মন ভোমরা
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২০:২০
আমি তখন কলেজে কেবল ভর্তি হয়েছি। চোখ-কান খুলতে শুরু করেছে। রাজনীতির ‘র’ বুঝি না তখন তবে সবার মতো শেখ মুজিব বুঝি। ৭ মার্চ লাখ লাখ মানুষের মধ্যে মিশে ভাষণ শুনেছি। যা হওয়ার হয়ে গেছে প্রাণে প্রাণে। দিন যেতে থাকে রাস্তা ঘাটে মিছিল আগুন গুলি রক্ত এসব দেখতে দেখতে বু থেকে ভয়ডর পালিয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে সাহস।
পুরো ভারত হয়ে গেল আমাদের মামাবাড়ি। আমাদের গায়ে তখন জাপানি কেরোলিন টেট্রন নেই। পায়ে নেই জুতো। পকেটে নেই ফুটো কড়ি। পেটে খিদে চোখে স্বপ্ন—বাংলাদেশ। ওই স্বপ্নটার জন্যই ওরা আর কিছু না থাকা আমাদের তখন ভাবতে শুরু করে আমরা ইতিহাসের বরপুত্র, রূপকথার রাজপুত্র।
এখনও আমি মামাবড়ি গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প যেখানে ছিল তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। যে গাছে লাশটা ঝোলানো ছিল সে গাছটা নেই, জায়গাটা রয়েছে। জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালে মানুষের কলরব শুনি। দুপাশে লম্বা বাঁশ বাঁধা। লাইন ধরে মানুষ এগোচ্ছে। আশপাশের ক্ষেতের ফসল মানছে না, দৌড়ে আসছে মানুষ। বাস থেকে মানুষ নামছে, রিকশাভ্যান থেকে নামছে। অটোটেম্পো মানুষ নামাচ্ছে, ভাড়া করা ট্রাকে মানুষ আসছে। সে হই হই কাণ্ড রই রই ব্যাপার। এ ঘটনায় পাল্টে গিয়েছিল অনেক কিছু। যাকে বলে রাতারাতি পাল্টে যাওয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি স্থানীয়দের যে ধারণা, মনোভাব চুলোয় গরমভাতের হাঁড়ির মুখে ফেনার মতো উতলাচ্ছিল তা হঠাত্ উবে যায়।
পেয়ে গেলাম স্বাধীনতা। যেন হঠাত্ বড় হয়ে গেলাম। দেশ পেলাম তবে ওই পারেই রয়ে গেল মামাবাড়ি। সেখানে যাওয়ার টান বদলায়নি। মামাবাড়ি গিয়ে কেমন ছাড়াছাড় লাগে। আগের মতো সিমো দেখি, ঘরে বেড়াই। দৌড়ে যাইি কলকাতায়, ঘুরেফিরে রাতে ফেরত আসি। অবসরে আমরা সবচেয়ে প্রিয় ছোটমামা আর বন্ধুদের সঙ্গে ঘোর আড্ডায় মেতে থাকি। সময় কাটে আনন্দেই, তবু একটা মন্দলাগা মনের মধ্যে খোঁচাতে থাকে।
কারণ খুঁজে পেলাম অনেক পর। বুদ্ধি, বয়স, সম্মান বেড়েছে একত্রে।
ভ্রমণ শব্দটা মাথায় এলে মনে ভোমরা গুনগুন করে কারণ ভোমরা দিয়ে মামাবাড়ি আসতার যেতাম। এখনও ভোমরা মনে এলে একশ রকম আনন্দের স্মৃতি ভ্রমণের উত্তেজনা কাগজিলেবুর মতো চনমনে খুশবু ছড়ায় মনে। মামাবড়ি যেতে হলে এখন কলকাতা উড়ে যাই। সময় বাঁচে। সুবিধাও অনেক। তবু কলকাতা নেমে মনে হয় এরপর যখন আসব ভোমরা দিয়ে আসলে কেমন হয়? ঢাকা থেকে উল্টো দীর্ঘ পথ তবু মনে গুনগুন করে মন ভোমরা। ইশারায় আমাকে ডাকে ও—এসো, এসো।