প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন :শত দুঃখ নিক্তির ওজনে
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:১৪
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সম্প্রতি টিআইবি একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। রিপোর্টটিতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমালোচনা এসেছে। আমরা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করি—যা কিছু রটে তা কিছু বটে। টিআইবির রিপোর্ট নিয়ে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী খুব হতাশ। মন্ত্রীর মনে হয়েছে টিআইবির এই গবেষণা দেশের সাফল্য, অগ্রগতি চাপা দিয়ে দেশকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। টিআইবির রিপোর্টটি আমলে নিয়ে তিনি তদন্ত করেননি, সময় নেননি; শুধুই হতাশ হয়েছেন। সরকারের ভালো কাজে প্রশংসা করলে খুশি আর সমালোচনা করলে বলা হয়, এই তো আমাদের কাজকে দেশে বিদেশে হেয় করছে। ঢালাওভাবে এভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে অসাধু দুর্নীতিবাজরা স্ব-স্ব জায়গায় আরো প্রশ্রয় পায়।
টিআইবির রিপোর্টটি অগ্রাহ্য হওয়াটা খুব ভালো কাজের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে না। কারণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের মূল্যায়ন খুব একটা ভালো নয়। তাদের পাঠদান এবং শিক্ষাসনদ নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। সম্মানিত পাঠক দয়া করে বলবেন না—গেলো গেলো আমাদের সব অর্জন ভেস্তে গেলো। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশে বিতর্কিত নয়—সারা বিশ্বে প্রায় একইরকম। লন্ডনে অবস্থিত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় একটি কুকুরকে এমবিএ ডিগ্রি দিয়েছে। আমাদের ভাগ্য বরঞ্চ ভালো—আমাদের দেশে এখনো মানুষজনই ডিগ্রি নিচ্ছে। একবার ভেবে দেখুন এইরকম কুকুরকে ডিগ্রি প্রদানের ঘটনা যদি বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটতো এবং সেটির খবর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে লজ্জায় আমাদের মাথা কতোটা হেঁট হয়ে যেতো। লন্ডনের মাথা হেঁট হয় কিনা জানি না তবে আমাদের হয়। অর্থহীন গরিবের মান সম্মানই সম্পদ।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড অনেক সময় আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তিকে খাটো করে দেয়। আমি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই থাকি। ঢাকার আশেপাশে যারা থাকে তারা বাসা থেকে একটু ভোরের দিকে বের হলেই রাস্তায় গার্মেন্টস কর্মীদের ছুটতে দেখবেন। আমিও দেখি। তবে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে থাকায় খুব ভোরে সম্মানিত কয়েকজন অধ্যাপককে দেখি যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ঢাকা যান প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। একদিন এক পরিচিত ছোটভাইকে বললাম, ‘তোমার স্যার এত সকালে কোথায় যায়?’ সে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দিলো, ‘খ্যাপে’। শিক্ষকের পাঠদানের বিষয়টি অত্যন্ত সম্মানজনক বিষয়, কিন্তু সেটি অবজ্ঞার ভাষায় খ্যাপ হয়ে যাচ্ছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তখন নয়মাস ধরে শিক্ষক রাজনীতির কারণে সকল শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ ছিল। অতএব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অর্জনই অর্জন নয়। যাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, ক্যাম্পাস নেই, ল্যাবরেটরি নেই, গবেষণা নেই, তারা পিএইচডি দিচ্ছে এর চেয়ে দুঃখ আর কী থাকতে পারে? সোনা সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু, কিন্তু শৈশবে গ্রামের সোনার গহনা প্রস্তুতকারী এক সোনারুকে দেখেছি কুচ গাছের গোটা দিয়ে সোনার ওজন করছেন। আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘গাছের গোটা দিয়ে সোনা মাপছেন!’ উত্তরে জহুরি স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেছিলেন, ‘এটাই তো সোনার দুঃখ। সোনাকে আগুনে জ্বালাও পোড়াও তাতে সোনার দুঃখ নাই ! তাই তো সোনা দুঃখ করে বলে—নাই দুঃখ জ্বলনে পুড়নে শত দুঃখ নিক্তির ওজনে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়