প্রতিবছর মাত্র একটা বড় সমস্যার সমাধান চাই

সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দিয়েই নানা রকম যন্ত্রণায় পড়তে হচ্ছে। সরু রাস্তা দখল করে হয় কেউ ইট-বালি ফেলে রেখেছে। অথবা রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। নয়তো কেউ রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে দিয়ে উধাও। কোনো রকমে মহল্লার গলি-ঘুপচি পেরিয়ে বড় রাস্তায় এলেন তো যন্ত্রণা আরো এক ডিগ্রি বেশি। হেঁটে যাবেন অসম্ভব। ফুটপাতে হাঁটার মতো একরত্তি জায়গাও নেই। গাড়ি চড়ে যাবেন, সেখানেও বিপত্তি। গণপরিবহনের গাড়িগুলো তো পাবলিককে গোনায়ই ধরে না। ওরা চলে ওদের মর্জিমাফিক। ইচ্ছা হলে যাবে, নয়তো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। নিজের গাড়ি নিয়ে বেরুবেন? সেখানেও নিস্তার নেই। যে রাস্তায় তিনটা গাড়ি চলার মতো জায়গা রয়েছে, সেই রাস্তায় ছয়টা গাড়ি ঢুকিয়ে দেবে। এরপর অবধারিতভাবে নিশ্চল পথচলা, ডেড-লক জ্যাম। মাঝে দুই ফুট জায়গা ফাঁকা রেখে দু’টি গাড়ি পাশাপাশি চলছে, এরই মধ্যে একটা অটোরিকশা কিংবা পিকআপ অথবা মিনি-মাইক্রোবাস ঢুকিয়ে দিয়ে পুরো চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে। একদিকে চলাচলের পথে ঠাণ্ডা মাথায় নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাবেন তারও উপায় নেই। হঠাত্ দেখবেন উলটো দিক থেকে প্যাঁ-পোঁ করতে করতে ডাণ্ডা-লাগানো গাড়ি কিংবা লক্কর-ঝক্কর মার্কা অ্যাম্বুল্যান্স (যার নিজেরই অপারেশন জরুরি!) ছুটে এসে সবাইকে একপাশে ঠেলে দিয়ে জ্যাম বাধিয়ে চলে যাচ্ছে। বিশেষ কয়েকটি এলাকা বাদে পুরো ঢাকায় রাস্তার দুইপাশে স্থায়ী পার্কিং-এর ব্যবস্থা করে ফেলেছে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল জনগণ। রাস্তায় নেমেই যদি স্থবির হয়ে যেতে হয় তাহলে আর সামনে এগোবো কীভাবে? এই অবস্থায় কোথায় যাবো? এত অনিয়ম কাঁহাতক সহ্য করা যায়? আমাদের অনেক সমস্যা। শুধু সমস্যাগুলোকেই একসঙ্গে করে বইয়ের মাপে ছাপালে কয়েক ফর্মা ছাড়িয়ে যাবে তার কলেবর। সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা যাবে না। তার চেষ্টা করাও বোধহয় উচিত নয়; কিন্তু আদতে তাই হচ্ছে। আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যও সীমিত। তাই একটা একটা করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। দশটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিবছর বাজেটের পঁচাত্তর শতাংশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে কোনো একটি সমস্যা সমাধানের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের বাজেট দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার অধিক। দেশব্যাপী শুধু পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট আর ফ্লাইওভার বানাতেই তো এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা লাগবে। কিংবা পর্যাপ্ত চাহিদার বিদ্যুত্ উত্পাদনেও মোট বাত্সরিক বাজেটের অধিক অর্থ প্রয়োজন। প্রথমত, অর্থাভাবে; দ্বিতীয়ত, সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাবে বড় সমস্যাগুলো আর শেষই হয় না। উদাহরণস্বরূপ যোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুত্, চিকিত্সাখাতের সমস্যাগুলোর কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। বর্তমানে হচ্ছেটা কী? একটা উদাহরণ দিই। ধরলাম বাজেট দুই লাখ কোটি টাকা। প্রধান দশটি বড় সমস্যা যার প্রতিটি সমাধানের জন্যই প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন। সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার দশটি বড় সমস্যা সমাধানের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র দশ শতাংশ করে বরাদ্দ দিতে পারছে। তার মানে হলো, নির্দিষ্ট সমস্যাটির দশ শতাংশ সমাধানের জন্য বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলো। অতঃপর সেই বরাদ্দ সচিবালয় ও অর্থমন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট বিভাগে যেতে যেতে কীভাবে কেমন করে যেন হয়ে যাচ্ছে নয় শতাংশ। তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে চার শতক ধরে উন্নয়ন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি আর দলীয় ঠিকাদারের চৌর্যবৃত্তি। যার কারণে সমস্যাযুক্ত কাজটির মোট উন্নয়ন বরাদ্দের পঞ্চাশ-ষাট শতাংশের বেশি কখনোই বাস্তবায়িত হয় না। ফলে এক কোটি টাকা বরাদ্দপ্রাপ্ত সমস্যাটির কাজ হয় মাত্র পঞ্চাশ লাখ টাকার। বাকি পঞ্চাশ লাখ লোপাট হয়ে যাচ্ছে। তার মানে হলো, যদিও বরাদ্দ পাওয়া গেলো দশ শতাংশ কিন্তু বাস্তবে সমস্যাটির মাত্র পাঁচ শতাংশ সমাধান হলো। আর ইতোমধ্যে কাজটি সম্পন্ন করতে যে সময় ব্যয় হলো, সেই সময়ের মধ্যে বাস্তবিক কারণেই একই ধরনের আরো দশ শতাংশ সমস্যা আগেরটির সঙ্গে যোগ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে, মোট বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলেও সমস্যাটির সমাধান তো হচ্ছেই না বরং একই সমস্যা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলছে যুগ যুগ ধরে। ৪২বছর কি যথেষ্ট সময় নয়? কিন্তু এভাবে আর কতদিন? অন্যভাবে চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ধরে নিলাম যোগাযোগ খাতই আমাদের মূল সমস্যা। এই বছর বাজেটের অর্ধেক বা পঁচাত্তর শতাংশ যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ দিয়ে যোগাযোগ বিষয়ক যাবতীয় সমস্যা আগামী পনেরো বছরের জন্য নির্মূল করা হোক। পরের বছর অন্য আরেকটা সমস্যা সমাধান করার জন্য একইভাবে বাজেটের বহুলাংশ বরাদ্দ করে সেটা নির্মূল করা হবে। আজকের বিশ্বশক্তি চীন কিন্তু আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে এভাবেই শুরু করেছিল। রাষ্ট্র পরিচালকদের বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো। ঢাকা