পতাকা আমজাদ

বিশ্বকাপ নিয়ে পুরো বাঙালি জাতি যখন দুই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ভক্ত। শহুরে হাতেগোনা দু-একজনকে পাওয়া যায় পাওয়ার ফুটবলের রাজা জার্মানীকে সাপোর্ট দিতে। মফস্বলের চায়ের তর্কে যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা হারলে বা খারাপ খেললেও জার্মানী ভক্তদের কোন কিছু বলার সাহস জন্মে না, ঠিক তখন জার্মন ভক্ত হিসেবে বিশাল পোস্টার হিসেবে আবির্ভূত হলেন আমজাদ। কৃষ্ণবর্ণের এই আমজাদ হোসেনের পতাকার গল্প এখন বড় খবর। সেই খবর পৌঁছে গেছে ঢাকায় র্জামান দূতাবাসেও। ভারপ্রাপ্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত গত শনিবার সাড়ম্বরে আসেন তাঁর পতাকা দেখতে। সারা বাংলাদশে যখন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এই দুই শিবিরে বিভক্ত, তখন মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেনের জার্মানি প্রীতি কেবল ব্যতিক্রমই নয়, দলের প্রতি তার অকৃত্রিম অনুরাগ অবাক করে সবাইকে। ফাইনালে পৌঁছে যাওয়া জার্মানির ফুটবল দলের সমর্থনে আমজাদ তৈরি করেছেন প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ এক জার্মান পতাকা। আমজাদের কথায়, ‘জার্মানীর ওষুধ খেয়ে বেঁচে উঠেছি। যতদিন বেঁচে থাকবো, আমি এবং আমার পরিবার এই জার্মানকেই সমর্থন করে যাবো, জার্মানকেই ভালোবাসবো।’ আমজাদ হোসেন কখনও জার্মানি যাননি। তার কেউ জার্মানীতে থাকেন না। জার্মান ফুটবলের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেও তিনি এদের সমর্থক নন। এমনকি ফুটবল খেলা সম্পর্কে ঐ এক গোল আর পেনাল্টি কিক ছাড়াও কিছু বোঝেন না। ফুটবল বিশ্বকাপ সম্পর্কে পাড়া-মহল্লার মানুষরা তাকে আগ্রহী করে তোলে নিজের ওষুধের কথা মনে করিয়ে দিয়েই। পাশের বাড়ির এক পরিচিত লোকই তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যে জার্মান বিটি কোডের হোমিওপ্যাথি তিনি খেয়ে সুস্থ হয়েছেন ওরাই এবারে বিশ্বকাপ খেলেছে। মুলার, ক্লোসারা কি জানে নিজের দেশের হোমিও ওষুধের বদৌলতে বাংলাদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ের একজন তাদের ভক্ত হয়ে গেছে! তাই জার্মানির সঙ্গে একমাত্র যোগসূত্র হোমিওপ্যাথ। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলছিলেন, কিভাবে তিনি জার্মান ভক্ত হয়ে উঠলেন। আমজাদ বলেন, ‘‘২০০৫ সালে আমার শরীরে একটা ব্যাধি হয়। বাংলাদেশের কোনো ডাক্তারের চিকিত্সা তার পছন্দ হয়নি। রোগের উপশমেরও কোনো উন্নতি হয়নি। শেষে হোমিও চিকিত্সক তাকে জার্মানী হোমিও ওষুধ খেতে বলে। তাতেই রক্ষা। আর সেই থেকেই কৃতজ্ঞতার সূত্রপাত। জার্মান দূত ফার্দাদিন ফন ওয়েহে মাগুরা যান পতাকা নিজ দেশের পতাকা দেখতে। ২০০৬ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর তিনি খেলা দেখা শুরু করেন। এবং যেহেতু সেই দেশের ওষুধ খেয়ে তিনি সুস্থ হয়েছেন তাই পণ করেন তার প্রিয় সেই দেশ নিয়ে তিনি কিছু একটা করবেন। আমজাদ বলেন,‘২০০৬ সালে প্রথম পতাকা বানাই। কিন্তু জার্মানি সেবার সেমিফাইনালে ইতালির কাছে হেরে যায়। এরপর আর পতাকা তৈরি করতে পারি না।’ এরপর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপের আসর বসে। তখন আবারও জার্মান পতাকা বড় করতে থাকেন আমজাদ হোসেন। আবারও কাপড় কিনে তিনি পতাকা বানান। কিন্তু সেবারও সেমিফাইনালে স্পেনেরে কাছে জার্মানির হার। ব্রাজিল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর আবারও পতাকা তৈরি করতে থাকেন। আমজাদ আরো বলেন,‘ পুরো পতাকাটি মেলে ধরতে তিন-চারশ’ লোকের প্রয়োজন। তাদের খাওয়া দাওয়া অনেক খরচ। অনেক ঝামেলা। সেই অধ্যবসায়ের গল্পের সফল পরিণতি তার হয় ২০১৪ সালে। একই সাথে আমজাদের পতাকার সফল বাস্তবায়ন হয়। এবং জার্মান রাস্ট্রদূত তাকে দেখতে আসেন। নিজের জীবনের কৃতজ্ঞতায় এক পতাকার প্রতি যেন সমস্ত দায়মুক্তি হয় তার!