[ বা জে ট ]

বাজেটে জনতুষ্টি ও সমাজ চিন্তা

অর্থমন্ত্রী এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন আগামী অর্থ বছরের জন্য উপস্থাপিত বাজেটে জনতুষ্টির বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অবকাঠামো নির্মাণ ,পদ্মা সেতু নির্মাণ, কর্মসংস্থান প্রকল্পের মত জনস্বার্থ বিষয়ক কর্মকাণ্ড,সরকারি কর্মচারিদের তুষ্ট করার জন্য থাকছে বিভিন্ন প্রণোদনা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ছে ও কৃষিঋণের আওতা বাড়ানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আরো বলেছেন দেশের সামনে এখন দুটি বড় সমস্যা, প্রথমত: দুর্নীতি এবং দ্বিতীয়টি হলো সন্ত্রাসবাদ। এই দুটি বিষয় দেশের বাজেটের সকল সুফলকে বিপর্যস্ত করে চলছে প্রতিনিয়ত এবং সমাজ চিন্তায় বাজেটকে কিভাবে আরও আলোচনা তথা অনুশীলনে আনা যায় তার প্রস্তুতির সময় আসছে। প্রতি বছর বাজেট আসে বাজেট যায় কিন্তু টেকসই সামাজিক পরিবর্তন কতটুকু সংগঠিত হয়েছে তার মূল্যায়ন করা একান্ত প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিবিদ তথা বাজেট মূল্যায়ন বিশ্লেষকগণ সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে বাজেটকে মূল্যায়ন করে থাকে যেমন অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন খাত মিলে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, এই বরাদ্দে আয়ের উত্সগুলো কি কি, কোন উত্স থেকে কতটুকু আয় আসবে, ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ কত এবং কোন কোন উত্স থেকে এগুলো যোগান হবে, খাতওয়ারী বাজেট বিভাজন এবং কোন খাত গুরুত্ব পাচ্ছে ইত্যাদি। এই সকল কার্যক্রমের ফলে বাস্তবিকভাবে দৃশ্যত কাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ে কিন্তু যেগুলো গুণবাচক যা চোখে দেখার বিষয় নয় সেগুলো অনেকক্ষেত্রে গণনায় আসে না সত্যি কিন্তু তার প্রভাবগুলো সমাজে অনেক ক্ষেত্রে বিচরণ করে চিন্তা চেতনায় ও আলোচনায়। ধরা যাক দেশের বাজেটের আকার প্রতি বছর বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ২,৫০,৫০৬ কোটি টাকার যদিও বলা হয় ১৬ কোটি মানুষের জন্য মাথাপিছু বাজেট বা মাসভিত্তিক বাজেট খুব একটা বেশি নয়। তারপরও সামষ্টিক অর্থনীতির বিচারে দেশের অভ্যন্তরীণ উত্পাদনের প্রবৃদ্ধির হার, মূল্যসফীতির হার,মাথাপিছু আয়, জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি হার ইত্যাদি এখন পর্যন্ত দেশের অনুকূলে রয়েছে যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ। একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের এটিই করণীয় কিন্তু যারা সমাজ চিন্তাবিদ তাদের ধারণাটা ভিন্ন এই কারণে যে জনতুষ্টির বাজেট রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা পরিবেষ্টিত, যেখানে আত্মতৃপ্তি, নৈতিক মূল্যবোধ, সমাজচিন্তায় খুব একটা স্থান করে নিতে পারে না। যেমন ধরা যাক শিক্ষা আলোকিত মানুষ তথা উজ্জীবিত মানুষ হতে সহায়তা করে যদি সেটা সুশিক্ষা হয়। সামপ্রতিক সময়ে শিক্ষা উপাদান নিয়ে যত আলোচনা পত্র-পত্রিকায় আসছে তা পূর্বে দেখা যায়নি যেমন প্রশ্নপত্র ফাঁস চলমান উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় যা আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের দুর্নীতির আরও একটি কুিসত চিত্র। অথচ এই খাতটি সচল রাখতে প্রতি বছরের মত এ বছর বাজেটেও খাতওয়ারী বিভাজনে উন্নয়ন বাজেট ৯৮০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যাহা মূল এডিপির ১১.৯০ শতাংশ। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেছেন, উন্নয়ন খাতে শিক্ষা বরাদ্দের শতকরা ৭০ ভাগ টাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন ভাতাদি দিতেই ব্যয় হয়। বাকি যে টাকা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়ে স্কুল ঘর মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ডিজিটাল সরঞ্জামাদি ক্রয়ে ব্যয়িত হয়ে যায়। ফলে সমাজ চিন্তা তথা সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টিতে শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কিংবা গবেষণায় কোন অর্থই আর বাড়তি থাকে না। আবার এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় যেমন ছাত্র বেতন, স্কুলের গাছ-গাছালিসহ পুকুর বা অন্যান্য ভৌত কাঠামো থেকে কি আয় হয় তা পরিবীক্ষণের জন্য তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বিষয়টি স্বচ্ছ নয় আর মানসম্মত শিক্ষার কথা বাদই দিলাম। সমপ্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিভিন্ন প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ প্রকাশনা ও তার উত্তরে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও তদন্ত কমিটি গঠনসহ ঘটনাগুলো আমাদের এই বার্তা দিয়ে চলেছে যে জনগণের করের আহরণের টাকার বাজেট দিয়ে জাতি কি এই শিক্ষাব্যবস্থা আশা করে এই প্রশ্নটি শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রীকে করা কি সমীচীন নয়।শিক্ষকরা যদি হয় জাতির বিবেক ও আলোকিত মানুষ সৃষ্টির কারিগর তা হলে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে অন্যদের মত তারা যে জড়িত নয় এই সম্ভাবনাটি কি উড়িয়ে দেয়ার মত? সুশীল সমাজের কণ্ঠস্ব্বর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের গ্রন্থ নিষ্ফলা মাঠের কৃষক-এ তিনি তার সারা জীবনের শিক্ষকতায় মাঠের সোনার ফসল ফলানোর অকৃতকার্যতা অকাতরে স্বীকার করে নস্ফিলা হিসাবে বিদায় নিলেন। সেই শিক্ষক এখন আছে কি? কেনই বা তারা শিক্ষা বাণিজ্য বেপারীর ভূমিকায় ? কেনই বা তারা কোচিং বাণিজ্য ছাত্রদেরকে বলি দিচ্ছে? তাহলে সমাজ চিন্তার রূপকারে তাদের ভূমিকা কোথায়? সমাজ চিন্তার আরও একটি দিক হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ এবং বর্তমান সরকার এই ধারণাটিকে লালন করে চলছে এবং তার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, তাদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা প্রবর্তন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা, মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা, স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি উল্লেখ্য যোগ্য। এই সকল কাজই দেশের মানুষের করের অর্থে সৃষ্ট বাজেটের আওতায় পরিচালিত অথচ সমপ্রতি মুক্তিযোদ্ধা বিষয় মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড যেমন প্রায় ২৫ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদানে বাণিজ্য যাদের মধ্যে অনেকেই চাকরির অবসর গ্রহণের বয়স বৃদ্ধি করে চাকরিতে বহাল, বিদেশী বন্ধুদের প্রদত্ত ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতি ঘটনা সমগ্র জাতিকে এক মহানৈতিক সংকটে ফেলেছে যাতে সমাজ প্রগতির চিন্তা সংকটাপন্ন। এখন প্রশ্ন আসে এই বাজেটে সমাজ প্রগতির চিন্তাকে ত্বরান্বিত করার খাত কোনিট? অর্থমন্ত্রী নিজেও কালো টাকাকে সাদা করার নৈতিক সমর্থন করেন না কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এই সুযোগ বহাল রাখা হচ্ছে দেশের উন্নয়নে কথা বিবেচনা করে এবং কালো টাকার মালিকেরা শর্ত সাপেক্ষে যদি তা করে তবে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে, উত্পাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে, দেশের জিডিপি সমৃদ্ধ হবে, আয় ও কর্মসংস্থান উভয়ই বাড়বে এবং সর্বোপরি কালো টাকার মালিকদের নৈতিক বল অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বিগত সময়ে খুবই আশাপদ নয় বিধায় টাকা বিদেশে পাচারের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের জনতুষ্টির খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো যোগাযোগ অবকাঠামো খাত বা পরিবহন খাত, যেখানে উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪,৪৫৯ কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের ৫.৬৪ শতাংশ, সেতু খাতে ৬,১৭৩ কোটি টাকা যা বরাদ্দের ১১.০২ শতাংশ এবং রেলওয়ে, নৌ ও বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে ৪,৯২৫ কোটি টাকা যা বরাদ্দের ৬.২৩ শতাংশ। এই টাকার উত্স হবে সরকারি তহবিল থেকে ১৩,৮২৪ কোটি টাকা (২৯.৯৩%) এবং বৈদেশিক প্রকল্প সাহায্য থেকে আসবে ৪,০৭৪ কোটি টাকা । প্রস্তাবিত বাজেট বাষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এ.ডি.পি) এর মোট বরাদ্দ ৮০,৩১৫ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ ও পরিবহন, বিদ্যুত্, স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা ইত্যাদি, এর মধ্যে প্রকল্প রয়েছে ১১৮৭ টি। অগ্রাধিকারমূলক ও বড় ধরনের পদ্মা সেতুতে মোট বরাদ্দ ৮১০০ কোটি টাকাসহ রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, মেট্রোরেল,এলিভেটেড এক্সপ্রেস, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি ও পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন,ডিজিটাল ভূমি জরিপ ও রেকর্ড এবং ১টি বাড়ি ১টি খামার প্রকল্প ইত্যাদি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির খাতওয়ারী বিভাজনে সমাজ চিন্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদিতে তেমন কোন খাত পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে এই গুণগত চলকগুলোর ভূমিকা সবচাইতে বেশি। বাজেট পরবর্তী এক আলোচনায় বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন উত্স থেকে আয় আহরণ যাই হোক না কেন ব্যয়ের গুণগত মান প্রতিনিয়তই প্রশ্নবিদ্ধ হয় কেবল মাত্র সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার অভাবে। এই অবস্থায় বাজেট জনগণের জীবনমান উন্নয়নের কথা উল্লেখ থাকলেও সত্যিকার অর্থে নৈতিকতা উন্নয়ন ও দুর্নীতি দমনের জন্য কার্যকর কোন বরাদ্দ এ বাজেটে সরাসরি পরিলক্ষিত নয়, যদিও এগুলো সময়ের দাবি। তাই সারা মাস ধরে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের উপর আলোচনা চলবে এবং সর্বোপরি ৩০ শে জুনে সংসদ কর্তৃক বাজেট অনুমোদনের মাধ্যমে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। তাই সমাজ চিন্তা তথা নৈতিক ভিত্তিসহ সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো যেন বাজেট বিভাজনে বরাদ্দসহ সংযোজিত হয় এ ব্যাপারে পরামর্শ রইল। লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ ,গবেষক ও ডীন,সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা