসত্ব থেকে মুক্তি মিলল। ১৮৮৮ সালে আইনিভাবে নিষিদ্ধ হল দাসপ্রথা। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রিও-তে গড়ে উঠল ফ্যাভেলা—যা মূলত কৃষ্ণাঙ্গদের বস্তি। সেখানে জমায়েত হত সঙ্গীতজগতের মানুষদের। গিটার, ক্যাভাকিনহো এবং ড্রামের সঙ্গে চলত সাম্বা বা বাতুকের মতো আফ্রো-ব্রাজিলিয় ঐতিহ্যবাহী নাচগান। কিন্তু মূল ধারায় তখনও ব্রাত্য সাম্বা। রাষ্ট্রের মনে হয়, সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে সাম্বার ছন্দে। কাজেই পুলিশ বারংবার হানা দেয় ফ্যাভেলায়, বন্ধ করে দেয় সাম্বার প্যারেড, এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় সাম্বায় ব্যবহূত বাদ্যযন্ত্র।
এই গল্পটা আবার পাল্টাল তিনের দশকে। ব্রাজিলের প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক গিলবার্তো ফ্রেয়েরে বর্ণবৈষম্যবাদী রাজনীতির এক বিরুদ্ধ মত পেশ করলেন। ফ্রেয়েরে জানালেন, কেবল জাতিগত মেলামেশার মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে এক শক্তিশালী ব্রাজিল। অন্য দিকে তখন সিংহাসনে আসীন গেতুলিও ভার্গাস—একজন একরোখা একনায়ক। তিনি ব্রাজিলকে সাজাতে চান তাঁর ইচ্ছামতো। এক নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে হবে। সংস্কৃতির বহু বর্ণকে মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি হল ব্রাজিলের নতুন পরিচয়। সেখানে সাম্বা ব্রাত্য তো নয়ই, বরং সাম্বা স্কুল এবং প্যারেডের বরাতে জোটে সরকারি সাহায্য, সরকারি নির্দেশে ব্রাজিলের গ্রামে গ্রামে সমপ্রচারিত হয় রিও-র সাম্বা মিউজিক। এর পরে সাম্বাকে আর কোনো বাধার সম্মুখীন তো হতে হয়ইনি, বরঞ্চ সাম্বা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ব্রাজিলের জাতীয় জীবনের অংশ।
লেখক : সাংবাদিক, শিক্ষক
19ad78@gmail.com