৭৫ বি ঘা জ মি

ইন্দিরা-মুজিব মৈত্রী চুক্তিতে দুই দেশের তিন ধরনের স্থল সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছিল। এগুলো হলো অনির্ধারিত সীমানার নির্ধারণ, ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি হস্তান্তর। কিন্তু ৪০ বছরে বিরোধপূর্ণ সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দুই দেশের অভ্যন্তরে থাকা ছিটমহলও বিনিময় হয়নি। আর অপদখলীয় জমি হস্তান্তর নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতিও ছিল না। এ অবস্থার মধ্যে হঠাত্ বাংলাদেশকে ৭৫ বিঘা অপদখলীয় জমি হস্তান্তর করেছে ভারত। দীর্ঘ ৬৬ বছর পর এই জমিটুকু ফেরত দিল তারা। চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার সীমান্তে ভারতের দখলে থাকা ৭৫ বিঘা জমি গত ২৯ জুন উদ্ধার করে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (বিজিবি)। চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লেফটেনেন্ট কর্নেল এসএম মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইছামতি নদীর পাশের এই জমি দখলমুক্ত করে সীমানায় বাংলাদেশের পতাকা স্থাপন করেন। জীবননগরের বেনীপুর বিওপির বিপরীতে ইছামতি নদীর পাশে মেইন পিলার ৬১/৩-এস থেকে ৬১/৯-এস পর্যন্ত বাংলাদেশের ৭৫ বিঘা জমি ১৯৪৯ সাল ভারতের দখলে ছিল। এই জমির বিষয়ে ভারত সরকার কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় বিজিবির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করে পতাকা লাগানো হয়। উদ্ধার করা জমির মধ্যে ৬৫ বিঘা খাস খতিয়ানভুক্ত এবং ১০ বিঘা ব্যক্তি মালিকানাধীন। নিয়ম অনুযায়ী সীমান্তের এই ৭৫ বিঘা জমি চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ ঘটনার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। জানা যায়, দেশ ভাগের আগে এই জমিতে হিন্দু সম্প্রদায় ও সাঁওতাল নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা বাস করত। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর ১৯৪৯ সালে তারা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই ওই জমিকে অপদখলীয় জমি দাবি করে দখলে রেখেছিল ভারত। গত বছরের ২৩ মার্চ বিএসএফ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ওই এই অপদখলীয় জমি উদ্ধারের চেষ্টা চালায় বিজিবি। চার মাস ধরে বিএসএফ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে জমি উদ্ধারের চেষ্টা চলে। শেষ পর্যন্ত বিজিবির চেষ্টা সফল হয়েছে। তবে বিজিবির হিসাব অনুযায়ী ওই এলাকার ১৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে ভারতের দখলে থাকা বাংলাদেশের জমির পরিমাণ ছিলো প্রায় ৫শ’ একর। এর মধ্যে ৪৪০ একর জমি উদ্ধার করা গেছে। বাকি জমি এখনো ভারতের দখলে রয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চার হাজার ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে এখনো বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। দুই দেশেরই অপদখলে রয়েছে কিছু জমিও। বিভিন্ন তথ্যে-উপাত্তে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তে হাজার হাজার বিঘা জমির মালিকানা অমীমাংসিত রয়েছে। এসব জমি কোথাও অব্যবহূত রয়েছে, আবার কোথাও ভারতীয়দের দখলে, আবার কোথাও আছে বাংলাদেশি নাগরিকদের দখলে। এসব সমস্যা নিরসনে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলেও তা কখনো কার্যকর হয়নি। ১৯৭৪-এর স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হবে এবং সেখানকার বাসিন্দারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়। এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ বেরুবাড়ি ছিটমহল হস্তান্তর করে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যেতে ভারত তিন বিঘা করিডোর ব্যবহারের সুবিধা দেয়ার অঙ্গীকার করে ভারত। কিন্তু এই করিডোর দিনে ১২ ঘণ্টা করে খোলা রাখার জন্য ভারত সময় নিয়েছে ২৭ বছর। একই অবস্থা অপদখলীয় জমি হস্তান্তরেও। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তির পর ২০১১ সালে এ সংক্রান্ত প্রটোকল সই হয়। এই প্রটোকল বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিগত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকার পার্লামেন্টে বিল তোলার উদ্যোগ নেয়। কয়েক দফা উদ্যোগের পর বিগত ভারত সরকার শেষ মুহূর্তে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিলটি উত্থাপন করে। বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকারের আমলে বিলটি পাস হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থলসীমান্ত চুক্তি ও প্রটোকলের আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট সাত হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময়ের কথা রয়েছে। ছিটমহল বিনিময় হলে লাভবান হবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অপদখলীয় জমি ফেরত পাবে বাংলাদেশ। প্রটোকল অনুযায়ী ভারতের দখলে থাকা বাংলাদেশের দাবি করা ৭৯৩ একর জমির মধ্যে ২৬৭ দশমিক ৫ একর জমি ফেরত দিতে যচ্ছে দেশটি। বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারত ফেরত পাচ্ছে আনুমানিক ২৬১ একর জমি। অপদখলীয় জমিগুলোর মধ্যে ৯টির অবস্থান পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে, ৩টির ত্রিপুরা সীমান্তে ও ১টির মেঘালয় সীমান্তে। আসাম সীমান্তের অমীমাংসিত অপদখলীয় ৪৮৫ একর জমি নিয়ে সমাধানে আসতে পারেনি দুই পক্ষ। তবে চেষ্টা চলছে।