ফটোগ্রাফির শুরুর গল্প

আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ সম্পর্কে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের উক্তি দিয়েই শুরু করা ভালো—‘শিল্পকলায় যেমন জয়নুল আবেদীন করেছেন... একটা দেশকে এ ধরনের কোনো শিল্পকলায় যদি জাগ্রত করতে হয় তাহলে কোনো না কোনো লিডার লাগে। সেই ফটোগ্রাফি লিডার যদি কাউকে বলি তাহলে আমি বলব—বেগ সাহেব।’ আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ, বাংলাদেশে আলোকচিত্র আন্দোলনের পথিকৃত্। যিনি এম এ বেগ অথবা বেগ স্যার নামে বেশি পরিচিত, জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের জন্য ২০০৭ সালে তাকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। ১৯৬০ সালে আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফি শিক্ষা কেন্দ্র বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠা করেন। ফটোগ্রাফি উন্নয়নে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অপরিসীম। প্রধানত বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়ন এবং বিকাশ ঘটে এই ইনস্টিটিউট থেকেই। আলোকচিত্র বিষয়ক বই এবং পত্রিকা প্রথম প্রকাশসহ নিয়মিত বিভিন্ন মেয়াদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা আয়োজন করে আসছে এই প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই। প্রবীণ আলোকচিত্র শিল্পী গোলাম কাশেম ড্যাডি ১৯৬২ সালে আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ, গোলাম মুস্তাফা, কফিল আহমেদ, ইউসুফ প্যাটেলকে সাথে নিয়ে ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ক্লাবের প্রথম সভাপতি ইউসুফ প্যাটেল এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম কাশেম ড্যাডি। ১৯৬৪ সালে ইউসুফ প্যাটেল মারা যাওয়ার পর আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগকে সভাপতি করা হয়। বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পে এই ক্লাবের অবদান অনেক। ১৯৭৫ সালে বেগ আর্ট এ বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফির ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী এক সভায় আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির উন্নয়ন এবং বিকাশের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ফটোগ্রাফির সংগঠন করার প্রস্তাব দেন। বেগ আর্টের ছাত্র আলোকচিত্রশিল্পী মো. মাকসুদুল বারি সংগঠনের নাম ‘বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’ প্রস্তাব করেন, যা ওই সভায় গৃহীত হয়। এবং একই সভায় বেগকে বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। ১৯৭৬ সালে প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির ঠিকানায় পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন মেয়াদে আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সভাপতির পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ডা. আনসার উদ্দিন আহমেদ, রশিদ তালুকদার, গোলাম মুস্তাফা, কাজি মিজানুর রহমান, শহিদুল আলম, বিজন সরকার বিভিন্ন সময় সোসাইটির সভাপতি, সহ-সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি এবং বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠাসহ আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ তার ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এবং ক্লাব গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। যার কারণে চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ঢাকা সিনেসিক ক্লাব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, রাজশাহী ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এবং দিনাজপুর ফটোগ্রাফিক সোসাইটি গঠিত হয়। এবং ওইসব ক্লাবকে এক পতাকার নিচে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিকে ফেডারেশনে উন্নীত করেন। যার ফলে বিপিএস আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফিক ফেডারেশনের (FIAP) সদস্যপদ লাভ করে আরো শক্তিশালী হয়। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী আব্দুল মালেক বাবুল, গোলাম মুস্তাফা, বিজন সরকার, শহিদুল আলম, দেবব্রত চৌধুরীকে নিয়ে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট (বিপিআই) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশে আলোকচিত্র আন্দোলনের এ মহান নেতা, আলোকচিত্র বিবর্তনের দ্রষ্টা মৃত্যুবরণ করেন। যদিও বাংলাদেশের অগণিত আলোকচিত্র কারিগরের কর্মচাঞ্চল্যের মাঝে আলোকচিত্র শিল্পীদের জনককে আমরা প্রতিনিয়ত শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করি; প্রতি মুহূর্তে গভীর ভালোবাসায় অনুভব করি।