নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই

নিম্নমানের কাগজে ছাপা হওয়ায় শিক্ষা বছরের ছয় মাস না যেতেই বেশিরভাগ পাঠ্যবই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের কাগজ নিয়ে এমন অভিযোগ শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের। আর এই অভিযোগের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতিও। তাদেরও দাবি—চলতি শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ব্যবহূত অধিকাংশ কাগজই ছিল নিম্নমানের। আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য যে বই ছাপা হচ্ছে সেখানেও নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করা হচ্ছে। কাগজের জিএসএম, ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর, ব্রাইটনেস কিছুই ঠিক নেই। বই প্রকাশে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। তাই এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে। এটাও মনে রাখা চাই যে বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে বলে ছাত্রছাত্রীদের হাতে যেনতেন কাগজের বই ধরিয়ে দেওয়া চলে না। আমরা জানি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই আর্থিক কারণে কিনতে পারতো না। শিক্ষার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটা ছিল অন্তরায়। এ সমস্যার সমাধান করেছে সরকার। এসব শিক্ষার্থীর হাতে কী মানের বই পৌঁছাচ্ছে সেটাও সরকারকেই দেখতে হবে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘১৫০ কোটি টাকার নিম্নমানের কাগজ কিনছে এনসিটিবি’। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বা এনসিটিবি ২০১৫ সালের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য দেড় শ কোটি টাকায় ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ হাজার টন কাগজ কিনছে। কিন্তু এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাগজ নিম্নমানের বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর শিক্ষামন্ত্রী কাগজের মান পরীক্ষার নির্দেশ দিলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। এ অভিযোগ গুরুতর বলেই আমরা মনে করি। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হোক, সেটা কাম্য নয়। সরকারের ভেতরে থেকে কেউ এমন কাজে যুক্ত থাকা গুরুতর অপরাধ বলেই আমরা মনে করি। এনসিটিবি চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, দরপত্রের নিয়ম মেনে কাগজ কেনা হচ্ছে এবং নিম্নমানের কাগজ তাদের চোখে ধরা পড়েনি। কিন্তু এমন অভিযোগ উঠেছে এবং তার দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার শাস্তি হতে হবে। কেউ ভুয়া অভিযোগ তুলে বই প্রকাশের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করলেও শাস্তি হওয়া উচিত। বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের মহতি আয়োজন কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অনৈতিক মুনাফার উত্স হতে পারে না। আমাদের দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চাহিদা মোতাবেক কাগজ প্রস্তুত করতে পারে। অথচ তাদের এই কাগজ সরবরাহের অর্ডার না দিয়ে অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাগজ কেনার পরিণতিতে মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মুদ্রণ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এনসিটিবির স্পেসিফিকেশনে যে চাহিদা দেওয়া হয়েছে তা শুধু তিনটি পেপার মিলের সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। অথচ সেসব প্রতিষ্ঠানকে খুব কম কাগজ সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাদের নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের জন্য জরিমানা করা হয়েছে তাদের গত বছরের চেয়ে তিনগুণ কাগজ সরবরাহের আদেশ দেওয়ায় বোঝা যায়, বইয়ের কাগজের মান কী হবে? অভিযোগ উঠেছে, এনসিটিবিতে যে কাগজ সরবরাহ করা হয়েছে তা মূলত নিউজপ্রিন্ট জাতীয় কাগজ। এনসিটিবির কারো কারো সঙ্গে নিম্নমানের কাগজ প্রস্তুতকারীদের গোপন সমঝোতার কারণে মানসম্মত কাগজ উত্পাদকদের উপেক্ষা করে মানহীন কাগজ উত্পাদনকারীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের জন্য যাদের জরিমানা করা হয়েছে, কোনো যুক্তিতেই তাদের কাছ থেকে আগের চেয়ে বেশি কাগজ কেনা যুক্তিযুক্ত নয়। নিম্নমানের কাগজ দিয়ে পাঠ্যবই ছাপানোর যে অভিযোগ করা হয়েছে সে বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত। এ অপকর্মে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ঢাকা