মনের রঙিন আকাশে...

জীবনের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত আমাদের ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলতে হয় সময়ের আগে। ইট-কাঠের এই বন্দী নগরে নেই প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়ার একটুখানি ফুরসত্। শত কাজের ব্যস্ততায় আমরা ভুলে যাই নিজের কথা, নিজের মনের কথা। দৈনন্দিন হাজারো ঝক্কি-ঝামেলায় কাঠখোট্টা হয়ে পড়ে আমাদের মন, ফলে পরোক্ষ কিন্তু আবশ্যিকভাবে এর প্রভাব পড়ে আমাদের নিত্যজীবনে। তিক্ত হয়ে ওঠে কর্ম ও পারিবারিক জীবন। তাই এবার আপনার মন ভালো করার নানা উপায় নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন নওশীন শর্মিলী সকালে ঘুম ভাঙতেই রাজ্যের কাজ এসে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁধে। আমাদের শহুরে জীবনটাই এমন। বাড়িতে নানা কাজের ঝক্কি সামলে যখন আপনি নামবেন রাজপথে অফিস যাত্রা করতে, তখন আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে রাস্তার বেধড়ক ট্রাফিক জ্যাম আর অস্বস্তিকর গরম। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে জলবায়ু যেমন চরম ভাবাপন্ন তেমনি আপনার মেজাজটাও কিন্তু একই রকম উত্তপ্ত। আর এই উত্তাপ অনেকটাই ক্রমবর্ধমান। অফিসে ঢুকেই বসের ঝাড়ি। এরপর অগোছালো কাজগুলোকে গোছাতে গোছাতেই ২-৪টা মিটিং এসে হাজির হবে। সব কাজ শেষে যখন আপনি একটু একটু করে অফিস থেকে বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করেছেন তখনই বস ডেকে পাঠাবে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য। ব্যস! আপনার মেজাজটা আর একবার খিচড়ে গেল। এরপর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পরে সংসারের সুখ-দুঃখের মাঝে গা ভাসানো কঠিন হয়ে পড়ে। অস্থির মনকে বশে আনার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় টিপস থাকছে আপনাদের জন্য। মাথা ঠাণ্ডা করে একটু স্মরণ করে এই টিপসগুলো মেনে চললে সহজেই আপনি জীবনটাকে আর একটু সহজভাবে গ্রহণ করতে পারবেন। সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই হুড়মুড়িয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না। নিজের জন্য একটু সময় বের করে নিন। অন্তত ১৫ মিনিট সময় রাখুন নিজের জন্য। এই সময়টাতে একটু শরীরচর্চা, যোগ আসন এসব করলে শরীরে প্রশান্তি আসবে। সমস্যার মোকাবেলা আরও সহজে করতে পারবেন। যদি শরীর চর্চায় খুব অনীহা থাকে তাহলে নিজের উপরে জোর খাটাতে যাবেন না। চেষ্টা করুন নিজের পছন্দের কোনো কাজ করতে। যেমন ধরুন ফুলের টবে পানি দেওয়া, বারান্দায় একটু হাঁটা, একটু সময় নিয়ে পত্রিকা পড়া কিংবা পছন্দের কোনো গান শোনা। এমন কিছু টুকটাক কাজে আপনার মন হালকা থাকবে। ঘরের কাজের সব দায়িত্ব নিজের হাতে নেবেন না। এতে অহেতুক চাপ বাড়বে পাশাপাশি কাজও অনেক এলোমেলো হয়ে যাবে। পরিবারের বাকি সদস্যদের মাঝে কাজগুলো ভাগ করে দিন। পুরুষরা অবশ্যই গৃহিণীর উপরে সব কাজের চাপ দেবেন না। আবার সব নিজে নিজেও করতে যাবেন না। পছন্দের কাজগুলো দুজন মিলে ভাগ করে নিন। আর গিন্নিরাও সব কাজ নিজে না করে চেষ্টা করুন স্বামীর সাথে কিছু কাজ ভাগ করে নিতে। নাস্তাটা আপনি তৈরি করতে ব্যস্ত থাকলে কর্তাকে বলুন ছেলেমেয়েদের স্কুলের জন্য তৈরি করে দিতে। ধরুন আজ অফিসে যাওয়ার আগ মুহূর্তেই কোনো কারণে মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে গেল। সে ক্ষেত্রে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতিটাকে একটু রাঙিয়ে তুলুন। নিজের ঘরে একটু সময় নিয়ে সেজেগুজে তৈরি হন মেয়েরা। পছন্দের কোনো শাড়ি কিংবা কামিজ পড়ুন। একটু সাজুন। আর গায়ে মেখে নিন নিজের সবচেয়ে পছন্দের পারফিউমটি। ছেলেদের ক্ষেত্রেও তাই। মুডে পরিবর্তন আনতে আজ একটু কালারফুল একটা টাই ট্রাই করে দেখুন। শু-টা হয়তো ২-৩ দিন কালি করা হয় না। আজ একটু কালি মাখিয়ে ঝকঝকে করে নিন। কচকচে ভাঁজ খোলা একটা শার্ট পড়ে রওনা দিন অফিসের দিকে। দেখবেন মুহূর্তে আপনার কালি মাখা মুডটা কেমন ঝকমক করে উঠে। অফিস থেকে যাত্রা পথে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে পছন্দের কোনো মিউজিক ট্রাই করতে পারেন। সঙ্গে চেষ্টা করুন পানির বোতল রাখতে। এক চুমুক খাবার পানিও কিন্তু অনেক সময় তেষ্টার সাথে সাথে মেজাজ ঠাণ্ডা করতেও সহায়ক হয়ে থাকে। অফিস থেকে বের হওয়ার শেষ সময়টাতেও মেজাজ গরম হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে চেষ্টা করুন অফিস থেকে সোজা বাড়ি না গিয়ে একটু শপিংয়ে বেরুতে। আর কারও জন্য নয়, কেবল নিজের জন্য কিছু শপিং করুন বাড়ি ফিরবার সময়। দেখবেন মেজাজটা একেবারে চনমনে হয়ে যাবে। হূদয় ভেঙে গেলে মন ভেঙে যায়, তাহলে আর বেঁচে কী লাভ! কিন্তু ডাক্তাররা এ রোমান্টিকতার ঘোর বিরোধী। বিশেষ করে হার্টের ডাক্তাররা। কারণ তাদের মতে, হূদয় যদি আক্রান্ত হয় মানে হার্ট অ্যাটাক হলে মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কঠিন এবং তাকে অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। এ কারণে হার্টের ডাক্তাররা বলেন, কেউ যদি মনে কষ্ট পুষে রাখে এবং চিন্তায় পড়ে যান তাহলে তার হার্টের সমস্যা হতে পারে। এর জন্য অবশ্য উদ্বিগ্ন আর অহেতুক টেনশন দূর করার চিকিত্সা করা জরুরি। মানে মনকে ভালো রাখতে হবে আর কি। কয়েকটি সহজ এক্সারসাইজ রিল্যাক্স করবার জন্যে বিভিন্ন ধরনের এক্সারসাইজ করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন আপনি তা উপভোগ করেন, না হলে এক্সারসাইজ করাটাই একটা কাজ মনে হবে। তাই যোগব্যায়াম করতে পারেন। আর ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ তো আছেই। এ ক্সা র সা ই জ ১ সোজা হয়ে দাঁড়ান। ফুটবল খেলার মতো ডান পা ১০ বার সামনের দিকে আর ১০ বার পেছনের দিকে কিক করুন। এরপর বাঁ পা দিয়ে একইভাবে এক্সারসাইজ করুন। এ ক্সা র সা ই জ ২ মাথার পেছনে হাত রাখুন। এবার ১০ বার টুইস্ট করুন। একটু বিশ্রাম নিয়ে এক্সারসাইজটি আরও ২ বার করুন। এ ক্সা র সা ই জ ৩ সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন। এবার বাঁ হাঁটু ভাঁজ করে, ডান পা বাঁ হাঁটুর ওপরে তোলার চেষ্টা করুন। হাত একদম সোজা রাখবেন। খেয়াল রাখবেন মাথা যেন মাটি ছুঁয়ে থাকে। কিছুক্ষণ এই অবস্থায় থেকে অন্য পায়ে একই এক্সারসাইজ রিপিট করুন। কী কী করবেন  প্রতিদিন অন্তত ৮ গ্লাস পানি পান করুন।  প্রচুর সবুজ শাকসবজি ও ফল খান।  যখন তখন না খেলেই ভালো।  ভাজাভুজি যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলুন।  রাতের খাওয়া ও সকালের খাওয়া তাড়াতাড়ি খান।  যে ধরনের ব্যায়াম ভালো লাগে সেই ব্যায়াম করুন।  ছিপছিপে থাকার জন্য না খেয়ে না থেকে সঠিক ডায়েট বেছে নিন।  অযথা টেনশন বা দুশ্চিন্তা করবেন না।  মেডিটেশনের বা নামাজের অভ্যাস গড়ে তুলুন।  প্রাণখুলে হাসার চেষ্টা করুন সবসময়।  লবণ, তেল জাতীয় খাবার যতটা সম্ভব কম খান।  চা, কফির পরিমাণ কমিয়ে দিন।  কৃত্রিম রং ও গন্ধ দেওয়া খাবার না খাওয়াই ভালো। নিজের মনের প্রতি খেয়াল রেখে আমরা সবাই যদি একটু সচেতন থাকি শরীর মহাশয়কে খুশি রাখার জন্য, তবে যেকোনো কাজে পেতে পারি অসীম অনুপ্রেরণা। আপনি জানেন আপনি পারবেন, আপনার মানসিক শক্তিই আপনাকে পৌঁছে দিবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।