আষাঢ়স্য দিন
এমন ঘনঘোর বরষায়
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৪, ২১:১৩
আষাঢ় মোহগ্রস্ত করছে আকাশকে আর বৈষ্ণব কবিগণ ঘোরগ্রস্ত করছে আপনাকে। কল্পনার গল্পে ইতোমধ্যেই আপনি-ই রূপায়িত হয়েছেন মেঘদূতে। ভাবছেন, আরে! এই তো সেইদিন যেদিন দুজনে মুখোমুখি, গভীর দুঃখে দুঃখী হয়ে পাড়ি দেবেন তপনহীন ঘন তমসা। বাহ্ বাহ্ আপনার কল্পনাশক্তি এই নগরযন্ত্রের এত শক্তপোক্ত পাষাণতর ঘা খেয়েও অবশিষ্ট আছে তাহলে! তবে থাকুন সেই ইউটোপিয়ায়, কিন্তু বাস্তবের নির্দয় স্ক্রিপ্টে আছে ঝুঁকিময় খানাখন্দে ভরপুর রাস্তাঘাট, অগণন ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল আর জলজট—যা আপনার কাব্য অনুরাগকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। অন্য আরো সব পাথরমনের মতো আপনিও ভাবতে বাধ্য হবেন যে, বৃষ্টিও এক সন্ত্রাস-ই বটে। আর কিছু নয়, আর কিছু নয়।
বাঁশ বাগানে বৃষ্টির রহস্যময়তা, ধানক্ষেতে বৃষ্টির কাব্যিকতা, টিনের চালের বৃষ্টির রোমান্টিকতার সব স্মৃতি জলাঞ্জলি দিয়ে এই যাদুনগরের ক্যারিয়ার যশোপ্রার্থী একজন নাগরিক হিসেবে আপনাকে মানতেই হবে যে, বৃষ্টির অত সব নামধাম ‘জাস্ট রাবিশ’। এই শহরে বৃষ্টির নাম একটাই, আর তা হলো ‘কেরানী মারা বৃষ্টি’। আপনার ইমোশন বাগড়া দিলে ওয়াসা, ডেসা, সিটি কর্পোরেশন আর টি. এ্যান্ড. টির মতো চার-চারটি প্রতিভাবান প্রতিষ্ঠান আপনাকে মানিয়ে ছাড়বে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রার’ সঙ্গে সঙ্গে এই নগরীর রনজুরাও নিরুদ্দেশে ধাবমান। কে ভাবছে? কার এত সময় আছে ভাবার যে এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। কেউ ভাববে না। খ্যাতি আর বিত্তের বাসনা কাঁধে চাপিয়ে যারা এই নগরীতে কেন্নো কেঁচোর মতো বেঁচে আছেন, সহসা বৃষ্টিতে তাদের প্রথম কাজই হলো রাস্তার দুপাশের দোকানপাট আর ছাউনির মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে কোনরকম বৃষ্টি থেকে গা বাঁচানো।
তুমুল আকাশভাঙা তীব্র বৃষ্টিতে স্বেচ্ছায় ছাতাবিহীন কাউকে এলোমেলো হেঁটে যেতে দেখি না কতদিন!! ক-ত দিন। বৃষ্টি এলে যারা ঝাঁকে ঝাঁকে আরশোলার মতো দৌড়ে বৃষ্টিহীনতার আশ্রয় খোঁজে, বৃষ্টি তাদের কাছে ভালোবাসা নয়, ভোগান্তির গ্যারান্টি। আর চাইলেই তো আপনি বৃষ্টিতে চারপাশে বাঁকা জলের খেলা দেখতে পারবেন না, বরং দেখবেন প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা আর বর্জ্যযুক্ত জলের ঢল। অতএব মুষলধারা, অঝোরধারা, আষাঢ়ধারা, হূদয়ধারা কোন বৃষ্টিই আর অভিমানী কঙ্কাবতীর মতো আপনাকে ব্যথিত করবে না। করবে কেন? ইতিমধ্যেই আপনি পরিণত হয়েছেন এই নগরীর একজন অতি তত্পর ক্যারিয়ারিস্টে। বৃষ্টি যার কাছে—‘ধ্যাত মেকআপটাই মাটি।’
হ্যাঁ বৃষ্টি খুব প্রাকৃতিক বলেই মেক-আপ গলিয়ে আমাদের মুখোশ এঁটে থাকা আসল মুখ-খানাকে বের করে আনে। মনে পড়ে একাত্তরের জুন-জুলাইয়ের অবিরল অবিরাম বৃষ্টি আমাদের অস্তিত্বের পক্ষে অনুকূল যুদ্ধজয়ী প্রতিবেশ তৈরি করেছিলো। মনে পড়ে শত ছিদ্রময় টিনের চাল থেকে গড়িয়ে পড়া অঝোর বৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিল বাঙালির হতদরিদ্র বোন দুর্গাকে। ঘোরতর বর্ষার দুর্বিপাকে পড়ে পোস্টমাস্টার, উলাপুর গ্রাম আর রতনকে বিদায় দিয়ে বলেছিলো ‘পৃথিবীতে কে কাহার’? ক্ষুধিত বর্ষার গভীর জল কেড়ে নিয়েছিলো চন্নর খোকাবাবুকে। অতিথি গল্পের তারাপদকে নোঙরহীন করেছিল কে? এই ঘোরতর বর্ষাই তো!
বিজ্ঞানীদের হিসেব আবার সাহিত্যিকদের বিপরীত। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বৃষ্টির ভূমিকা, প্রিমৌসুম মনসুনের সূক্ষ্ম হিসেব আছে রেইন ফরেস্ট, জি.টি.এস স্টেশন বৃষ্টির ডিজিটাল রিডিং নিয়ে বিস্তর গবেষণা। আবহাওয়াবিদদের কাছে বৃষ্টির উপমা শত্রুবৃষ্টি-বন্ধুবৃষ্টির ঘেরাটোপ। কৃষকের কাছে অতি বৃষ্টি মানে (জুন-জুলাইয়ের) ডাল, কলাই, সয়াবিন, চীনা বাদামসহ রবিশস্যের বিপুল ক্ষতি। পুঁজিতন্ত্রের মোড়লদের কাছে, বৃষ্টি নামক পণ্যের সর্বোচ্চ মুনাফা আদায়। প্রাকৃতিক দানকে বিত্তবানের আওতায় আনার বিকেন্দ্রীকরণ। পুঁজির বিভাজনে একুশ শতকে অতএব বৃষ্টিও বিভাজিত। বিত্তবানের কাছে বৃষ্টি মানে বি.এম.ডব্লিউর ঝকঝকে গ্লাসের আড়ালে আড়চোখে বৃষ্টি দেখা, মধ্যবিত্তের কাছে মেঘ থৈ থৈ আকাশে চলন্ত ট্রেনের জানালায় সহসা ঝাপটা আর বিত্তহীনের কাছে কর্মহীন দিনরাত্রির হাহাকার। মেঘমল্লারের রাগ-রাগিনী ভেদ করে পাশের বস্তি থেকে যখন ভেসে আসে ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, সেই কান্নার অনুবাদ একটাই-হায়! কী বৈষম্য! কী বৈষম্য! কী অন্যায়! কী ভীষণ অন্যায়!!!
লেখক :কথাসাহিত্যিক