টিনএজারদের নিয়ন্ত্রণে
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৪৫
সবকিছুতেই বাধা, খালি খবরদারি কারই বা ভালো লাগে। তার উপর যদি বয়সটা হয় ১৫-১৬, তাহলে তো কথাই নেই। এই বয়সটা তো বাঁধনছাড়া উল্লাসে মত্ত হতে চাইবে। আবার এই সময়ই তাদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বেশ বড় বড় ভাব দেখা যায় তাদের মধ্যে। আশপাশের মানুষজন ছোট হিসেবেও দেখছে না, আবার কেউ পূর্ণবয়স্ক হিসেবে মেনেও নিচ্ছে না। কিন্তু এই বয়সে একটু অন্যরকম হতে চাওয়া, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাকডেটেড বন্ধুদের চেয়েও নিজেকে স্মার্ট ও আপডেটেড প্রমাণিত করার তাগিদে ছেলেদের হাতে আসে গিটার, মাথায় ব্যান্ডানা, থুঁতনিতে সযত্নে বেড়ে উঠা দাড়ি, ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিত্যনতুন কমেন্টের আধিপত্য। আর মেয়েরা সব সময় ব্যস্ত থাকেন নিজের সৌন্দর্য নিয়ে। তাকে কি অন্যদের থেকে সুন্দর লাগছে, সে কি অন্যদের থেকে ভালো কোনো ড্রেস পরতে পেরেছে। এই বয়সে যেন সবাই ছুটে চলেছে এক মোহনীয় রাজত্বে। তার মানে কি বাবা-মা তাদের সন্তানদের একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করবেন না। তারা কি সন্তানরা যা চাই তাই করতে দেবেন। তা নয়, প্রয়োজন সঠিক ব্যালান্সের। নিজেদের পারিবারিক প্রেক্ষাপট, লাইফস্টাইল এবং সন্তানের মানসিকতা অনুযায়ী এমন রাস্তা বেছে নিতে হবে যাতে সব ধরনের সংঘাত এড়িয়ে সন্তানের জীবনকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়।
কী করবেন
প্রতিদিন কাজের ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের জন্য সময় বের করার চেষ্টা করুন। আপনার সঙ্গে সন্তানের মানসিক বন্ধন দৃঢ় করার চেষ্টা করুন। সব সময় বকাঝকা না করে হেসে কথা বলুন এবং ভালোবাসা প্রকাশ করুন। এতে আপনার সন্তান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কে বন্ধুত্বও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সন্তানের সঙ্গে সখ্য বজায় রাখুন। সন্তানের মধ্যে একটা নির্ভরতার জায়গা তৈরি করুন। সন্তানের যেন সব সময় মনে হয় যেকোনো সমস্যা বা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আপনি তার পাশে আছেন। সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দিন। ওরা ছোট হলেও নিজস্ব একটা সত্তা আছে। ওদের ব্যক্তিগত মতামতের মর্যাদা দিন। জীবনের বিভিন্ন পরাজয় সহজভাবে মেনে নিতে শেখান। কাজ যতই কঠিন হোক না কেন চেষ্টা করলে সে সফল হবেই এই আত্মবিশ্বাস গেঁথে দেওয়া দরকার ওর মনের মধ্যে। ছোট-বড় যেকোনো কাজেই সন্তানকে সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দিন। পড়াশোনা থেকে শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় সব ক্ষেত্রেই সঠিক সময় বজায় রাখতে শেখান। ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিন যেমন মিথ্যা কথা না বলা, বড়দের সম্মান করা, কারও ক্ষতি না করা ইত্যাদি। কারণ এই শিক্ষাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যত্ জীবন।
প্রয়োজনে সন্তানকে শাসন করুন। তবে খুব কঠোর হবেন না। পরিষ্কার করে সন্তানের দোষ বুঝিয়ে বলুন। নিজের রাগকে সংযত করুন। ভালো বাবা-মা হয়ে ওঠার পেছনে প্রবলেম শেয়ারিং একটা জোরালো ভূমিকা পালন করে। এতে সন্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। আপনার সন্তানের যে কোনো ভালো কাজের জন্য তাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করুন। সেটা যতই ছোট হোক না কেন। মনে রাখবেন প্রশংসা করা মানে কিন্তু মাথায় তোলা নয়। পরিবারের কারও সম্পর্কে সন্তানের কাছে নিন্দা প্রকাশ করবেন না। বাড়ির সবার ভালোবাসা নেওয়ার মতো স্বভাব তৈরি করে দিন। যেমন দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে আবদারের মধ্যেই ছোটদের শৈশব থাকে। সেটা নষ্ট করবেন না। সন্তানকে সব সময় নিজের অধীনে রাখার চেষ্টা করবেন না। প্রত্যেকের জীবনবোধ আলাদা। দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। বন্ধুর মতো মেশার চেষ্টা করুন। তবে কখনোই ভুলতে দেবেন না যে আপনি অভিভাবক। কখনও সন্তানকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এতে তাকে সামনে এগিয়ে যেতে তো উত্সাহ দেয়ই না বরং ডিপ্রেশন ও কনফিডেন্সের অভাব জাগিয়ে দিতে পারে। কখনও ধৈর্য হারাবেন না। বড়দের থেকে ছোটরা বেশি মুডি হয়। যেমন পড়াশোনার ক্ষেত্রে সন্তান বুঝতে না পারলেও ধৈর্যহারা হবেন না। নিজেদের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলুন। ছোটরা যা দেখে তাই শেখে। তাই নিজের আচরণের প্রতি সজাগ থাকুন। নিজেদের কথা এবং কাজের প্রতি সংযত হোন। সন্তানের সামনে কখনোই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবেন না। এতে সন্তানের ওপর খুবই খারাপ প্রভাব পড়ে। সন্তানের কাছে আপনারা দু’জনই সমান প্রিয়। আপনাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে আপনার সন্তানও ভালো থাকবে। নিজেদের জন্য কিছুটা সময় হলেও বের করুন। নিজেরা তরতাজা থাকলে তবেই সন্তানকে মানুষ করতে উত্সাহ পাবেন। সন্তানের সমস্যাগুলো আরও ভালো করে হ্যান্ডেল করতে পারবেন। যারা বাইরে কাজ করেন তারা সন্তানকে ছোট থেকে বোঝাতে চেষ্টা করুন যে আপনার একটা কাজের জগত্ আছে। সন্তানের দেখাশোনা করা যেমন আপনার দায়িত্ব তেমনি আপনার কাজের ক্ষেত্রেও আপনাকে প্রয়োজন মাফিক সময় দিতে হবে। বাড়িতে আপনি যতটা সময় পাবেন সেটা আপনার পরিবার বিশেষ করে আপনার সন্তানের জন্যই রাখুন। এতে আপনার সন্তান বুঝতে পারবে তার পাশে তার মা সব সময় আছে, তেমনই সে আপনার কাজের জগেকও সম্মান করতে শিখবে।
সন্তানের পড়াশোনা
অনেক বাবা-মা সন্তানের বই পড়া নিয়ে ভাবেন না। কারণ, তারা বুঝতেই পারে না, তাদের পড়ার সময় হয়েছে। তাই আপনার সন্তানের জ্ঞানের ভিত্তিটা শক্ত করার জন্য বইপড়ার অভ্যাসে গড়ে তুলুন। সন্তানের সঙ্গে বই নিয়ে কখন সময় কাটাবেন। কীভাবে আপনার সন্তানকে নিজের মতো করে গড়ে তুলবেন—সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে। আপনার সিদ্ধান্ত নিতে কোনো রকম ভুল যেন না হয়। আপনার দিকনির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে সন্তানের বইপড়ার অভ্যাস। একবার যদি আপনার সন্তান বইপড়ার অভ্যাসের পরিণত হয়, তাহলে আপনার সন্তান দিন দিন যত বড় হবে, ততই সে নিজে থেকে পড়তে চাইবে। চিন্তার শক্তির অনেক পরিবর্তন হবে। দেখবে আপনার সন্তান কোনো খারাপ কাজের থেকে বিরত থাকবে। ভালো কিছুর সঙ্গে থাকবে। কাজেই এমন বই বেছে তাদের হাতে তুলে দিন। তবে তার ছোট হাতে নিতে পারে এমন বই বেছে নিন। আপনার শিশুসন্তান লাইব্রেরিতে যোগ দিতে পারে। যদি থাকে আপনার বাসায় একটা লাইব্রেরি। আপনার সন্তানের জন্য গড়ে তুলতে পারেন ছোট্ট একটা লাইব্রেরি। বই এমন এক সঙ্গী, যা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে। যেভাবে উপহার হিসেবে আপনার সন্তানের ভালোলাগা বই অথবা ম্যাগাজিন উপহার দিন। আপনি মাঝে মাঝে বইয়ের দোকান অথবা লাইব্রেরিতে গিয়ে ছেলে-মেয়ের সঙ্গে গল্পের বই পড়ুন। পরিবার নিয়ে কোথায় ভ্রমণে গেলেন গাড়িতে অবশ্যই বই অথবা ম্যাগাজিন রাখবেন। আপনার বাসাতে রাখতে পারেন বয়স অনুযায়ী তাদের প্রিয় সিরিজ বইগুলো। বইগুলো পড়তে উত্সাহিত করুন। তাহলে তাদের জ্ঞানের পরিধিটা দিনদিন আরও বাড়তে থাকবে। বই নিজে পড়ুন। নিজের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করুন। সন্তানকে পড়তে উত্সাহিত করুন।