বিএনপির মুখে সংলাপ, বাস্তবতা কী?
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৪, ২১:২৪
গত ১৯ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বিএনপির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন প্রসঙ্গে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বর্জনটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ নির্বাচনই হচ্ছে সরকার পরিবর্তনের একমাত্র উপায়।’ গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে এখনও আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। নির্বাচন প্রসঙ্গে সংলাপ নিয়ে ইতিমধ্যেই বিএনপির রাজনৈতিক মনোভাব পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এক্ষেত্রে বিএনপির সংলাপে যাওয়ার বিশেষ শর্ত বহাল রয়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন প্রশ্নে সংলাপ অনুষ্ঠানে বিএনপি ছাড় দিতে চায়। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘সংলাপের ব্যাপারে সরকারের কোনো কার্পণ্য নেই; তবে তা হবে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে।’ যদিও বিএনপি সংলাপ নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনীতির নতুন ছক সাজানোর পরিকল্পনা করেছে। তবে যেহেতু বিএনপির সংলাপে যাওয়ায় বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ সেহেতু এটি কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি রাজনীতিতে বিদ্যমান টানাপোড়েনের শেষ হবে না। কারণ ‘শালিস মানি তালগাছটা আমার’— ধরনের সংলাপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকার পরিচালনায় যে দৃঢ়তা কাজ করছে তাতে কোনোভাবেই সরকারকে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার অবকাশ পাবে না। ফলে বিএনপির শর্তসাপেক্ষে সংলাপের আহ্বান নিছক লোক দেখানো আহ্বান ছাড়া কিছুই না। গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি, বিএনপি সংলাপ এবং আন্দোলনকে পাশাপাশি রেখেছে। অর্থাত্ সংলাপ না হলে ঈদের পর আন্দোলনে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।
২০ জুন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সংলাপ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবকে বলেন, ‘মেয়াদ শেষ হলেই বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার যেকোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে সংলাপে রাজি আছে।’ প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করছি, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসাতে জাতিসংঘ থেকে বিভিন্ন মহলের তত্পরতা থাকলেও তা সফল হয়নি। এমনকি বিএনপি চেয়ারপার্সনকে টেলিফোন করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা নজির সৃষ্টি করলেও হরতালের কারণ দেখিয়ে ওই সময় আলোচনায় খালেদা জিয়া রাজি না হয়ে ইতিহাস বদলানোর সুযোগ থেকে দেশবাসীকে বঞ্চিত করে। ইতিহাস বদলানোর প্রসঙ্গটি একটু পরিষ্কার না করলেই নয়। যেহেতু ’৯০-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে ইতিপূর্বে কোনো সরকার প্রধান বিরোধী দলের নেতাকে টেলিফোনে সংলাপের আহ্বান জানাননি, এ কারণে কোনো সংলাপও হয়নি। কাজেই গতবছর ২৫ অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বিরোধী দলের নেতা সাড়া দিলে নতুন ইতিহাস রচিত হতো। যদিও বিএনপি চেয়ারপার্সনের দেয়া আলটিমেটামের সময় শেষ না হতেই প্রধানমন্ত্রী এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
সংলাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৪ জুন গণভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে অদূর ভবিষ্যতে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি মধ্যবর্তী কিংবা আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেন। সম্প্রতি চীনে ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফেরার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘মা বলে সংলাপ চাই, আর ছেলে বলে তার বাবার হত্যাকাণ্ডের জন্য আমাকে রিমান্ডে নেয়া দরকার। আগে তারা কী চায় সেটা শুনে তবে এ বিষয়ে উত্তর দেব। তবে যা করব দেশের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণের জন্য যা ভালো হয় সেটাই করব। আর সংলাপের বিষয়ে সময় এলে দেখা যাবে কি করব।’
সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, তিনি যে কোনো মুহূর্তে সংলাপে বসতে রাজি আছেন। দেশের সুশীল সমাজের পক্ষ থেকেও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নতুন নির্বাচন দেয়ার পক্ষে মত দেয়া হয়েছে। প্রখ্যাত আইনজীবী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ ব্যাপারে মন্তব্য করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের তোপের মুখে পড়েছেন। জাপান ও চীন সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনায় সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন। প্রতিবেশী ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হওয়ার সাথে সাথে বিএনপি জোট ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে যে উত্সব-উত্সব ভাব হয়েছিল তা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, মোদি সরকার বিএনপির প্রতি আগ্রহ দেখাবে না। এসব কারণেই বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। যদিও ৮ জুন ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দলের এমন অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো জায়গায় সংলাপে বসতে রাজি তারা। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে মেনে না নেয়ার সিদ্ধান্তে এখনও অটল তারা। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে আগেই মেনে নেয়া হলে তো সংলাপেরই প্রয়োজন পড়ে না। বিএনপি মনে করে বিগত নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের উদ্দেশে বিরোধী নেতাকে ফোন সম্পূর্ণ লোক দেখানো। কিন্তু আমাদের কথা হলো প্রধানমন্ত্রীর ফোন যদি লোক দেখানোই হতো তবে সংলাপে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কৌশলটি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে পারতো। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ফোন যে লোক দেখানো, তাও জনগণকে বোঝান যেত। অতএব, প্রধানমন্ত্রীর ওই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়া ছিল বিএনপির বড় একটি রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের দু’একটি ফাটল চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। আবার বিএনপিও চায় না, জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হোক। ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে সংলাপে আসার আহ্বান রয়েছে। কিন্তু ’৯০-পরবর্তী জামায়াতের ভোটের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাদের নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। যেটিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার জন্য কাজে লাগাতে চায়। কাজেই জামায়াতকে ছেড়ে এসে সংলাপে বসার বিষয়টিও বিএনপির জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ বটে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে যায় জামায়াত। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়েই ক্ষমতায় ফেরে চারদলীয় জোট। লাভবান হয় জামায়াত। ওই নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭টিতে। শুধু তাই নয়, তখন মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে নিন্দিতও হয়েছিলো বিএনপি। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল চারদলীয় জোট সম্প্রসারিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। সম্প্রতি কাজী জাফরের জাতীয় পার্টি যোগ দিলে জোট ১৯ দলের রূপ নেয়। এই জোটে অন্য দলগুলো নামসর্বস্ব হওয়ার কারণে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের ওপর দিন দিন নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বিএনপি। নির্বাচনের আগে যেসব আন্দোলন হয়েছে, সেখানে বিএনপির নামেমাত্র অংশগ্রহণ ছিল, জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ছিল মুখ্য। বিগত নির্বাচন-পূর্ব জামায়াতের সংঘটিত অপতত্পরতা, সহিংসতা বিএনপির রাজনীতিতে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন বিএনপিও চায় সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে।
১৭ এপ্রিল জোটের বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জামায়াতের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটে জামায়াত থাকছে, নাকি সরকারের সঙ্গে আঁতাত করছে, দলটিকে তা পরিষ্কার করতে বলেন তিনি। খালেদা জিয়া উপস্থিত জামায়াত নেতা আবদুল হালিমকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করলে আপনারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তারা আপনাদের ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র করবে।’ খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্য প্রমাণ করে যে, জামায়াতের সঙ্গে কিছুটা টানাপোড়েন হলেও তারা জামায়াতকে ছাড়তে চায় না।
বিগত উপজেলা নির্বাচনের সময়েও জামায়াত বিএনপিকে এড়িয়ে চলেছে। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জায়গাগুলোতেও প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। বিষয়টি নিয়ে তখনই কথা ওঠে। এছাড়া সরকারি দলের লোকদের দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চে ভাঙন ধরানোর নানা তত্পরতায় সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতার বিষয়টি আরো সামনে আসে। তবে সরকারকেও মনে রাখতে হবে জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতের প্রশ্নটি সাধারণ জনগণের নিকট নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য হবে না। অবশ্য আমরা তেমনটি মনেও করছি না।
কাজেই এই মুহূর্তে বিএনপি সংলাপে আসতে চাইলেও তাদের পিছুটান রয়েছে যথেষ্ট। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত সরকারকে পাঁচ বছরের আগেই সরিয়ে দেয়া সহজ কাজ নয়, এ বিষয়টিও বিএনপিকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগকেও মনে রাখতে হবে, জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের মণিকোঠায় পৌঁছাতে না পারলে আগামী নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। এ কারণে জনগণের সঙ্গে কীভাবে সুসম্পর্ক রক্ষা করা যায়, সে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে গভীরভাবে। অতএব, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের সামনে একটিই চ্যালেঞ্জ, আর সেটি হলো একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: sultanmahmud.rana@gmail.com