চট্টগ্রামের দুঃখ

ভরাট ও বেদখল হইয়া যাওয়া চাক্তাই খালটি যে চট্টগ্রামবাসীর দুঃখের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল—তাহা বেশিদিন আগের কথা নহে। তাহার প্রতিকার তো হয়ই নাই, বরং সেই দুঃখই যেন এখন গ্রাস করিতে চলিয়াছে প্রায় অর্ধকোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসাবে পরিচিত বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে। সেই দুঃখের নাম জলাবদ্ধতা। শুরু হইয়াছিল চাক্তাই খাল-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে। ইতিমধ্যে পরিস্থিতি কতোখানি ভয়াবহ রূপ ধারণ করিয়াছে গণমাধ্যমের বদৌলতে গত তিনদিন ধরিয়া সারা দেশের মানুষ স্বচক্ষে তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া আসিতেছেন। টানা বর্ষণ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করিয়া তুলিয়াছে। কার্যত অচল হইয়া পড়িয়াছে কর্মব্যস্ত এই মহানগরটি। গণপরিবহন চলাচল প্রায় বন্ধ। বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা-বাণিজ্যে নামিয়া আসিয়াছে স্থবিরতা। প্রধান দুইটি বাণিজ্য কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ এবং আগ্রাবাদও কবলিত হইয়াছে জলাবদ্ধতায়। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার চিত্রও ভিন্ন নহে। সব মিলাইয়া চরমে পৌঁছাইয়াছে নগরবাসীর দুর্ভোগ। বিগত বত্সরগুলিতে বহু প্রতিশ্রুতি তাহারা শুনিয়াছেন। আস্থাও স্থাপন করিয়াছেন তাহাতে। কিন্তু নগরবাসীর অভিজ্ঞতা এতোটাই তিক্ত যে সহসা এই দুর্ভোগ হইতে পরিত্রাণের আশা তাহারা ছাড়িয়াই দিয়াছেন। বরং সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে বর্ষণ আরও দীর্ঘায়িত হইলে কী হইবে সেই আতঙ্ক। অতএব, জলাবদ্ধতার সমস্যাটি অকস্মাত্ মাটি ফুড়িয়া উদ্ভূত হইয়াছে, এমন কথা বলিবার অবকাশ নাই। প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও নগর কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন ধরিয়া ধীরে ধীরে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করিয়াছে। সমস্যাটির সহিত সকল পক্ষেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া চট্টগ্রামের পূর্ববর্তী ও বর্তমান মেয়রের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকারই ছিল জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান। এখন সকলেই হয়তো সমস্বরে বলিবেন যে, তাহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছেন। কথাটি আক্ষরিক অর্থে সত্য, আবার গভীরতর অর্থে সত্য নহে। সত্য এই অর্থে যে দৃশ্যত খাল খনন ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হইয়াছে। তাহার পিছনে যথেষ্ট অর্থব্যয়ও যে হইয়াছে তাহাও নিশ্চিত। কিন্তু জলাবদ্ধতা নামক ব্যাধিটির জন্য যেই কারণগুলিকে দায়ী বলিয়া মনে করা হয় তাহার যথাযথ চিকিত্সা হয় নাই অদ্যাবধি। বিশেষজ্ঞরা প্রধানত তিনটি কারণ চিহ্নিত করিয়াছেন। সেইগুলি হইল—প্রথমত, নগরের খাল ও নালা-নর্দমাগুলি দখল হইয়া যাওয়া; দ্বিতীয়ত, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং তৃতীয়ত, অপরিকল্পিত নগরায়ন। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে ইহার দায় সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এড়াইতে পারিবেন না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, শুধু যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই খাল ও নালা-নর্দমা দখল করিয়াছেন তাহা নহে, ক্ষেত্রবিশেষে রক্ষকও যে ভক্ষকের ভূমিকায় আবির্ভূত হইয়াছেন এমন দৃষ্টান্তেরও অভাব নাই। যাহাই হউক, এই সমস্যার সমাধানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জাতিসংঘের দুইটি সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৫ সালে একটি ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করিয়াছিল। তাহা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে। কিন্তু গত প্রায় দুই দশকেও ইহার বাস্তবায়ন শুরু করাই সম্ভব হয় নাই। সময়ের কাজ সঠিক সময়ে না করিলে যাহা হয়—এই ক্ষেত্রেও ঠিক তাহাই হইয়াছে। শুধু যে জলাবদ্ধতার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করিয়াছে তাহাই নহে, সেইসাথে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে সম্ভাব্য ব্যয়ের বোঝাও। চট্টগ্রামের মেয়র মনজুর আলম জানাইয়াছেন যে, সোয়া নয়শত কোটি টাকার মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করিতে এখন প্রয়োজন আড়াই হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নিমজ্জমান অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই মহানগরটিকে রক্ষা করিতে হইলে উক্ত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ছাড়া যে গত্যন্তর নাই—সেই ব্যাপারে সকলেই একমত। কালক্ষেপণ সমস্যাকে আরও জটিল করিবে মাত্র। নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টিকে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিবেন বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। তবে ইহাও অনস্বীকার্য যে, খাল-বিল-নদী-নালা গ্রাস করিয়া লইবার পরিবেশ-বিধ্বংসী আগ্রাসী মানসিকতার লাগাম টানিয়া ধরিতে না পারিলে শুধু বিশাল অংকের টাকা ঢালিয়া এই বিপর্যয় রোধ করা যাইবে না।