বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও বিজ্ঞান চর্চা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দুইদিনব্যাপী যন্ত্র প্রকৌশল বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিএমই-২০১৩) গত শনিবার শেষ হইয়াছে। সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২টি দেশের ৩০০ জন বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। বিশেষজ্ঞরা বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার-উদ্ভাবন জনগণের দ্বারে পৌঁছাইয়া দিতে ইহার সামাজিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক বিজ্ঞানী ও তৃণমূলের মৌলিক প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তি প্রায়শ নানা আবিষ্কারের মাধ্যমে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। সেই খবর ফলাও করিয়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয় বটে, কিন্তু ইহার পর আর কোন খবর থাকে না। এসব বিজ্ঞানীর পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও তাহাদের উদ্ভাবনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের কথা রাষ্ট্র যেমন ভুলিয়া যায়, তেমনি এ ব্যাপারে বেসরকারি উদ্যোগও তেমন চোখে পড়ে না। ফলে তাহাদের মেধা ও প্রতিভা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। জনগণ এসব আবিষ্কারের সুফল হইতে বঞ্চিত হন। আমাদের জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থেই এই অবস্থার পরিবর্তন একান্ত কাম্য। এজন্য সরকার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সহিত বিজ্ঞানীদের যোগাযোগ স্থাপন করিতে হইবে। আবিষ্কারগুলির বাজারজাতকরণে সকলকে একযোগে কাজ করিয়া যাইতে হইবে। বুয়েটে যে ধরনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইল, ইহার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এক অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে। ইহাতে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ভাবিত পণ্যের পরিচিতি বাড়াইবার সুযোগ তৈরি হয় বৈকি। এই ধরনের সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হউক, ইহাই সকলের প্রত্যাশা। বস্তুত বিজ্ঞানীদের ছোট ছোট উদ্ভাবনকেও অবহেলা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা বাঞ্ছনীয় নহে। ইউরোপের রেনেসাঁর ক্ষেত্রে দার্শনিকদের চিন্তা-ধারা ও বিজ্ঞানীদের নানা মহত্ আবিষ্কার যুগপত্ মানব কল্যাণে অবদান রাখিয়াছে। তাহার ভিত্তিতে পশ্চিমা বিশ্ব এখনও গোটা পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করিয়া রাখিয়াছে। আমাদের দেশে তরুণ শিক্ষার্থীরাও অনেক সময় নানা কিছু উদ্ভাবন করিয়া তাক লাগাইয়া দিতেছে। কিন্তু তাহাদের প্রতিভার যত্ন ও উন্নয়নে তেমন নজর দেওয়া হইতেছে না। অথচ দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় আছে। এই মন্ত্রণালয়ের উচিত ঐসব বিজ্ঞানীর প্রতিভার বিকাশে নিরন্তর কাজ করিয়া যাওয়া। সাধ্যমত উদ্ভাবনগুলির বাণিজ্যিক উত্পাদন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সহায়তা করাও একান্ত কর্তব্য। বর্তমান পৃথিবীতে কোন দেশের ব্যাপক উন্নয়নের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানচর্চা। বাংলাদেশ একটি জনবহুল অথচ আয়তনের দিক দিয়া ছোট দেশ। তাই এই দেশের ব্যাপক উন্নয়ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানচর্চার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের দেশে আজকাল উল্লেখযোগ্য হারে বিজ্ঞান চর্চাই কমিয়া যাইতেছে। অনেক স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ হইয়া যাইতেছে। শিক্ষক ও বিজ্ঞান ল্যাবের অভাবসহ এক্ষেত্রে রহিয়াছে নানা সংকট। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি এই যে অবহেলা ও ঔদাসীন্য লক্ষ্য করা যাইতেছে তাহা মোটেও কাম্য নহে। এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উত্সাহব্যঞ্জক নয়। এখন আগের ন্যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান মেলাও অনুষ্ঠিত হইতেছে না। ইহা খুবই উদ্বেগজনক। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে গ্রহণ করিতে হইবে সর্বাত্মক উদ্যোগ। তরুণ বিজ্ঞানীদের মেধার বিকাশ ও মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। উদ্ভাবন যতই ক্ষুদ্র ও নগণ্য হউক, তাহাদের চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণায় ধরিয়া রাখিতে হইবে। দিতে হইবে সর্বপ্রকার উত্সাহ ও উদ্দীপনা। এজন্য জাতীয়ভাবে এ সংক্রান্ত পুরস্কারের সংখ্যা বাড়াইবারও প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে।