সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই হয়েছিল সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। দেশ তখনও ভাগ হয়নি। শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যেতে হোঁচট খাচ্ছে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলার এক বিরাট জনগোষ্ঠী। অনেক জল্পনা-কল্পনা ও বাধা-বিপত্তির পর প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উদ্দেশ্য এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়ানো আর জনগণকে অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে সাহায্য করা। শুরু হলো সামাজিক মুক্তির দীপ জ্বালানো। দেশে বিদেশে ছড়াতে থাকে নাম, যশ ও খ্যাতি। ১৯৪৮-এর দিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতনভাতা নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। ছাত্র-জনতাও শিখতে থাকলো সামাজিক ন্যায় ও সমতার আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা বাংলা সুপ্রতিষ্ঠিত হলো এদের হাত ধরেই। তারপর ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একাংশের প্রতিবাদে জেগে উঠলো পুরো জাতি। ১৯৬৯-এর আন্দোলন যে গণজোয়ারের রূপ নেয়, তা কেবল এই সূর্য তরুণদের নেতৃত্বে । ১৯৭১-এ হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর আত্মত্যাগ, শত বুদ্ধিজীবীর লেখনির শক্তি যোগ হয়েছে ৩০ লাখ শহিদের সারিতে, মিলেছে একটি দেশ, একটি পতাকা। অর্থনৈতিক, সামাজিক , সাংস্কৃতিক মুক্তির অঙ্গীকার নিয়ে জন্ম হলো বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের। এত সময় পেরোতেই আবারও যখন কালো থাবায় দেশ জর্জরিত এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডাক আসে সরাতে জঞ্জাল। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে একজন ডা. শামসুল আলম খান মিলন, ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল চলাকালে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দেওয়া একজন রাজু এখানেই জন্ম নেয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো বাতাসে তাঁরা শিখেছেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিতে। এখন ঢাবির পরিচয় মানবিক চেতনার দিক হতে। এখানকার টিএসসিভিত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলো কাজ করে যাচ্ছে মানবতার জন্য। ঐতিহ্য রোগাক্রান্ত কারো জন্য চাঁদা সংগ্রহের বা দেওয়ার, টিউশনের টাকা থেকে টাকা ভেঙে কারো জন্য রক্ত দিতে দূরের কোনো হাসপাতালে যাওয়ার, সহপাঠীর বাবা বা মাকে বাঁচাতে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করার, নাম পরিচয়হীন এক ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে রাস্তায় কনসার্টের আয়োজন করার। এমনকি যখন পহেলা বৈশাখে বা পহেলা ফাল্গুনে লাখো মানুষের ঢল জাগে ঐতিহ্য রক্ষার মঙ্গল শোভাযাত্রায় বা আনন্দ মিছিলে, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়ভাবে আশ্রয় দেয়, পরম মমতায় আতিথেয়তায় মগ্ন থাকে প্রতিটি প্রাণ। রামুতে সামপ্রদায়িক হামলা, সাতক্ষীরায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন হলে যখন প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, তখন বলার অপেক্ষা রাখে না সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কত অবদান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়