নৌদুর্ঘটনা যেন যাত্রীদের নিয়তি
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৭
সমপ্রতি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা নদীতে দু শতাধিক যাত্রী নিয়ে পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ ডুবে যায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মাওয়া ও কাওড়াকান্দি ঘাটে ভিড় করে যাত্রীদের স্বজনেরা। তাদের কান্নায় পদ্মা তীরে এক হূদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এখনও অনেক স্বজন পায়নি তাদের প্রিয়জনের লাশ। বাংলাদেশে লঞ্চ দুর্ঘটনা কোনো নতুন বিষয় নয়। এটা যেন নৌযাত্রীদের নিয়তি। অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনাই নৌদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ—এই অভিযোগ করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দোষী মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দাবি করেছে উপকূলীয় ১৬টি সংগঠন। গত ৭ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনাই নৌদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ:নৌযানের নকশা অনুমোদন এবং তদারকি ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব দাবি জানান। তাঁদের মতে, পিনাক-৬ ডুবে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার এক করুণ পরিণতি। পিনাক-৬ লঞ্চের চলাচল অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই এবং যান্ত্রিক ধারণ ক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৫ জন। অথচ কী সাহস! বহন করছিল দু শতাধিক যাত্রী। পদ্মায় ২ নম্বর সংকেত দেখানো অবস্থায় ৬৫ ফুট কম দৈর্ঘ্যের লঞ্চ চলাচল নিষিদ্ধ । কিন্তু পিনাকের দৈর্ঘ্য ছিল ৫২ ফুট। অর্থাত্ পিনাক-৬-এর চলাচল, ডুবে যাওয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, নৌপরিবহন ব্যবস্থাটা আসলে সেখানে ছিল সম্পূর্ণ অকার্যকর।
প্রত্যেকটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মনে হয়, তদন্ত কমিটি গঠন করেই কর্তৃপক্ষ তাঁর দায়িত্ব শেষ করতে চান। ১৯৯৪ সাল থেকে গত ২০ বছরে ছোট-বড় মিলে প্রায় ৬৫০টি নৌদুর্ঘটনায় পাঁচ হাজারের বেশি যাত্রী নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছে এক হাজারেরও বেশি মানুষ। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও আলোর মুখ দেখেছে মাত্র তিনটি প্রতিবেদন। অনেক তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমাও দেয়নি। দুর্ঘটনার তদন্তে প্রায়ই উঠে আসে মালিক-চালক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতির কথা। কিন্তু মামলা হলেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বললেই চলে। নৌ-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে নৌপথে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এবং ঈদের সময় প্রায় প্রতি বছরই এ ধরনের বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনা নৌপথের যাত্রী নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নৌপথ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নৌ, সড়ক ও রেলখাত রক্ষা জাতীয় কমিটি বলছে, বাংলাদেশে নৌপথে দুর্ঘটনার জন্য, বিশেষ করে লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত ১০টি কারণ দায়ী। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে নৌযানের ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়ন, অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস প্রদান, অদক্ষ মাস্টার ও চালক নিয়োগ, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাই, অবৈধ নৌযান চলাচল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, নৌপথে বিকল দিক নির্দেশক ও বয়াবাতি না থাকা, নাব্য সংকট ও ডুবোচর, নৌপথে কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখা এবং আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই সংগঠনের মতে, যতোদিন এ সমস্যাগুলোর প্রতিকার করা যাবে না, ততোদিন নৌদুর্ঘটনায় আরো অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাবে।
দুর্ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে। লঞ্চ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বিআইডাব্লিউটিএ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত আধুনিক নিরাপদ নৌযান বৃদ্ধি করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং লঞ্চচালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
ময়মনসিংহ