কৃষকের উপদেশ ও আত্মহত্যা

রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে যে কৃষক আমাদের জন্য খাদ্যশস্য উত্পাদন করেন, সেই শস্য বিক্রি করে তিনি আসল টাকাও ঘরে তুলতে পারেন না। এর চেয়ে দুঃখের আর কী আছে? অধিকাংশ কৃষক মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ—খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি অথবা পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাইয়ের আক্রমণে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আবার ফসল ঘরে তুললেও মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য কৃষক তাঁর পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান না। প্রতি বছর উত্পাদন খরচের চেয়ে কম দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করে কৃষক ঋণের জটিল জালে জড়িয়ে পড়ছেন। জীবনের এ জটিল জাল থেকে তিনি বের হয়ে আসতে পারছেন না। পারছেন না পরিবর্তন করতে তাঁর পেশা। মাটি তাঁকে টানে। পালাবার পথ নেই তাঁর। ভাষা নেই প্রতিবাদ করার। তাই তিনি বেছে নেন আত্মহননের মতো এক নিষ্ঠুর পথ। সম্প্রতি ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের এক কৃষক আত্মহত্যার কিছুক্ষণ আগে তাঁর স্কুলপড়ুয়া শিশুপুত্রকে বলে গেলেন, ‘কৃষক হয়ো না।’ কৃষক যা-ই কিছু উত্পাদন করেন তার জন্য লোকসান গোনেন এবং ভোগান্তির শিকার হন। শুধু ঋণ বাড়ে। এটা বাংলাদেশ ও ভারতসহ উপমহাদেশের সকল কৃষকেরই বাস্তবতা। তেলেঙ্গানার স্কুলশিক্ষক পুলিরাজু বলেন, ‘সন্তান কৃষক হোক কোনো বাবা মা-ই তা চান না। একজন শ্রমিকও তার তুলনায় বেশি আয় করেন। সেখানে কৃষক সবদিক বিবেচনায় শুধু ঋণগ্রস্ত হন। যদি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারত খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হবে।’ ভারতে ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে প্রায় ৯০ লাখ কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে ভারতে প্রায় তিন লাখ কৃষক ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন। বাংলাদেশেও কৃষক তাঁর উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বছর আলু উত্পাদন মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে দুই টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছেন। রাস্তায় আলু ঢেলে প্রতিবাদ করেছেন। রংপুরে গত বছর হরতাল ও অবরোধ চলাকালে দুধ উত্পাদনকারীরা রাস্তায় দুধ ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কৃষকের গোলায় যখন কৃষিপণ্য থাকে, তখন দাম থাকে না। কৃষিপণ্য যখন মহাজনের গুদামে ঢোকে তখনই দাম বেড়ে যায়। দুই টাকা কেজি দরের আলু এখন হিমাগার থেকে বের করে মহাজনরা বিক্রি করছে ২০ টাকা কেজিতে। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে গ্রামীণ কৃষির পাশাপাশি নগরীয় কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। নগরে নগরে কৃষিবাজার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৃষিপণ্যের জাতীয় মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে। ভারতের রাজধানীর মতো শপিং মলে সরাসরি কৃষক যাতে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে প্রয়োজনীয় কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কম হবে, কৃষক বেশি মূল্য পাবেন। আমরাও সারা বছর মৌসুমি ফলমূল ও শাকসবজির স্বাদ নিতে পারবো। বর্তমানে দেশের প্রায় পাঁচ কোটি লোক নগরে বসবাস করে। এই পাঁচ কোটি লোককে কৃষি কর্মকাণ্ডের বাইরে রেখে টেকসই কৃষিউন্নয়ন কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আগামী ২০২০ সালে শতকরা ৫০ ভাগ অর্থাত্ সাড়ে আট কোটি লোক নগরে বাস করবে এবং ২০৫০ সালে ১০০% অথাত্ ২৭ কোটি লোক নগরে বসবাস করবে। তখন গ্রাম ও নগর মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারখানা নির্মাণের কারণে প্রতিবছর শতকরা একভাগ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশও একটি খাদ্যঘাটতি অঞ্চলে পরিণত হবে, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হবে, কৃষক তার পেশা হারাবে, বহু লোক বেকার হবে। মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটবে। চালের ভোগ কমবে। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, ডিম-দুধের চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে। তাই মানুষের ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিটি নগর ও তার আশেপাশে নগর সরকারের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে পরিবেশবান্ধব নগরীয় কৃষিব্যবস্থা। শস্যহানির ক্ষতি থেকে কৃষকদের বাঁচানোর জন্য ভারত ও ফিলিপাইনের মতো চালু করতে হবে শস্য বীমা প্রকল্প। শস্য বীমার প্রিমিয়ামের টাকা সরকারকেই ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করতে হবে। দেশে আরো বেশি করে সরকারি খাদ্য গুদাম তৈরি করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান, গম ও ভুট্টা কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। কঠোর আইন প্রণয়ন করে কৃষিপণ্যের বাজার থেকে ফড়িয়া-দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্ছেদ করতে হবে। কৃষিঋণের সুদের হার কমাতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা যাতে সময়মতো কৃষিঋণ পান তার ব্যবস্থা করতে হবে। উত্পাদন মৌসুমের শুরু থেকেই আগাম কৃষিপণ্যের সরকারি মূল্য ঘোষণা করতে হবে। আখ, পাট, তুলা প্রভৃতি কৃষিপণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে তাঁর ন্যায্য মূল্য প্রদান করতে হবে। ময়মনসিংহ