ভিমরুলির ভাসমান বাজারে
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৪৫
সদরঘাটে কোনোরকম যানজট ছাড়াই সোজা গিয়ে উঠে পড়লাম প্যাডেল স্টিমার মাসহুদে। দেশে যে কটি প্যাডেল স্টিমার অবশিষ্ট আছে মাসহুদ তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। আমরা যাচ্ছি ভিমরুলির ভাসমান বাজার দেখতে। আমি, নোমানী ভাই, বিটু ভাই, জিলাল ভাই ছাড়াও এবারের ভ্রমণে আমাদের সঙ্গী হয়েছেন কাফি ভাই, রিফাত ভাই আর ফাহিদ। বহু কষ্টে মাসহুদের তিনটি প্রথম শ্রেণীর কেবিন পেয়েছি। অনেক পুুরোনো স্টিমার। কিন্তু খুবই সাজানো গোছানো পরিপাটি কেবিন। চারপাশে অনেক খোলামেলা। যথা সময়েই স্টিমার ছাড়ল সদরঘাট থেকে। সূর্য তখন কেবল ডুবতে শুরু করেছে। বুড়িগঙ্গা সেতু পর্যন্ত উল্টো চলে ঘুরানো হলো স্টিমার। ছাদে উঠে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। আরও দেখলাম বুড়িগঙ্গায় পাল তোলা নৌকা। ঘুরানো শেষে ঢিমেতালে চলতে শুরু করল মাসহুদ। মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম আস্তে চালানোর কারণ। চাঁদপুরে রাত সাড়ে এগারোটায় চট্টগ্রাম থেকে আসা ট্রেনের যাত্রীরা এ স্টিমারের যাত্রী হবেন। তাই গতি কমিয়ে চলা। ঘটনাক্রমে রাতটি ছিল পূর্ণিমার। চাঁদের আলোয় ঝলমলে করছিল মেঘনা। বড় বড় ঢেউ থাকলেও আমাদের স্টিমারের কাছে সেটা ছিল নগণ্য। স্টিমারের সামনে বিশাল জায়গায় আসন পাতা। সবাই বসে জম্পেস আড্ডা আর পূর্ণিমা রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। এরই মধ্যে রাতের খাবারের ডাক পড়ল। প্যাডেল স্টিমারে এখনও চালু আছে প্যাকেজ খাবারের ব্যবস্থা। সে রাতে ছিল মুরগির মাংস কিংবা ফাইসা মাছের প্যাকেজ। ২০০ টাকায় মাছ কিংবা মাংস দিয়ে পেট ঠিকা খাবার। সঙ্গে আছে ভর্তা, ডাল। আমরা প্যাকেজের বাইরে ডিমওয়ালা একটি ইলিশেরও অর্ডার করলাম।
খুব সকালে স্টিমার এসে থামল বরিশাল। ঘাটে এসে দেখি সঞ্জীব দার পাঠানো ঘোল আর রসগোল্লা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। সঞ্জীবদার কথা একটু না বললেই নয়। তিনি হলেন বরিশালের মা গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী। এ পথে এলে তার মিষ্টির স্বাদ না নিলে অপূর্ণতা থেকে যায়। সময়টা যখনই হোক না কেন, সঞ্জীবদার না নেই। চাহিদা মতো প্যাকেট ভরে লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেন জায়গা মতো। সকাল বেলা সঞ্জীবদার পাঠানো ঘোল আর মিষ্টি খেয়ে সবাই অভিভূত। বিশ মিনিট বিরতি দিয়ে বরিশাল স্টেশন ছাড়ল মাসহুদ। কীর্তনখোলার সৌন্দর্য উপভোগ করে ব্যাগ গোছাতে গেলাম। সামনের স্টেশনই ঝালকাঠী। আমাদের শেষ গন্তব্য। সকাল আটটা নাগাদ স্টিমার নোঙ্গর ফেলল ঝালকাঠী স্টেশনে। আমরা নেমে গেলাম। নোমানী ভাই স্টিমারের ছবি তোলার জন্য স্টেশনে কিছুটা সময় অপেক্ষা করলেন। কামরুল ভাই ফোন করলেন দেশি ভোজ রেস্তোরাঁয় চলে আসার জন্য। সেখানে সকালের খাবারটা সেরে আমরা ছুটব ভিমরুলির উদ্দেশ্যে। ঝালকাঠীতে গেলে আমরা সবসময় কাছে পাই দুইজন মানুষকে। কামরুল ভাই আর হেলাল ভাই। কামরুল ভাই পেশায় শিক্ষক, হেলাল ভাই ব্লগার, খেলাধুলাও করেন খুব। দুজনই ছবি তোলেন। সময় পেলেই ক্যামেরা নিয়ে ছোটেন এদিক সেদিক। এছাড়াও এ তালিকায় নতুন যোগ হয়েছেন নাদিরা। ঝালকাঠীর নারী সংগঠক। ছোট দুই ভাই এবং এক বোনকে নিয়ে তিনিও যোগ দিয়েছেন আমাদের এ ভ্রমণে।
সকালের খাবার সেরে আমরা এলাম পালবাড়ী ঘাটে। সেখানে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য কামরুল ভাইয়ের ভাড়া করা ইঞ্জিন নৌকা। দলে আমরা তের জন, বেশ ছোট নৌকা। ভেতরে ঢুকে দেখি হেলাল ভাই, জিলাল ভাই সোজা হয়ে বসতে পারছিলেন না। গলা বাঁকা করেই বসতে হলো তাদের। তবে নৌকা ছাড়ার পর কেউ আর ভেতরে থাকলেন না। সামনে আর ছাউনীর উপরে উঠে পড়লেন। বেশ দুলছিল নৌকাটি। সবাইকে নড়াচড়া না করেই বসে থাকতে বললেন নৌকার চালক। বাসন্ডা খাল ধরে আমরা চলতে থাকলাম ভিমরুলির উদ্দেশ্যে। বাসন্ডা খাল ধরে ঘণ্টা খানেক চলার পর বাউকাঠী বাজার। সেখান থেকে হাতের বাঁ দিকে সরু একটি খালে ঢুকল নৌকা। অসম্ভব সুন্দর ছোট খাল। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খালের ওপরে একটু পরপরই সাঁকো আর কালভার্ট। সেগুলো এতই নিচু যে শুয়ে পড়েও শরীরে লেগে যাওয়া উপক্রম। ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে খালের চিত্র। ছোট ছোট নৌকা বোঝাই পেয়ারা, সবজি কিংবা চারা গাছ নিয়ে বাজারে যাচ্ছিলেন বিক্রেতারা।
বেলা এগারোটা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছলাম ভিমরুলি বাজারে। বাজার তখনো জমে উঠেনি। কিছু কিছু নৌকা এসে পৌঁছেছে কেবল। বাজারের অবস্থা দেখে জিলাল ভাইয়ের মন খারাপ হলো। তবে তাকে একজন আশ্বস্ত করে বললেন একটু পরেই বাজার জমবে। ভিমরুলির ছোট খালটির চিত্র একেবারেই পাল্টে গেল কিছুক্ষণ পর। পেয়ারা বোঝাই ছোট ছোট নৌকা লিক লিক করছে খালজুড়ে। বড় নৌকা নিয়ে পাইকাররা এসেছেন পেয়ারা কিনতে। সে নৌকা ঘিরে রেখেছে বিক্রেতারা। বিক্রি হয়ে যাওয়া নৌকাগুলো থেকে পেয়ারা তোলা হচ্ছে বড় নৌকায়। এরই মধ্যে চোখে পড়ল একদল বিদেশি একটি নৌকায় চড়ে বাজার দেখতে এসেছেন। বাজারের ছবি তোলা শেষ। এতক্ষণে ভাঙতেও শুরু করেছে বাজার। দুপুরের খাবার হতে আরও বাকি ঘণ্টা খানেক। ছোট একটি নৌকা নিয়ে তাই বেরিয়ে পড়লাম পেয়ারা বাগানের উদ্দেশ্যে। এ অঞ্চলের পুরোটাই পেয়ারা বাগান। একজন জানালেন পাশাপাশি পঞ্চাশেরও বেশি গ্রামে পেয়ারার চাষ হয়। ছোট ছোট নালার দুই পাশে পেয়ারার বাগান। বাগান ঘুরে ফিরে এলাম বাজারে। সবাই মিলে খেতে গেলাম জনি রেস্তোরাঁয়। আমাদের জন্য আগে থেকেই সব প্রস্তুত করে রাখা। অসাধারণ রান্না, চেটে পুটে খেলাম সবাই। খাওয়া শেষে সঞ্জীব দার দোকানের বেঁচে যাওয়া রসগোল্লাগুলোও খেলাম ডেজার্ট হিসেবে। ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। সবাই উঠে বসলাম নৌকায়। ফিরতি পথেও ছোট ছোট খালের দুইপাশের ছবির মতো দৃশ্য দেখতে দেখতে চললাম।
কীভাবে যাবেন
ভিমরুলির ভাসমান বাজার ভ্রমণে যাওয়ার জন্য সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা হলে ঢাকা থেকে প্রথমে লঞ্চ কিংবা বাসে আসতে হবে ঝালকাঠী। ঢাকার গাবতলী থেকে সাকুরা, সুরভী, দ্রুতি, হানিফ ও শ্যামলী পরিবহনের বাস যায় ঝালকাঠী সদরে। ভাড়া ৪৫০-৫০০ টাকা। এছাড়া সায়দাবাদ থেকে সুগন্ধা ও ফাল্গুনী পরিবহনের বাসও যায় জেলাটিতে। ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকা। এছাড়া ঢাকার সদরঘাট থেকে টিপু (০১৭২১৯৭৮৬৫২) ও সুন্দরবন-২ (০১৭১২৮১১০৯২) লঞ্চও যায় ঝালকাঠী। এ পথে ডেকে ভাড়া ২৫০ টাকা এবং প্রথম শ্রেণীর একক কেবিনের ভাড়া ৮০০ টাকা, দ্বেত কেবিনের ভাড়া ১৫০০ টাকা। তবে এ ভ্রমণটি পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে যেতে হবে বিআইডব্লিউটিসির স্টিমারে চড়ে। এ পথে কয়েকটি প্যাডেল স্টিমার চলাচল করে। সবচেয়ে ভালো পিএস মাসহুদ, অস্ট্রিচ ও লেপচা। ঢাকার দিলকুশায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে স্টিমারের প্রথম শ্রেণীর টিকেট পাওয়া যায়। এছাড়া বাদামতলীতে বিআইডব্লিউটিসির কার্যালয়ে পাওয়া যাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকেট এবং ঘাটে পাওয়া যাবে তৃতীয় শ্রেণীর টিকেট। ভাড়া প্রথম শ্রেণীর কেবিন জনপ্রতি ১২৫০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর কেবিন ৭৬০ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণীর ডেক ১৯০ টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়ার সঙ্গে ১৫% ভ্যাট যুক্ত হবে।
কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে রাতের লঞ্চে গিয়ে সারা দিন বেড়ানো শেষে আবার রাতের লঞ্চেই ফেরত আসতে পারেন। বাড়তি সময় থাকতে চাইলে ঝালকাঠী জেলা শহরে থাকতে পারেন। এ শহরে থাকার জন্য সাধারণ মানের হোটেল হলো কালিবাড়ি রোডে ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউস, সদর রোড চৌমাথায় হালিমা বোডিং, বাতাসা পট্টিতে আরাফাত বোডিং। এসব হোটেলে ৮০-২০০ টাকায় কক্ষ আছে। ঝালকাঠী শহরে খাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের রেস্তোরাঁ হলো রোনালস রোড, ফায়ার সার্ভিসের মোড়ে দেশি ভোজ। এছাড়া ঝালকাঠী শহরে পাবেন ভালো মানের মিষ্টান্ন।