স্মৃতিকথা
তিন টুকরো ভূত
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২০:১২
তখন ক্লাস টেনে। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের ওড়াউড়ি। পাখির মতো উড়তে চাই দূরে বহুদূরে। কিন্তু উড়তে চাইলে তো হবে না। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। পড়ার চাপ, বাবার শাসন। আর একটু ফাঁক পেলেই হাওয়া। আমাদের গ্রামে তখনো বিদ্যুত্ আসেনি। হারিকেন সম্বল। একটু বড় হওয়ার পর আলাদা এক রুম আমার জন্য বরাদ্দ। রাত জেগে পরীক্ষার পড়া পড়ছি। চারদিক নিশ্চুপ। ঘোর নীরবতা ছুঁয়ে আছে সবখানে। গাছের পাতা পড়ার শব্দটাও একেবারে স্পষ্ট। পড়তে-পড়তে মাঝরাত পেরিয়ে গেছে একটু আগে। বাড়ির অন্যরা ঘুমে বিভোর। দরোজা পেরিয়ে বাড়ির সামনের খোলা মাঠটায় এসে দাঁড়িয়েছি।
কিছুটা দূরে একটা ঝাকড়া বটগাছ। তার মাথায় আলো জ্বলছে। চকচকে উজ্জ্বল আলো। ভাবলাম চাঁদটা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু না চাঁদ আছে অন্যদিকে। চাঁদটাকেও দেখলাম পাশ ফিরে। আলোটা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। আমার চোখ ঝলসে যাচ্ছে। একটা সময় পুরো বট গাছটা আলোকিত হয়ে গেল। এটা কি ভুল দেখছি! বুকটা তিরতির করে কাঁপছে। ছমছম করছে মনের মধ্যে খুব। ধুকধুকটা চলছে জোরে জোরে। বট গাছের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ভয় পেয়ে এক দৌড়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিজের রুমে এসে অনেক গরমের মধ্যে জানালা-দরোজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছিলাম। বট গাছের সেই আলো আমাকে নির্ঘুম রেখেছিল, সূর্যের আলো এসে ছুঁয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। সেটা কী ছিল এখন আমার জানা নেই। ভূত নাকি বিভ্রম। না অন্যকিছু। এক জীবনেও হয়তো আর জানা হবে না।
অন্য আরেক দিনের ঘটনা। আমার রুমটা রাস্তার ধারে। প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে হাট বসে। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন হাটে ব্যবসা করতে আসে। কাঁকনহাট বিখ্যাত হাট হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে। একটা সময় মেয়েদের চুড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল হাটটি। চুড়ি থেকে কাঁকনহাটের নামকরণ। মাঝরাত পেরিয়ে একই রকম পায়ের আওয়াজ পাই প্রতি বুধবার। প্রথমে ভাবলাম কোনো মানুষ হয়তো হাটে ব্যবসা করতে আসছে। জানালায় চোখ রাখি। চমকে উঠি। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। সাদা আলখেল্লা পরা একটা মানুষ হেঁটে যাচ্ছে কিন্তু সে কিছুতেই এগোতে পারছে না। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখি যে আলখেল্লা পরা লোকটা এক জায়গাতেই হাঁটছে। তার মুখটা কিছুতেই দেখতে পাচ্ছি না। অনেক চেষ্টা করছি জানালা দিয়ে দেখার কিছুতেই দেখতে পাচ্ছি না। জানালা ছেড়ে সাহস নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম আলখেল্লা পড়া লোকটা হাঁটছে। সাদা চুল, মুখটা কিছুতেই দেখতে পাচ্ছি না। সামনে যেতেই একটু এগিয়ে গেল সেই সাদা আলখেল্লার মানুষটা। সামনে যাচ্ছি আলখেল্লাও এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। এইভাবে বাসা থেকে আধামাইল দূরে চলে এসেছি। সামনে কবরস্থান। ভয়ে এক দৌড়ে পেছনে ফিরে নিজের রুমে। এরপর অনেকদিন এমন পায়ের আওয়াজ শুনেছি বাড়ির সামনের রাস্তায়। এটারও কোনো কারণ জানা হয়নি ।
নানাবাড়ি পাঁচ গাছিয়া আমাদের গ্রাম কাঁকনহাট থেকে মাইল দুয়েক দূরত্বে। তখনো পাকা সড়কটা তৈরি হয়নি। যাওয়ার একমাত্র রাস্তা জমির মাঝখান দিয়ে মানে জমির আইল ধরে। হঠাত্ কী এক প্রয়োজনে রাতের বেলা যাচ্ছি নানাবাড়ি। হেঁটে যেতে ঘণ্টা খানেক লাগে। রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা আম বাগান পার হয়ে তারপর জমির আইল ধরে যেতে হয় নানাবাড়ি। আম বাগান পার হচ্ছি কেমন ভয় ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে কে এসে সামনে দাঁড়াচ্ছে, গাছের ছায়াকে কেমন মানুষ মানুষ ভেবে ভয় পাচ্ছি। হঠাত্ একটা কালো বিড়াল সামনে দিয়ে চলে গেল। আমি ভয়ে দৌড়াচ্ছি। পেছন ঘুরে দেখি কালো বিড়ালটা সাদা হয়ে গেছে। ভয় আর কাকে বলে প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি। কতদূর দৌড়েছি মনে নেই। একটা সময় মনে হলো অনেকক্ষণ হয়ে হয়ে গেছে কিন্তু রাস্তা শেষ হয় না কেন। সব ঠিক আছে তো? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম। তখন মুঠোফোন ছিল না। কয়টা বাজে বুঝতে পারছি না। একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা বট গাছের নিচে। উপরে তাকাতেই দেখি একজোড়া কালো আর সাদা বিড়াল গাছের ডালে বসে আছে। দেখে ভয়ে প্রাণপণে দৌড়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে একটা বাসায় গিয়ে দরোজা নক করলাম। তারা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বের হয়ে এলেন। আমার সব কথা শুনে বাবার পরিচয় জেনে আমাকে আশ্রয় দিলেন। আমি ছয় মাইল দূরের গ্রামে চলে গিয়েছিলাম। যেখানে নানা বাড়ি মাত্র দুই মাইলের পথ। পরের দিন সকালে যখন বাসায় ফিরে বিস্তারিত বললাম। সবাই বলল, ভোলাতে ধরেছিল। সেই নাকি আমাকে রাস্তা ভুল করে নিয়ে গেছে। এটার কী যুক্তি আছে জানি না। ভোলা, ভূত, জিন নাকি অন্য কিছু। হয়তো কিছু একটা ছিল। এই হলো আমার জীবনের সত্য তিন টুকরো ভূতের কথা।