গোঁফ কাহিনী
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪১
গোঁফ। একগুচ্ছ লোমের সমাহার। কিন্তু এর মাহাত্ম্য অনেক। বাঘ-সিংহ-বিড়াল। এই তিন প্রাণীর গোঁফ বেশ দৃষ্টিনন্দন। বিড়ালের গোঁফ দেখেননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুধু দেখা নয়, শৈশবে অনেকে বিড়ালের গোঁফ ধরে টানাটানিও করেছেন। তবে সব বিড়ালের বড় গোঁফ হয় না। এজন্যই কথায় আছে, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায়। গোঁফকে অনেকে সাহসের প্রতীক মনে করেন। ..তা নিয়েই বিশেষ ফিচার। লিখেছেন আমিরুল মোমেনীন মানিক
গোঁফে সম্মান-গোঁফে গৌরব
গোঁফ। একগুচ্ছ লোমের সমাহার। কিন্তু এর মাহাত্ম্য অনেক। বাঘ-সিংহ-বিড়াল। এই তিন প্রাণীর গোঁফ বেশ দৃষ্টিনন্দন। বিড়ালের গোঁফ দেখেননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুধু দেখা নয়, শৈশবে অনেকে বিড়ালের গোঁফ ধরে টানাটানিও করেছেন। তবে সব বিড়ালের বড় গোঁফ হয় না। এজন্যই কথায় আছে, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায়। গোঁফকে অনেকে সাহসের প্রতীক মনে করেন। শোনা যায়, সিংহের মধ্যে যার গোঁফ যত বড় সে অন্যদের কাছ থেকে তত বেশি সম্মান পায়। গোঁফ নিয়ে বাংলাভাষায় বেশ কিছু প্রবাদ-প্রবচন-বাগধারা বেশ জনপ্রিয়। নিষ্ফল আশা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়—গাছে কাঠাল গোঁফে তেল। আর অলস ব্যক্তিকে বোঝাতে বলা হয় গোঁফ খেজুরে। এ সংক্রান্ত শব্দমালা পড়ে মনে হয় যত দোষ সব গোঁফের। তবে গোঁফকে সবসময় বীরত্বের প্রতীক হিসেবেই ধরা হয়।
গোঁফ নিয়ে বীরবলের রসিকতা
প্রিয় পাঠক, বীরবলের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। সম্রাট আকবরের রাজ্যসভার একজন উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। প্রজ্ঞা আর রসবোধের কারণে সেই সময়ে বিপুল পরিচিতি পান বীরবল।
একবারের ঘটনা। সম্রাট আকবর দরবারে বসে আছেন। খোশ গল্প চলছে। হঠাত্ সম্রাট আকবর সবাইকে প্রশ্ন করলেন, ‘কেউ যদি আমার গোঁফ ধরে টান দেয়, তাহলে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত?’ কেউ উত্তর দিল ‘বেত্রাঘাত’, কেউ বলল ‘ফাঁসিতে ঝুলানো উচিত’। সম্রাট আকবর বললেন, ‘বীরবল তোমার কী মতামত?’ বীরবল হেসে হেসে বললেন, ‘হুজুর, তাকে মিষ্টি খেতে দিন।’
সম্রাট ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘আমার সাথে ইয়ার্কি। যে লোক আমার গোঁফ টানবে, তাকে দেবো মিষ্টি খেতে!’
বীরবল উত্তরে বললেন, ‘হুজুর কথাটা আমি চিন্তা করেই বলেছি। এই পৃথিবীতে একমাত্র আপনার আদরের নাতি ছাড়া আর কেউ কি আপনার গোঁফ টানতে পারবে? জাহাপনা, আপনিই বলুন, গোঁফ টানার জন্য আপনার নাতিকে মৃত্যুদণ্ড না মিষ্টি দেবেন?’
এ কথা শুনে দরবারের সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন।
প্রিয় পাঠক, বিলিউড ফিল্ম ‘যোধা আকবর’-এর কল্যাণে নিশ্চয়ই জেনে গেছেন কেমন ছিল সম্রাট আকবরের গোঁফ। তিনি গোঁফের সৌন্দর্য ধরে রাখতে আলাদা নাপিতও রেখেছিলেন। এজন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ হতো মোটা অংকের টাকা।
গোঁফওয়ালা নারী
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তা মানুষের মধ্যে পুরুষকে দিয়েছেন ভিন্নধর্মী অনুষঙ্গ গোঁফ। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মে গোঁফ নিয়ে কোনো বিধান না থাকলেও ইসলামে গোঁফ ছোট করে রাখার বিধান আছে। টোস্টোরেন নামক হরমোনের কারণে পুরুষের গোঁফ হয়। ব্যতিক্রম হিসেবে কখনো কখনো নারীদেরও গোঁফ হতে দেখা যায়।
অনেক পুরুষের প্রিয় বিষয় গোঁফ হলেও গোঁফওয়ালা নারীদের কি তারা পছন্দ করবেন? নিশ্চয় না। আসলে সৃষ্টিকর্তা পুরুষের শরীরে অসাধারণ অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত করেছেন এই গোঁফ। নান্দনিক গোঁফে যে দৈহিক সৌন্দর্য বাড়ে এটা সবাই স্বীকার করবেন।
কিন্তু আমেরিকায় এক জরিপে দেখা গেছে, ষাট শতাংশ নারী পুরুষের গোঁফ রাখা অপছন্দ করেন।
তবুও বলব, পৃথিবীর সব গোঁফধারীরা ভালো থাকুন।
গোঁফওয়ালা মানুষেরা
গৌরবান্বিত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। তিনি বিশেষ ধরনের গোঁফ রাখতেন। বৈচিত্র্যময় গোঁফের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তিনি বিশেষ মর্যাদা পেতেন। একাত্তরে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে কিছুদিনের জন্য গোঁফ ছেটে ফেলেছিলেন ওসমানী। একবার এক সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন গোঁফের কথা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুব পছন্দের ছিল তাঁর কাঁচা-পাকা গোঁফ। সময় পেলেই যত্ন নিতেন গোঁফের। সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে জিয়াউর রহমান, কে এম শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফসহ প্রায় সবাই ছিলেন গোঁফধারী। এমন কি বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবাবী গোঁফ, এ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বীর টিপু সুলতানের লম্বা গোঁফ, বিপ্লবী তিতুমীরের সরু গোঁফও স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
শত্রুর কাছে নিজের বীরত্বকে সুদৃঢ় করতে আগের দিনে গোঁফ রাখার ট্র্যাডিশন চালু ছিল। এখন অবশ্য এই প্রবণতা খুব একটা নেই। অনেকে মনে করেন সেনাবাহিনীতে গোঁফ রাখার জন্য বিশেষ ভাতা দেওয়া হয়। আসলে তা ঠিক নয়। এটাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই গণ্য করা হয় সেনাবাহিনীতে।
বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার মরহুম ব্রিগেডিয়ার ফিরোজ সালাউদ্দিনের ছিল ইয়া লম্বা গোঁফ। জীবিতদের মধ্যে মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক গোঁফের কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর গোঁফ অনেকটা এম এ জে ওসমানী স্টাইলের। বাংলাদেশ আর্মিতে জেনারেল এম এ জে ওসমানীর পরে গোঁফ রেখে ব্যাপক আলোচিত হন মরহুম মেজর জেনারেল মতিউর রহমান বীরপ্রতীক। তিনি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের আপন বড় ভায়রা।
নিজের গোঁফ রাখা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে সহাস্যে স্মৃতিচারণ করেন সৈয়দ ইবরাহিম বীরপ্রতীক।
‘ছাত্রজীবনের ঘটনা। ১৯৬৬ সালের কথা। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন পাকিস্তান আর্মির অফিসার লে.কর্নেল নিয়াজ বিন হাসান। একদিন বক্তৃতায় তিনি ক্যাডেটদের বললেন, ব্যক্তিত্ব সম্প্রসারণ ও প্রতিষ্ঠিত করতে অনেকে অনেক কিছু করে। এর মধ্যে কেউ কেউ সুন্দর করে দাড়ি-গোঁফ রাখে। কেউ রাখে দাড়িসহ গোঁফ, আবার কেউ শুধু গোঁফ। তোমরাও কোনো একটি করতে পার।’
হিটলারী গোঁফ
অ্যাডলফ হিটলার। জার্মানের চ্যান্সেলর। একনায়কত্ব ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে তিনি বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও সমালোচিত। হিটলার বিশেষ ধরনের গোঁফ রাখতেন। নাকের নিচে যত্সামান্য অংশ জুড়ে ছিল এই গোঁফ। একবার তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আর্নেস্ট হানফস্টায়েঙ্গেল হিটলারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনার গোঁফটা কিন্তু দৃষ্টিনন্দন নয়।’ হিটলার উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, এটা এখন অনেকেই অপছন্দ করে। তবে, এমন একটা সময় আসবে যখন এটা এক ধরনের ফ্যাশন হয়ে যাবে।’
হলিউডের বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন হিটলারি গোঁফ রেখেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। হিটলারের হুবহু অনুকরণে চ্যাপলিনের গোঁফ একসময় অনেক পুরুষের ছিল প্রিয় ফ্যাশন। সত্তর ও আশির দশকের অনেক বাংলা ছবিতে ভিলেনরা রাখতেন হিটলারি গোঁফ।
জান দেবো তবু গোঁফ দেবো না
‘সুপারম্যান’ ছবিতে অভিনয় করে বিখ্যাত হন হলিউড তারকা জেন হ্যাকম্যান। অভিনয়ের আগে তার ছিল অনেক শখের একখানা গোঁফ। পরিচালক ডিক ডোনার, হ্যাকম্যানকে অনুরোধ করলেন গোঁফ কাটতে। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা, গোঁফ কাটবেন না। পরিচালক বললেন, ‘তুমি তোমার গোঁফটি কাটলে আমিও কেটে ফেলব আমার গোঁফ।’ কী আর করা! অবশেষে হ্যাকম্যান রাজি হলেন। গোঁফ কামিয়ে ফেললেন। পরিচালকও চট করে তুলে ফেললেন তার নকল গোঁফটি। এ ঘটনায় হ্যাকম্যানের হতভম্ব হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
আরেক জনের ঘটনা। নাম তার আফ্রিদি। তিনি পাকিস্তানের খ্যাতিমান ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদি নন। পেশোয়ারের বাসিন্দা । আলোচিত হয়েছেন ৩০ ইঞ্চি লম্বা গোঁফ রেখে। এই গোঁফের কারণে লস্কর-ই ইসলাম নামের একটি জঙ্গী সংগঠনের কর্মীরা তাকে মৃত্যুর হুমকি দিয়েছে।
কিন্তু আফ্রিদির সাফ কথা, জান যাবে তবু গোঁফ কামাবো না। গোঁফ রক্ষা করতে এখন তিনি পলাতক জীবন-যাপন করছেন। আফ্রিদি গোঁফের জন্য প্রতিদিন আধঘণ্টা সময় ব্যয় করেন।
কিন্তু গোঁফ নিয়ে কেন এই পাগলামি?
আফ্রিদির জবাব, ‘গোঁফের কারণে মানুষ আমাকে সম্মান করে। এটা আমার পরিচয়। লম্বা গোঁফের আছে বলেই পেশোয়ারের সবাই আমাকে বিশেষভাবে চেনে। এটা না থাকলে এত সম্মান ও মর্যাদা আমি পেতাম না। সুতরাং জান গেলেও আমি আমার গোঁফ ছাঁটব না।