আলোকপাত

মদ্যপান থেকে সাবধান

মদ্যপানের ফলে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয় অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিস (এএলডি) তার অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব পুরুষ নিয়মিতভাবে ৪০ থেকে ৮০ গ্রাম এবং যেসব মহিলা ২০ থেকে ৪০ গ্রাম মদপান করেন দশ বছরের মধ্যে তাদের এএলডি রোগের জন্ম হয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে লিভারের কোষসমূহ ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। মদ পাকস্থলি বা মূত্রাশয়ে জমা হয় না। মদ রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। মদ কতটা সেবন করা হয়েছে, তা বুঝা যায়, লিভার কতটা নষ্ট হয়েছে তা দেখে। রক্তে মদের পরিমাণ ০.০২ শতাংশ হয়ে গেলে মানুষ বাহ্যজ্ঞান হারাতে শুরু করে। এরপর মদের পরিমাণ ০.০৪ শতাংশ হলে শরীরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং মনোসংযোগের ব্যাঘাত ঘটে। মদের পরিমাণ যদি ০.০৬ শতাংশ দেখা যায়, তখন মদ্যপায়ীকে স্ফূর্তি করতে দেখা যায়। পরিমাণ যদি ০.০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায় তখন ব্যক্তিবিশেষের আচরণের উত্তেজনা দেখা যায়। পরিমাণ ০.১২ শতাংশ হলে কথায় জড়তা আসে। তারপর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। যখন মদের পরিমাণ ০.১৫ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। পরিমাণ ০.২০ শতাংশ হলে ব্যক্তিটি বমি করতে বাধ্য হয়। মদ্যপায়ী লোকটির মাথা ঘুরতে থাকবে যখন মদের পরিমাণ ০.৩ শতাংশ হয়। পরিমাণ ০.৪ শতাংশ হলে হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। এবং পরিমাণ ০.৬০ শতাংশ হলে ফুসফুস ও হূদযন্ত্রের ক্রিয়াতে প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানে। এই অবস্থায় মদ্যপায়ীর মৃত্যুও হতে পারে। অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিসের তিনটা পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়টি হলো লিভার ফুলে যাওয়া। যারা অতিমাত্রায় মদ্যপান করেন তাদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা হয়। দ্বিতীয় পর্যায় হল লিভারের প্রদাহ—যার নাম অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস। এই হেপাটাইটিস বিভিন্ন ধরনের। জটিল অবস্থায় উপনীত হলে, তখন বাইরে কিছু লক্ষণ ফুটে ওঠে। এই লক্ষণের একটা হলো জন্ডিস। রোগী অস্বস্তি অনুভব করেন। বমিবমি ভাব হয়, সঙ্গে ডায়রিয়া। পেটের ব্যথা এবং শরীরের ওজন কমে যায়। এই অবস্থায় ক্ষুধা না লাগা অবস্থার উদ্ভব হয়। রক্তবমির উপক্রম দেখা যায়। এএলডি-র তৃতীয় পর্যায় হলো লিভার সিরোসিস, যেটা হলে মৃত্যু আর রোধ করা যাবে না। অত্যধিক মদ্যপান করলে পাঁচ সাত বছরের মধ্যে লিভার সিরোসিস হতে বাধ্য। প্রথমে লিভার ফুলে যায়, তারপরই ক্রনিকরূপ ধারণ করে। এরপর হেপাটাইটিস আর অন্তিম পর্যায়ে সিরোসিস। লিভার সিরোসিস হলে ৪০ শতাংশ রোগী ৭ বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারেন। অন্যথায় ৬০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু ঘটে। সাধারণত যেসব রোগী রক্তবমি করেন, তাদের লিভার প্রক্রিয়া বিকল হয়ে পড়ে। সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। তারপরই রোগী হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’-তে আক্রান্ত হন। তারপর বেঁচে থাকার আর কোনও পথ থাকে না। একটার পর একটা সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়। এর জটিল সমস্যাগুলো এই প্রকার ঃ শরীরে পানি জমে। বিশেষ করে পেট এবং পায়ে পানি দেখা দেয়। পাকস্থলীতে রক্তক্ষরণ হবার আশঙ্কা দেখা দেয়। প্লীহা বড় হতে থাকে। এএলডি হলে এনিমিয়া বা রক্তহীনতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে। লিভারে রক্তের চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। হেপাটিক এনকেফেলোটিক হতে দেখা যায়। এই অবস্থায় রোগী উন্মাদ হয়ে যেতে পারেন। মস্তিষ্কে বিসংগতি দেখা যায়। কারো কারো পেটের জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। আমাশয়ের প্রদাহ দেখা দেয়। মানসিক রোগের উদ্ভব হয়। যৌন জীবন যাপনের উপর এর প্রভাব পড়ে। পেশী, বিশেষ করে হূদযন্ত্রের পেশীর উপর প্রভাব পড়ে। রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। স্নায়ুবিক কোষসমূহ ধ্বংস হতে শুরু করে। মেদবহুলতা প্রকট হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে মদের উপর নির্ভরশীলতা চরমে পৌঁছায়। উল্লেখিত লক্ষণগুলো রোগীর দেহে দেখা দিলে অতিসত্বর চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। মদের প্রচলন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব না হলেও, এর অপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা খুবই দরকার। তাতে সমাজ ও দেশের পক্ষে মঙ্গল। অনেক পিতা-মাতা ঘরের ভিতরেই সন্তানের সামনে মদ পান করেন। সন্তানের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে এসব বন্ধ করা উচিত। জেনে রাখা ভাল মদ্যপানের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটে। মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য অল্পেই হারিয়ে যায়। মদ্যপানের ফলে এনজাইমসমূহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বদহজম দেখা দেয়। শরীরে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থের অভাব দেখা দিতে থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘বি-১২১ এ অভাব দেখা দেয়। কাজেই মদ্যপান থেকে সাবধান। লেখক:সাংবাদিক, সদস্য-জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ কমিটি, সিলেট