অন্যজগত্

রাতের পাহারাদার

রাতের প্রাণী জগত্ কিন্তু মোটেই নিরব নয়। নিশাচর প্রাণী হিসেবে সুখ্যাতি আছে কিছু প্রাণী ও পোকা-মাকড়ের। নিশাচর প্রাণী, সারা রাত জেগে চরাচরে প্রাণীজগতের অস্তিত্ব জানান দেয়। গভীর আঁধারেও রাতের বুকে বাদুরেরা উড়ে বেড়ায়, জোনাকি আলো ছড়ায়, শিয়াল আর পেঁচা শিকার ধরে, র্যাকুন খুঁজে ফেরে খাবার। এসব প্রাণীদের প্রত্যেকেরই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা ওদেরকে রাতের আঁধারেও কাজ করতে সাহায্য করে। তাদের নিয়ে লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম বাদুর পা দিয়ে গাছের ডালে আটকে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিনের বেলা ঘুমিয়ে থাকে বাদুড়। গাঢ় আঁধারে ইকোলোকেশন ব্যবহার করে এরা যেকোনো জিনিসের অস্তিত্ব টের পায়। লক্ষ্যবস্তুর দিকে তীক্ষ শব্দ ছুড়ে দিয়ে ওরা সেটার অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে। তাই অন্ধকারে চলাফেরা করতে মোটেও অসুবিধা হয় না। দিনের আলো বাদুড়ও সহ্য করতে পারে না। তাই এ সময়টা ওরা পুরোনো ভাঙা বাড়িতে, বনের ভেতর গাছের ডালে ঝুলে থেকে বিশ্রাম নেয়। রাত হলেও ওরা চলে যায় নাইট ডিউটিতে, মানে খাবার খুঁজতে। এদের খাবার তালিকায় আছে বিভিন্ন ফলমূল যেমন—আম, লিচু, কলা ইত্যাদি। এসব নিরীহ বাদুর ছাড়াও আরও আছে রক্তচোষা বাদুড় বা ভ্যাম্পায়ার বাদুড়। এই ভ্যাম্পায়ার বাদুরদের পেট ভরাতে চাই তাজা রক্ত। পেঁচা সারা পৃথিবীজুড়ে ১৭০ ধরনের বিভিন্ন প্রজাতির পেঁচা দেখা যায় যাদের অধিকাংশই রাতের বেলা বের হয় শিকারের জন্য। পেঁচাদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ওদের বড় বড় গোল দুটো চোখ। একদম যেন গাড়ির সাদা হেড লাইট। চোখদুটো পেঁচার এতই বড় যে অক্ষিগোলকের মধ্যেও সেগুলো ঢোকে না। মাথা ঘুরিয়ে এরা প্রায় পুরোপুরি পেছনের দিকে তাকাতে পারে। এ কারণেই এক জায়গায় চুপটি করে বসেই ওরা চারদিকে নজর রাখতে পারে। দিনের আলো এই বড় বড় চোখের পেঁচা সইতে পারে না, এ কারণই বেচারা পেঁচা রাতের পাখি খেতাব পেয়ে গেল। চাকতির মতো ওদের মুখমণ্ডলের সুবিধা হলো এর ফলে খুব সূক্ষ্ম শব্দের প্রতিধ্বনিও হয় এদের কানে। পেঁচার শ্রবণশক্তি কিন্তু দুর্দান্ত। অন্ধকারে খসখস নড়াচড়ার শব্দ শুনেই সে বুঝে ফেলতে পারে শিকারের অবস্থান। পেঁচা এক মারাত্মক শিকারি পাখি। বেশির ভাগ পেঁচারই লম্বা ও ধারালো নখর আছে। পাখা দুটো বেশি না দুলিয়েই এরা উড়তে পারে এবং সে কারণেই শব্দ না করে খোলা বাতাসে পাক খেতে পারে অনায়াসে। একবার যখন তার শিকারকে খুঁজে পায় অমনি সে বাঁকানো নখড়ের থাবা নিয়ে নেমে আসে শিকার ধরতে। ওদের খাবারে তেমন কোনো বাছবিচার নেই। ক্ষুদে ইঁদুর, শুঁয়োপোকা, ঢোঁড়া সাপ, ব্যাঙ—সবই আছে তাদের খাবারের তালিকায়। মাকড়শা পৃথিবীতে প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাকড়শা আছে। ক্ষুদে মাকড়শা থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার ওয়েস্টার্ন সামোয়া নামের পাখি ধরে খাওয়া মাকড়শা আছে। ওয়েস্টার্ন সামোয়া পা ছড়িয়ে দাড়ালে বড়সড় একটা ডিনার প্লেটের সমান হতে পারে। এটা সত্যিই যে দিনের বেলাতেও মাকড়শা দেখা যায়, কিন্তু বেশিরভাগ মাকড়শাই অন্ধকার হলে বেরিয়ে পড়তে ভালোবাসে। সাধারণত রাতের বেলাতেই তারা জাল তৈরি করে এবং এর ঠিক মধ্যিখানে গিয়ে বসে থাকে চুপটি করে। কোনো পোকামাকড় সেখান দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় যদি আঠালো জালে আটকা পড়ে অমনি গপ। দিনের বেলা ওরা জালের এক প্রান্তে গিয়ে সামনের পাগুলো গুটিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করে। কোনো পোকা ওই সময় জালে আটকা পড়লে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ফলে সিল্কি জালে ঝাঁকুনি ওঠে। আর তাতেই মাকড়শা বুঝে ফেলে শিকার আটকে গেছে। ওদের পাগুলোয় বিশেষ এক তেলের আস্তর থাকে তাই নিজেদের ফাঁদে মাকড়শা কখনো আটকে যায় না। সব মাকড়শা যে জাল বুনতে পারে তা কিন্তু নয়। উলফ স্পাইডারের মতো কিছু মাকড়শা আছে যারা একবারে চুপটি করে বসে থাকে। একদম নড়াচড়া করে না। শিকার কাছে আসা মাত্রই অতর্কিত আক্রমণে ঘায়েল করে ফেলে। মাকড়শারা খাবারের স্বাদ পা দিয়ে নেয় এবং পুরাতন বাসি খাবারের চেয়ে টাটকা খাবারেই ওদের রুচি বেশি। আমাদের বাসাবাড়ির দেয়ালে সরু পায়ের যে সব মাকড়শা দেখা যায় ওরা তেমন একটা ভয়ঙ্কর না। কারণ ওদের বিষ নেই। ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে যত মাকড়শা আছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিষধর হলো ব্রাজিলিয়ান হান্টসম্যান। কিন্তু এখন এর কামড়ে খুব কম মানুষই মারা যায়। কারণটা খুব সোজা, এর ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা।