রমজান মাসে দ্রব্যের দাম স্থিতিশীল থাকার জন্য যা প্রয়োজন
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৪, ২১:০০
বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাজার ব্যবস্থাপনায় যে সমস্ত সমস্যা রয়েছে সেগুলো দূর করে অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় বার্ষিক মার্কিন ডলার ১২০০। ধীরে ধীরে জনগণের আয় প্রবাহ বাড়ছে। তবে রমজান মাস আসার পূর্বেই এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীবৃন্দের যোগসাজশে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে চিরাচরিত নিয়মে দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়, যদিও এটি অনেক ক্ষেত্রে Oligopolistic Nature-এর কার্টেলের কারণে হয়ে থাকে, কিন্তু ভুক্তভোগী হয় নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যদিও বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটিসমূহ দূর করতে সরকার সচেষ্ট রয়েছেন, তবে এটি একটি হোলিস্টিক এ্যাপ্রোচ। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার কথা। অথচ কৃচ্ছ তা সাধনের বদলে এক ধরনের ব্যাষ্টিক ভিত্তিতে যে চাহিদা গড়ে ওঠে তা একত্রিত হয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে দ্রব্যের দাম বাড়ে, ফলে দেশের অর্থনৈতিক মোট চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পণ্য সরবরাহ ন্যায্যমূল্যে যোগান দেয়া সম্ভব হয় না। ত্রুটিপূর্ণ ভারসাম্য ব্যবস্থা এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এক শ্রেণির মধ্যে দুর্বৃত্তায়ন প্রথা বিরাজ করায় যে ঘাটতির সৃষ্টি হয় তা রমজান মাসে দ্রব্যের দাম বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। সরকারি আইন-কানুন অনেক ক্ষেত্রে না মেনে পাইকারী বিক্রেতা থেকে আরম্ভ করে খুচরা বিক্রেতা এবং উত্পাদনকারীরা এই সময়ে দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাড়তি চাপ পড়ে ক্রেতাদের উপর।
ক্রেতারা রমজানের বাজার শুরুর আগে থেকেই সচেতন থাকেন স্বল্প দামে দ্রব্য কেনার জন্য। দুর্ভাগ্যজনক যে, ক্রেতাদের পক্ষে চাহিদা ও সাধ্যের মধ্যে যে ফারাক তা একটি চিরাচরিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে ক্রেতারা চায় সারাদিন রোজা থেকে একটু উন্নতমানের পুষ্টিকর খাদ্য খেতে। যদিও মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের বেশ উন্নয়ন হয়েছে, তবে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে লোভ-লালসা আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের দুর্বৃত্তায়নের বাসনাকে ঠেকানো খুব কষ্টসাধ্য। যারা রোজা থাকেন, তারা ইফতারীতে নানামুখী পণ্য যেমন মুড়ি, বুট, পেঁয়াজু, সরবত, বিভিন্ন ধরনের ফল, দুধ খেয়ে থাকেন। আবার রোজদাররা চেষ্টা করেন সেহেরীতে মাছ, মাংস, মুরগীসহ পুষ্টিকর খাদ্য খেতে। সেহেরীতে দুধ-কলা বা দুধ-আম খেতে এক শ্রেণির রোজাদার ভালবাসেন। তাদের এই চাহিদাই ব্যাষ্টিকভাবে যুক্ত হয়ে সামষ্টিক চাহিদায় পরিণত হয়। আর এই চাহিদা অনুসারে আগের থেকে লক্ষ্য নিয়ে বেসরকারি খাত যদি উত্পাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় প্রকৃত ধর্মের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুধুমাত্র নর্মাল প্রফিটে থাকত তবে দ্রব্যের দামের ঊর্ধ্বগতি হতো না। Opportunity Cost-এর ক্ষেত্রে একশ্রেণির ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী এবং উত্পাদনকারীর কাছে অতি মুনাফা রাখাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা এক্ষেত্রে অনেক সময় ধার্মিক হলেও ধর্মীয় বিধি নিষেধ ভুলে যান। ফলে এ দেশের মুসলমান ধর্মাবলম্বী ছাড়াও হিন্দু-খৃষ্টান-বৌদ্ধসহ অন্যদের বাড়তি দামে দ্রব্য ক্রয় করতে হয়। এক্ষেত্রে যে আয় বিক্রেতারা অর্জন করে থাকে তা যত না তাদের কাছে Permanent Income- কে Effect করে থাকে তার চেয়ে বেশি Transitory Income হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে ক্রেতা সাধারণের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে।
রমজান মাসে যখন দ্রব্যের দাম বাড়ে, তখন বাজার ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সমস্যা দেখা দেয়। ফলে আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি ঘটে না। দেখা দেয় পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের অভাব। আসলে এই সময়ে এক ধরনের মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়। এই মূল্যস্ফীতি যত না Cost Push inflation তার চেয়েও এটি Demand pull inflation চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস করে থাকে। ফলে অর্থ, মূল্য এবং ক্রয় ক্ষমতা এই ত্রয়ীর মধ্যে সঙ্গতি থাকে না। এক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে বেশি দায়ী থাকে বেসরকারি খাত। সরবরাহজনিত যে সমস্যাসমূহ তা Distribution Channel কে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। তার উপর যদি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির সৃষ্টি হয় তবে তা মরার উপর খাড়ার ঘা হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে রমজানে দ্রব্যের দাম বাড়ায় অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক ধরনের বাজারের ত্রুটি ধরা পড়ে। ত্রুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হওয়া দরকার। অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জামানের ভাষায়—বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলে সামাজিক কল্যাণ সাধিত হয়।
বর্তমানে সরকার রমজান মাসে যাতে দ্রব্যের দাম না বাড়ে সে জন্য টিসিবিকে সচল করতে চেয়েছেন। তাদের এই প্রয়াস সাধুবাদযোগ্য হলেও ষোল কোটির মানুষের দেশে বিভিন্ন স্থানে তাদের শাখা যেমন নেই, তেমনি সক্ষমতা নেই। একানব্বই সময়কালীন সরকার যেভাবে টিসিবিকে Downsizing করেছে, তা যত চেষ্টাই করা হোক নতুন করে সক্রিয় করা সহজে সম্ভব নয়। এজন্যে যে পরিমাণ অর্থায়নের দরকার, সেই অর্থায়ন নতুন করে দিলে তা আবার Cost-Benefit Analysis করলে আরো কতদূর লাভবান হবে সেটি বিবেচ্য। তবুও টিসিবিকে সীমিত পরিসরে হলেও সরকার সক্রিয় করেছেন-এক্ষণে তারা কিছুটা বাজার মূল্যের তদারকী ও হিসাব রক্ষণের পাশাপাশি বাজারের ত্রুটিসমূহকে দূর করতে সচেষ্ট থাকতে পারে।
রমজান মাসে যাতে ভোগ্যপণ্যের দাম না বাড়ে সে জন্য আগে-ভাগেই বেসরকারি খাতকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। ব্যাংকিং খাতে এলসি খোলার জন্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছেন। ব্যাংকিং সেক্টরে সুবিধা দিলেও তা কতটুকু সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে তা নির্ভর করে থাকে বেসরকারি বিক্রেতাদের উপর। আগের থেকে এলসি খুলে প্রয়োজনীয় চাহিদাজনিত দ্রব্যসমূহ বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। অথচ দ্রব্য ঠিক সময়মত বন্দরে পৌঁছালেও অনেক সময়ে কৃত্রিম সংকট ব্যবসায়ীরা তৈরি করে থাকেন। অভ্যন্তরীণ বাজারেও যে সমস্ত পণ্য উত্পাদিত হয় সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এই ধরনের কৃত্রিম সংকট বাজার ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় স্বরূপ।
বিদেশেও দেখেছি যে, যখন খৃষ্টমাস হয় তখন ভোগ্যপণ্য, পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদের দাম কমানো হয়। আবার আগের থেকেই হিসাব করে উদ্বৃত্ত উত্পাদন করা হয় যাতে কোন ঘাটতি না দেখা দেয়।
সরকার ইতোমধ্যে রমজান উপলক্ষে বেশ কিছু আমদানিযোগ্য পণ্যের উপর সাময়িকভাবে শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করেছেন। ভতুির্কও কোন কোন পণ্যের ক্ষেত্রে করেছেন। এদেশেও এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার যাতে রমজান মাসকে লক্ষ্য করে দ্রব্যের চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত উত্পাদন অথবা বিদেশ থেকে সময়ের পূর্বেই পণ্যের আমদানিকরণে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশে সরকার সচরাচর Facilator-এর ভূমিকা পালন করে থাকে। এদিকে যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করতে না পারে সে জন্য আগে-ভাগেই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সক্রিয় হতে হবে। এফবিসিআই বাজার মনিটরিং-এর দায়িত্ব ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে নিলেও তা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। এবারের রমজান মাসে যাতে ভোগ্যপণ্য এবং পোশাক-পরিচ্ছদজনিত দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে সে জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিখাত, তৃণমূল পর্যায়ের ও স্থানীয় পর্যায়ে একযোগে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে ও তৃণমূল পর্যায়ে লক্ষ্য রাখতে হবে কখন কোন মূল্যে দ্রব্য শপিংমলে প্রবেশ করে এবং কি দামে তা বিক্রি হয়ে থাকে। আসলে বাজারের ত্রুটিসমূহ দূর করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে বিক্রেতাদের পাশাপাশি ক্রেতাদের সাইকোলজীও পরিবর্তন করতে হবে। ক্রেতারা যাতে বেশি দামে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ না হয় সেদিকে তাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের দেশে এক শ্রেণির ক্রেতা রয়েছেন, যারা বেশি দামে পণ্য ক্রয় করতে পছন্দ করেন। তাদের জন্যে সাধারণ ক্রেতা শ্রেণি নানামুখী সমস্যায় পড়ে থাকে। ক্রেতাদের মধ্যে কৃচ্ছ্রতা সাধনের জন্য আগ্রহ জন্মাতে হবে। আর তাহলে বিক্রেতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে এক ধরনের চান্স সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম একটি কাজ করতে পারেন-আন্তর্জাতিক বাজারে কি দামে কিছু আমদানিতব্য ভোগ্যপণ্যের দাম উল্লেখ করে তাদের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে দিতে পারে। এর ফলে সাধারণ ক্রেতা শ্রেণির মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
সরকার উপজেলা পর্যায় থেকে আরম্ভ করে রাজধানীর বাজারসমূহ তদারকীর জন্য প্রশাসন যন্ত্রের সাহায্য নিতে পারে। পাশাপাশি এমপি মহোদয়রা এবং উপজেলা চেয়ারম্যানরা বাজার তদারকীতে এগিয়ে আসতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যানরাও বাজার তদারকী করতে পারেন। রমজান মাসে যাতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতি হ্রাস করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বেসরকারি খাত। সামষ্টিক চাহিদা ও সামষ্টিক যোগানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। অতিরিক্ত চাহিদার বদলে সংযমী চাহিদা বিক্রেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্রব্যের দাম বেশি না বাড়াতে সাহায্য করবে। রমজান মাসে জনমানুষের জন্য দ্রব্যের দাম যাতে ঊর্ধ্বগতি না হয় সে জন্য হোলিস্টিক এ্যাপ্রোচ প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন বাজার কাঠামোয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং জনসচেতনতা। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে পণ্যের দাম তদারকি করে রিপোর্ট প্রদান ও বাজারে দ্রব্যের দাম হ্রাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনোমিষ্ট
ই-মেইল:pipulbd@gmail.com