স্মরণ

সাংবাদিক মাহবুবুল আলম বেঁচে থাকবেন আপনগুণে

বর্ষীয়ান সাংবাদিক সবার প্রিয় মাহবুবুল আলম চলে গেলেন এই ক’দিন আগে। শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক এবিএম মূসার প্রয়াণের পর তার মৃত্যু গণমাধ্যম জগতে যে এক বড় শূন্যতা তৈরি করলো এতে কোনো সন্দেহ নেই। গণমাধ্যমের অনেকেই বলেছেন, অভিভাবকতুল্য এই মানুষটি চলে যাওয়ায় অপার ক্ষতিই হয়ে গেল। কেউ কেউ বলেছেন, তাঁর মৃত্যু গণমাধ্যমের জন্য এক বড় ধাক্কা। যে ধাক্কা সহজে কাটিয়ে উঠার নয়। একে একে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে এক একটি সাহসী নক্ষত্র। মাহবুবুল আলমের আকস্মিক প্রয়াণে শুধু যে গণমাধ্যমের ক্ষতি হয়েছে সেটা বললে ভুল হবে, বড় দাগে বিবেচনা করলে দেশেরও অনেক ক্ষতি হলো এবং সেই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। মানুষটি কেবল গণমাধ্যমের চৌহদ্দির মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না, গণমানুষের কাছেও ন্যায় সত্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন। এই সময়ে যারা দেশের গণতন্ত্রের জন্যে, গণমানুষের জন্যে সত্য, সঠিক কথা উচ্চারণ করছিলেন মাহবুবুল আলম ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। আর এই কারণেই সাধারণ্যেও তিনি বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, সাংবাদিকতায় বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার অধিকারী প্রথিতযশা এই সম্পাদকের অবদান সংবাদপত্র জগত্ গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘মাহবুবুল আলম ছিলেন একজন নির্ভীক, স্পষ্টভাষী, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন সাংবাদিক। তার কর্ম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’ মাহবুবুল আলম বরাবরই ছিলেন নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ, বিনয়ী এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। সবসময় পর্দার আড়ালে থেকে নিজের কর্মকৌশল, দক্ষতা, সৃজনশীলতা উপস্থাপন করেছেন। জীবনভর তিনি কাজে নিমগ্ন থেকেছেন। মৃত্যুর আগেও তিনি বিবিধ কর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই মানুষটি সাধারণ্যে পরিচিত হয়ে উঠেন মূলত ২০০৭ সালে। সে সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। মাহবুবুল আলমের সাংবাদিকতা ও তত্সংশ্লিষ্ট জীবন দীর্ঘ এক নদীর মতো। যে নদী কেবলই বয়ে চলেছে আপনমনে। ১৯৩৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন মাহবুবুল আলম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন তিনি। ১৯৫৭ সালে সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটস প্রেস অব পাকিস্তানে (এপিপি) কাজের মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতার শুরু। দীর্ঘ ১৮ বছর ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে গত বছরের অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখে তিনি অবসরে যান। সাংবাদিকতায় মাহবুবুল আলমের পদচারণা দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অনেক পত্রিকাতেই কাজ করেছেন। এই অসাধারণ মানুষটির সাথে অনেকের মতো আমারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল চমত্কার। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে পেয়েছি। তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। কোনো অনুষ্ঠানে আসার জন্যে যখনই ফোন করেছি, তিনি সাড়া দিয়েছেন। বিশেষ করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি এবং এটিএন বাংলা আয়োজিত বিতর্ক বিষয়ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে কয়েকবারই অতিথি বক্তা হয়ে এসেছেন। কথা বলেছেন, তরুণদের উদ্দীপ্ত করেছেন। সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব মাহবুবুল আলম চলে গেলেও তিনি মানুষের মন থেকে মুছে যাবেন না তার আপন কর্মগুণের কারণে। তাকে মানুষ মনে রাখবে পরিচ্ছন্ন, সততা এবং সাহসের মূর্ত প্রতীক হিসেবে। লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি kirondebate@gmail.com