আঁধার ঘরে চাঁদের আলো

জিপিএ-৫ পেয়েও উচ্চশিক্ষা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা। কারণ দারিদ্র্য তাদের প্রধান অন্তরায়। তারপরও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেন শিক্ষক, চিকিত্সক ও আইনজীবী হওয়ার। সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত বাড়াতে এসব মেধাবী মুখের খবর জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা। দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে বসেছে মুন্নির ডাক্তার হবার স্বপ্ন বাবার স্বপ্ন মেয়ে ডাক্তারি পড়বে কিন্তু বাদসেদেছে দারিদ্র্য। ছোট মেয়ে মুন্নি এবার এইচএসসিতে লৌহজং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। রুহুল আমিন উপজেলা সদরে ছোট্ট একটি দোকানে চা পান বিক্রি করে কোন রকমে সংসার চালান। স্ত্রী তাসলিমা বেগম গৃহিণী। ৪ মেয়ে আর ১ ছেলে নিয়ে তাদের সংসার। বড় মেয়ে রুবি ২০১০ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে ব্র্যাকের সহযোগিতায় ভারতের হায়দারাবাদে ৩ বছর পড়াশোনা করেন। রুবি বর্তমানে ঢাকায় বিবিএ করছেন। মেঝো মেয়ে মেরিন আক্তার ২০১২ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পান। রুহুল আমিনের স্বপ্ন ছোট মেয়ে মুন্নিকে ডাক্তার বানানোর। কিন্তু দারিদ্র্যের কষাঘাত তার পিছু ছাড়ছে না। তাই মেধাবী সন্তানদের নিয়ে বাবা-মায়ের গর্ব থাকলেও শঙ্কিত তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অনিশ্চিত সাধনা রানীর অনেক সময় দু’বেলা খাবার জোটেনি সাধনা রানীর। অনাহারে পায়ে হেঁটে ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কলেজ-যাতায়াত করতো সে। বই না থাকায় সহপাঠিদের বই ধার করে লেখাপড়া করেছে। বাড়িতে বিদ্যুত্ নেই, নেই লেখাপড়ার চেয়ার-টেবিলও। এতো কিছুর পরও অদম্য মেধাবী সাধনা রানী বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর আমরুলবাড়ি মধ্যপাড়া গ্রামে। কিন্তু এত ভাল ফলাফল করেও সাধনা রানীর উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ তার ভ্যানচালক বাবা কৃষ্ণ চন্দ্র রায়ের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার সামর্থ্য নেই। দৈনতাকে জয় করেছে মেধাবী সাজেদুর কোন প্রতিবন্ধকতাই দমাতে পারেনি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইল গ্রামের দিনমজুর বাবার ছেলে সাজেদুর রহমান সেন্টুকে। সে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বনপাড়া ডিগ্রী কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সেন্টুর বাবা জয়নাল আবেদীন পেশায় একজন দিনমজুর। সামান্য উপার্জনে তার সংসার চলে না। তাই ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে মা সেলিনা বেগম অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। না খেয়ে সাজেদুরের কলেজে যেতে হয়েছে বহুদিন। বড় হয়ে সে একজন ব্যাংকার হতে চায়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ কিভাবে চলবে তা জানা নেই তার অভিভাবকদের। ঝিয়ের কাজ করে জিপিএ-৫ পেয়েছে তানিয়া অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া তানিয়া খাতুন অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫। বাবা শুকুর মালিতা ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলার মান্দিয়া গ্রামের একটি রাইচ মিলে শ্রমিকের কাজ করে অতি কষ্টে পরিবারের ভরণ-পোষণ করতেন। কিন্তু অল্প বয়সে ৩ কন্যা সন্তান রেখে তিনি মারা যান। ফলে পিতার অবর্তমানে তানিয়াদের পরিবারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। মা ও মেয়েরা দু’মুঠো ভাতের জন্য অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করে। কিন্তু মেজো মেয়ে তানিয়ার লেখাপড়ার আগ্রহ দেখে তাকে স্কুলে ভর্তি করান মা। মায়ের সঙ্গে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজের পাশাপাশি অনন্য মেধাবী তানিয়া অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিসহ এবারের এইচএসসিতে এত ভাল ফলাফল করলেও অর্থাভাবে তার পক্ষে উচ্চশিক্ষা অর্জন অসম্ভব। তাই সমাজের বিত্তশালী কেউ এগিয়ে আসলে তানিয়ার স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে। উচ্চশিক্ষার আশা ছেড়ে দিয়েছে গৌরনদীর বেলায়েত হোসেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে বেলায়েত হোসেন পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। তবে পরিবারের আর্থিক অনাটনের কারণে তার উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উপজেলার পশ্চিম বাউরগাতি গ্রামের দিনমজুর জানে আলম বেপারীর পুত্র বেলায়েত বাবা মায়ের ৩ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। মাতা বিউটি বেগম গৃহিণী। অন্যের বাড়িতে প্রাইভেট পড়িয়ে বেলায়েত লেখাপড়ার খরচ যোগাতো। কিন্তু আর্থিক অনাটনের কারণে সে উচ্চশিক্ষার আশা ছেড়ে দিয়েছে। বিত্তবান কেউ এগিয়ে আসলে বেলায়েত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবে বলে তার বাবা-মা আশা পোষণ করেন।