ভোলাগঞ্জ মোর মন ভুলায় রে!

অভিভাবকদের ভয়ে কানে কানে ফিসফাস, ফেসবুকে চ্যাট, সেলফোনে এসএমএস আর দু-চারটে কথা—ভ্রমণে যাবার যাবতীয় আলোচনা। অতঃপর পবিত্র রজনী শবেবরাতের রাত শেষে ফজরের নামাজ পড়েই কাঁধে বোচকা ঝুলিয়ে ছুটে যাই সবার একত্রিত হওয়ার নির্ধারিত স্পট বাহাদুর শাহ্ পার্কের দিকে। মাইক্রো নিয়ে আগে থেকেই ওত্ পেতে থাকা মোস্তাককে সঙ্গী করে সোজা প্রকৃতির টানে সিলেটের পানে। পথ-ঘাট নিরিবিলি। দু-চারটি গাড়ি ভোঁ করে এসে শাঁ করে চলে যায়। আমাদের মাঝে নেই কোনো ক্লান্তি। কচি ভাইয়ের যতটুকু বিরক্তি ছিল আমার প্রতি, তাও আবার অন্য বন্ধুদের কারণে বেশিক্ষণ ধোপে টিকেনি। তীব্র গতিতে গাড়ি চলছে। গাজীপুরের কালিগঞ্জে এক ঝুপড়ি হোটেলের সামনে এসে ব্রেক। দলা পাকানো ময়দার রুটি আর লঙ্গরখানার ডাল দিয়ে নাস্তা করে আবারও ছুট। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের মূলমন্ত্র ‘যখন যেমন তখন তেমন’, তাই থাকা-খাওয়া নিয়ে রাগ কিংবা ন্যাকামি করার কোনো সুযোগ নেই। শুধু ফুড পয়জন বা পেট খারাপ না হলেই হলো। ভৈরবের পথে দু-পাশে দেখি কাঁঠাল, লটকনের হাট জমেছে। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক তেমন নেই। আশুগঞ্জের উজান-ভাটি রেস্টুরেন্টে এসে আবার ব্রেক। চা-কফির পর্ব সারা হলো। সাথে কিছুক্ষণ ফটোসেশন। সোনামাখা রোদ, নির্মল বাতাস আর গ্রাম বাংলার আবহমান রূপ দেখতে দেখতে সকাল এগারটার মধ্যেই পৌঁছে যাই পূণ্যভূমি সিলেট শহরে। চা-সিঙ্গারা খাওয়ার পাশাপাশি দু-একজন পরিচিত জনের সাথে প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিই। ভোলাগঞ্জে যাওয়ার পথে খাদিম নগর জাতীয় উদ্যানে কিছুটা সময় ঘুরে দেখা হলো, উদ্দেশ্য, হুট করে একদিন হয়তো এদিকটায় চলে আসব, সেই আশায় আগেই একটু ঢু মেরে যাওয়া। যতটুকু সময় নিয়ে দেখেছি, তাতে খাদিম নগর চা বাগান দেখতে লেগেছে অসাধারণ। সময়ের অভাবে বনের ভিতরটায় যাওয়া হয়নি। গাড়ি এবার ভোলাগঞ্জের পথে। চৌমুহনী মোড় থেকে পূর্ব পরিচিত সিলেটি তরুণ বোখায়েরকে তুলে নিলাম। বোখায়ের তার আলাপচারিতায় ঝিমিয়ে যাওয়া দে-ছুট বন্ধুদের মাঝে নতুন করে উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনল। সিলেট শহর থেকে চল্লিশ কি.মি. পথের বিশ কি.মি. যেতেই কাঁঠাল বাড়ি থেকে ভোলাগঞ্জবাসীর দুঃখ এবড়ো থেবড়ো কর্দমাক্ত পথের শুরু। কর্দমাক্ত পথের বিবরণ বাদ দিয়ে আর বাকি যা থাকে তা খুবই নজরকাড়া, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা চারপাশ। মায়াবি প্রকৃতি আপনাকে পথের ক্লান্তি আর প্রচণ্ড ঝাঁকুনি ভুলিয়ে দেবে নিঃসন্দেহে। গাড়ি এসে থামে ভোলাগঞ্জ নতুন বাজারে। অপেক্ষায় ছিল স্থানীয় তরুণ জাহাঙ্গীর, তার সৌজন্যে দ্রুত খানাপিনা সেরে ধলাই নদীর বুকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চেপে বসি। ভারতের সারি সারি মেঘালয় পাহাড়ের অনিন্দ্য সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের মায়াবী হাতছানি দেয়। পাথর শ্রমিকেরা ব্যস্ত নদীর তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলনে। কারো দিকে তাকাবার কোনো ফুরসত নেই তাদের। মজার বিষয় একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার পিছনে বেশ কয়েকটি নৌকা সারি করে বাঁধা থাকে, নদীতে চলমান অবস্থায় অসম্ভব সুন্দর লাগে দেখতে। প্রতিটি নৌকায় বোঝাই থাকে পাথরে। যেন পাথরেরই রাজ্য! আমাদের নৌকা গিয়ে ভিড়ে পাথর কোয়ারি বিজিবি ক্যাম্পের ঘাটে। ওয়াও! আল্লাহপাকের অপূর্ব নিদর্শনের দেখা মেলে এ পাশটায়। নিঃস্বার্থ প্রকৃতি সাধ্য অনুযায়ী তার সব সৌন্দর্য এখানটায় মেলে ধরেছে। এ দৃশ্যে অন্য রকম এক ভালোলাগা-ভালোবাসা মনে দোলা দেবেই। পাথুরে ধলাই নদীর শীতল জলে ডুব দিতেই দীর্ঘ পথের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায় নিমেষে। ডুব দিয়ে চোখ খুলে নিচের দিকে তাকালে-নদীর তলদেশের পাথরগুলো দেখতে অদ্ভুত লাগে। স্রোতস্বিনী ধলাই নদীতে জলকেলিতে মেতে আনন্দ উল্লাস আর প্রাণ খুলে হৈচৈ করে বুক ভরা বিশুদ্ধ বায়ু নিয়ে ফিরতি পথ ধরি। ভোলাগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ধলাই নদীর স্বচ্ছ টলটলে জল আমার ভ্রমণপিপাসু মন পাখিরে এখনও ভুলিয়ে রেখেছে। যোগাযোগ :দিনে রাতে ঢাকা থেকে সিলেটের পথে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫০০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত। শহরের আম্বরখানা হতে সিএনজি ভোলাগঞ্জ বাজারে যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১২০ টাকা। রিজার্ভ যাওয়া আসা ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। নদী ভ্রমণে নৌকায় ভাড়া নেবে প্রতি ঘণ্টা ৩০০ টাকা। সবচেয়ে সাশ্রয় হবে ঢাকা থেকে মাইক্রো নিয়ে গেলে। ছবি ইফতেখার