ফটোগ্রাফি
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৪, ২০:১২
ফটোগ্রাফি একটি সৃজনশীল কাজ। গত মঙ্গলবার ছিল ‘বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস’। ১৮৩৯ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিনটিকে ‘বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ফটোগ্রাফির উন্নতির জন্য যারা নিরলসভাবে কাজ করেছেন বা করছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই দিনটি পালন করা হয়। সেই উদ্দেশ্যে আমাদের এবারের আয়োজনে উঠে এসেছে ফটোগ্রাফি বিভিন্ন শাখার উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকজন ফটোগ্রাফারের ভাবনা এবং ফটোগ্রাফির শুরুর গল্পসহ আরও কিছু। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার,
সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও আহসান রনি
ই ম তি য়া জ আ ল ম বে গ
পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি
১৯৬০ সালে বাংলাদেশে প্রথম ফটোগ্রাফি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন মঞ্জুরুল আলম বেগ। বর্তমানে ‘বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট’ নামে পরিচিত, যা আজও টিকে আছে। তার দ্বিতীয় পুত্র প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার ইমতিয়াজ আলম বেগ বর্তমানে এর দায়িত্বে আছেন। ছোটবেলাতে বাবা মঞ্জুরুল আলম বেগের কাছেই তার ক্যামেরায় হাতেখড়ি, সেখান থেকেই তার ফটোগ্রাফি জীবনের শুরু। ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা ইমতিয়াজের প্রথম স্কুল ছিল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল। অনুপ্রেরণা এবং অনুকরণে বরাবরই সর্ব প্রথম স্থান দিয়েছেন নিজের বাবাকে, যিনি সারাটা জীবন বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়নে উত্সর্গ করেছিলেন। আমাদের দেশে পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির বর্তমান অবস্থা এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে এ নিয়ে আগ্রহ কেমন। এমন প্রশ্নের উত্তরে পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির জনপ্রিয় এই ফটোগ্রাফার বলেন, ‘পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি অনেক শক্তিশালী একটি মাধ্যম। নতুন প্রজন্ম পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি চিন্তিত নয়, সবাই সেলফি নিয়ে ব্যস্ত, তাই বলার কিছু নেই।’
নিজের কাজের জায়গাটি নিয়ে অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ ব্র্যান্ড কালচার দ্বারা প্রভাবিত। এর প্রভাব এবং তার সাথে আমার শহর ও মানুষের আচরণ—এটাই এখন আমার আগ্রহ এবং কাজের জায়গা।’ ইমতিয়াজ ব্যান্ড মিউজিক ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করেছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ডগুলোর সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। বাংলাদেশে ব্যান্ড ফটোগ্রাফি বিকাশের জন্য নিরলস কাজ করে চলছেন তিনি।
নিজের ছাত্রদের কাজে যখন তার শিক্ষার ছাপ পান, তখন নিজেকে সফল ও সার্থক বলে মনে করেন তিনি। ফটোগ্রাফি উন্নয়নে বেগ আর্ট ইনস্টিটিউটের অবদান অপরিসীম। প্রধানত বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়ন এবং বিকাশ ঘটে এই ইনস্টিটিউট থেকেই। আলোকচিত্র বিষয়ক বই এবং পত্রিকা প্রকাশসহ নিয়মিত বিভিন্ন মেয়াদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা আয়োজন করে আসছে এই প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিসহ সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন অঞ্চলে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ও ক্লাব গঠনে এই প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখে। ৫৪ বছরে এ প্রতিষ্ঠান থেকে আলোকচিত্রের পাঠ নিয়েছেন প্রায় ১২ হাজার ছাত্রছাত্রী। বেগ আর্টের ইমতিয়াজ আলম বেগ বলেন, ‘বেগ আর্ট থেকে বাংলাদেশে আলোকচিত্রের যাত্রা। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি আলোকচিত্রের উন্নয়নের জন্য এখনো কাজ করে যাচ্ছে। বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির বয়স এখন ৫০ বছরের ওপরে।’ ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফারদের নিয়ে একটি জাতীয় সম্মেলন করার ইচ্ছা আছে ইমতিয়াজ আলম বেগের।
ই ন্দ্র নী ল কি শো র
ন্যাচার ফটোগ্রাফি
কিশোর মৃধা—আলোকচিত্রের জগতে তিনি সুপরিচিত ইন্দ্রনীল কিশোর নামেই। ১৯৯৫ -এর দিকে একবার সুন্দরবন যাওয়ার সৌভাগ্য হয় তার। আর তাতেই যেন প্রকৃতির প্রেমে পড়ে গেলেন। ক্যামেরায় বন্দী হলো দারুণ সব ছবি, প্রকৃতি যেন ভিন্ন মহিমায় উঠে এল তার ক্যামেরায়। ইন্দ্রনীল কিশোর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করেন, আর সবার মতো তখনই কাজের খোঁজে না বেরিয়ে আলোকচিত্রের টানেই ভর্তি হলেন পাঠশালাতে। সেখানে ফটোসাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেন। তবে এর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি থেকে কোর্স করেন, এমনকি প্রশিক্ষকও ছিলেন সেখানে। বাংলাদেশের খুব কম জায়গাই বোধহয় আছে যেখানে ঘুরে বেড়াননি ইন্দ্রনীল কিশোর। এই ঘুরে বেড়ানোয় তার সঙ্গী একটি বাইক আর ক্যামেরা। পারলে পুরো বিশ্বটাই বুঝি ঘুরে দেখতে চান বাইক আর ক্যামেরা নিয়ে। ২০০৩ সালের দিকে প্রকৃতিপ্রেমী এই আলোকচিত্রী বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপানশন ফোরামে যোগ দেন। আমাদের দেশীয় সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপনে ন্যাচার ফটোগ্রাফির অবদান অনেক। ইন্দ্রনীল কিশোর ২০১০ সালের দিকে বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাবের সদস্য হন। তিনি কোস্টাল বার্ডস সার্ভেতেও যোগ দেন তখন থেকে। এছাড়া গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি অসংখ্য প্রদর্শনী ও কর্মশালাতে অংশ নিয়েছেন। দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও তার আলোকচিত্র নন্দিত হয়েছে। এর বাইরে একজন মুক্ত আলোকচিত্রী হিসেবে সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন সংস্থার হয়ে কাজ করছেন তিনি।। দেশের শীর্ষ প্রায় সব দৈনিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনেই তার আলোকচিত্র প্রকাশিত হয়েছে।
ন্যাচার ফটোগ্রাফির স্বার্থে এর সাথে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ সংস্থাগুলোর সাথে জড়িত তিনি। কাজের প্রয়োজনেই ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। প্রকৃতির টানে তিনি ছুটে গেছেন অনেক দেশে। মূলত তিনি ওয়াইল্ড লাইফ, পাখি আর প্রকৃতিকেই বেছে নিয়েছেন আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু হিসেবে। ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ এবং দৃকের ফটোগ্রাফি বিভাগের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। কাজী হামিদুল হক আর শহীদুল আলমের মতো আলোকচিত্রীর সান্নিধ্যে কাজের সুযোগ হয়েছে তার। ইন্দ্রনীল কিশোর জানালেন, যারা আমাদের দেশে ন্যাচার ফটোগ্রাফি করছেন, তাদের প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়তে হয়। দেখা গেছে দুর্গম অনেক এলাকাতেই পাড়ি জমাতে হয়েছে, যেখানে জনমানব নেই, অথচ স্থানীয় প্রশাসন থেকে সম্মতি বা সহায়তার অভাবে তাদের আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই ন্যাচার ফটোগ্রাফাররা কাজ করছেন, কাজেই সীমান্তবর্তী অথবা দুর্গম এলাকাতে দায়িত্বরত প্রশাসনের উচিত তাদেরকে যথাসম্ভব নির্বিঘ্নে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
ইন্দ্রনীল কিশোর দীর্ঘ বাইক ভ্রমণেও খুব আগ্রহী, সময় পেলেই বেরিয়ে যান বাইক নিয়ে। তার স্বপ্নের পথ ধরে তিনি এগিয়ে যাবেন আর আমরাও নতুন করে দেখব অজানা প্রকৃতিকে তার ক্যামেরায়, সেই আশাবাদ রইল।
প্রী ত রে জা
ওয়েডিং ফটোগ্রাফি
ক্যামেরার লেন্সে ব্যক্তিজীবনের আনন্দের মুহূর্তগুলোকে বন্দী করেন তিনি। নবদম্পতি যখন বিয়ের মঞ্চে নতুন স্বপ্নে বিভোর, সেই স্বপ্নকে তখন চার কোনা ফ্রেমে ধরে রাখেন তিনি। তার নাম প্রীত রেজা, একজন পুরোদস্তুর আলোকচিত্রী, আর বিয়ের ছবি প্রসঙ্গে যার নাম আসে সর্বাগ্রে।
ওয়েডিং ডায়েরি তার গড়ে তোলা আলোকচিত্রের কারখানা বলা যেতে পারে। আমাদের চোখে দেখা সাধারণ দৃশ্যগুলোকে কী এক অসাধারণ রূপই না পেয়ে যায় তার ক্যামেরা! অনেকেই শখের বশে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কিন্তু এই শখটাও হয়ে উঠতে পারে নির্ভরযোগ্য আকর্ষণীয় একটি পেশা—তা এ প্রজন্মকে শিখিয়েছেন ওয়েডিং ডায়েরির চিফ ফটোগ্রাফার এবং দেশের শীর্ষ ওয়েডিং ফটোগ্রাফার প্রীত রেজা।
মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তার। দৃশ্য ধরে রাখার যন্ত্র, অর্থাত্ ভালো মানের ক্যামেরা কেনার সামর্থ্য তখন তাদের ছিল না। হাতের কাছে ইয়াসিকা ব্র্যান্ডের ফিল্মের ক্যামেরা ছিল তখন। সেটা দিয়েই শুরু করেন তিনি। যতই দিন যায় প্রীত রেজার ফটোগ্রাফি নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে। এভাবে ফটোগ্রাফির চিন্তা মাথায় নিয়ে স্কুলের গণ্ডি পার হন। ভর্তি হন কলেজে। সেখানে অনেক ভালো ভালো ফটোগ্রাফারের সাথে পরিচয় হয় তার। জানতে পারেন এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে অনেক টাকার প্রয়োজন, যা তার পক্ষে সে সময় জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। স্বপ্নকে জানাতে হয় বিদায়। কিন্তু মনে মনে তার ফটোগ্রাফিকে ঘিরে ভালোলাগাটা থেকে যায়।
মূলত বন্ধু আর পরিচিতজনদের বিয়ের ছবি তুলতে গিয়েই ওয়েডিং ফটোগ্রাফির শুরু। নবদম্পতির বিশেষ দিনটিতে তাদের স্মৃতির সঙ্গী হতে পারার অনুভূতিটা অন্য রকম। এ কারণে প্রীত রেজার শেখার আগ্রহ ছিল বরাবরই। তাই তিনি সময় করে ভর্তি হয়ে যান পাঠশালায়। সেখানে শেখেন ছবি তোলার সব ব্যাকরণ। সেইসাথে চালিয়ে যেতে থাকেন ওয়েডিং ফটোগ্রাফি। বিয়েবাড়ি মানেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরপুর পরিবেশ। সেইসব মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখতে উত্সাহ-আগ্রহেরও কমতি থাকে না।
জীবনের এই আনন্দময় ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি করে রাখতে ফটোগ্রাফ বা আলোকচিত্রের জুড়ি নেই। বাংলাদেশের ওয়েডিং ফটোগ্রাফির জগতে প্রীত রেজা উজ্জ্বল একটি নাম এখন। বাংলাদেশে প্রথম বড় পরিসরে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন তিনি। প্রীত রেজা ডব্লিউপিপিআই (ইউএসএ), আইএসপিডব্লিউপি, ডব্লিউপিপিএ এবং E+ International-এর সদস্য। মিরর বিজনেস অ্যাওয়ার্ড প্রীত রেজাকে ‘দ্য বেস্ট ওয়েডিং ফটোগ্রাফার ২০১১-১২’ স্বীকৃতি দেয়।
প্রীত বলেন, ‘ফটোগ্রাফি এখন অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি ভালো প্রফেশনও। ওয়েডিং ফটোগ্রাফিতে একটি বিশাল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ রয়েছে। যাদের ইচ্ছা এবং আগ্রহ রয়েছে, তারা যে কেউ প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। বিয়ের ছবির ক্ষেত্রে টাকাকে মুখ্য বিষয় না রেখে বিয়ের মুহূর্তটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক টেকনোলজির সঠিক ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে তরুণ ফটোগ্রাফারদের। ফটোশপ এক্সপার্ট না হয়ে মনোযোগ দিতে হবে ফটোগ্রাফির দিকেও।’
প্রীত মনে করেন, বর্তমানে ফটোগ্রাফিতে খুব ভালো কাজ হচ্ছে। নতুনরা এগিয়ে আসছে। তবে, একা সব বদলে ফেলা সম্ভব নয়। টিম হয়ে কাজ করলে আরও ভালো কাজ করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, আন্তরিকতা ও সততা নিয়ে কাজ করলে সাফল্য অবশ্যই পাওয়া যাবে। আর ফটোগ্রাফির জন্য মূল যে জিনিসটা প্রয়োজন, তা হলো ভালো মনের মানুষ হওয়া।
তা হে র মা নি ক
ফ্যাশন ফটোগ্রাফি
যে এলাকায় থাকতেন সেখানে একটি স্টুডিও ছিল। স্টুডিওতে ছবি তুলতেন বিদ্যুত্ কাকা নামের একজন, যিনি পাড়ার সকলের ছবি তুলে দিতেন। যার ছবি তোলার দরকার ছিল চলে আসত বিদ্যুত্ কাকার কাছে। ছোট্ট মানিক ছবি তোলার যন্ত্রটা দেখে অবাক হতেন। বিদ্যুত্ কাকার সাথে গল্প করতেন এবং ওই যন্ত্র সম্পর্কে জানতে চাইতেন। মানিকের বাবারও খুব শখ ছিল ছবি তোলার। তিনি মাঝে মাঝে ছেলেদের নিয়ে ছবি তুলতেন। তখন ছবি তোলা নিয়ে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হলেও কোনোদিন ভাবেননি তিনি একসময় ফটোগ্রাফার হবেন। বড় হয়ে কাজ শুরু করলেন গ্রাফিক্স ডিজাইনিং নিয়ে। কাজ করতে করতে বুঝতে পারলেন একটি ছবি সঠিকভাবে তুলতে এবং ছবিটিকে সুন্দর করতে পারেন একজন ফটোগ্রাফার। হঠাত্ করেই ক্যামেরা কিনে ফেললেন। ছবি তুলতে শুরু করলেন। কারো কাছ থেকে না শিখে নিজেই চেষ্টা করতেন নিজের ছবিটিকে সুন্দর করার জন্য। একসময় বুঝতে পারলেন একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার হতে হলে একটি স্টুডিও অনেক দরকার। তাই নিজে একটি স্টুডিও দিলেন। বিভিন্ন পত্রিকার লাইফস্টাইল পাতার জন্য ছবি তুলতে থাকলেন। এভাবেই শুরু। একসময় ঠিক করলেন তিনি ফ্যাশন এবং মডেল ফটোগ্রাফি করবেন, কারণ সেই সময়টিতে ফ্যাশন ফটোগ্রাফি ধীরে ধীরে বাংলাদেশে ভালো অবস্থান করে নিচ্ছে। নিজের লক্ষ্যকে ঠিক করে শুরু করলেন বিভিন্ন পত্রিকার লাইফস্টাইলে কাজ করা। এসব পত্রিকায় কাজ করতে করতে বিভিন্ন জনের সাথে পরিচয় হলো এবং তিনি বিভিন্ন কাজ পেতে শুরু করলেন। বাংলাদেশের ফ্যাশন ও মডেল ফটোগ্রাফির জগতে তার নাম অন্যতম। তিনি নিজের শ্রম ও মেধা দ্বারা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি বর্তমানে বিভিন্ন এজেন্সির কাজ, মডেল ফটোগ্রাফি, ফ্যাশন ফটোগ্রাফি করছেন। নিজে তরুণ তারপরও নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, ‘ক্যামেরা থাকলে ক্যামেরাম্যান হওয়া যায় ফটোগ্রাফার হওয়া যায় না। তরুণদের উচিত ফটোগ্রাফার হওয়ার চেষ্টা করা। এর জন্য এই কাজের প্রতি যেমন ডেডিকেশন থাকতে হবে তেমনি কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’ প্রজন্মের অনেকেই কোন বিষয়ে ফটোগ্রাফি করবে তা ঠিক করতে পারে না বা একজন অনেক বিষয়ে ফটোগ্রাফি করতে চায়। ফটোগ্রাফি শুরুর সময়ে ফটোগ্রাফির যেকোনো একটি শাখা নির্দিষ্ট করে কাজ করার পরামর্শ দিলেন মানিক। তিনি মনে করেন মিডিয়ার দরজা হচ্ছে ফটোগ্রাফি, তাই ফটোগ্রাফি পেশা হিসেবে বাংলাদেশে এখন অনেক সম্ভাবনাময়। কিন্তু ফটোগ্রাফি বিষয়টি সাগরের মতো বিশাল। ফটোগ্রাফি শেখা যেমন অনেক কষ্টকর, তেমনি এই পেশায় ভালো অবস্থান তৈরি করাও অনেক পরিশ্রমের ব্যাপার। কিন্তু যারা নিজের কাজকে ভালোবাসবে এবং কঠোর পরিশ্রম করবে তারাই এই পেশায় ভালো করতে পারবে বলে জানলেন দেশসেরা এই মডেল ও ফ্যাশন ফটোগ্রাফার।
না সে র আ বু
প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি
শুরুতে নিজের বাড়ির লোকজন, বন্ধুবান্ধব আর পারিবারিক অনুষ্ঠানের ছবি তুলতেন। একদিন এক পরিচিত জন এসে বললেন তার দোকানের ছবি তুলে দিতে। তিনি সেই ছবি তুলে প্রথম অর্থ আয় করলেন। একসময় দেখলেন ফটোগ্রাফি তার নেশা এবং ফটোগ্রাফি থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে তিনি অনেক ভালো চলতে পারছেন, তাই তিনি ফটোগ্রাফিকেই পেশা হিসেবে নিয়ে নিলেন। কাজ করতে থাকলেন ডেডিকেশনের সাথে। ফ্যাশন বিষয়টিকে তিনি তুলে ধরতে শুরু করলেন তার সৃজনশীলতা দিয়ে, তার তোলা ছবির মাধ্যমে। বাংলাদেশের ফ্যাশন জগতে তিনি নিজেকে স্থাপন করলেন একজন বটবৃক্ষ হিসেবে। দেশের বেশিরভাগ ফ্যাশন হাউসের সব ধরনের ছবি তোলার কাজ তিনিই করেন। দেশের সেরা সেরা মডেলদের ভালো ভালো ছবি তিনিই তুলেছেন। দেশের সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করছেন তিনি। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরেও তিনি অনেকগুলো কাজ করেছেন। তিনি জানালেন, এসব সম্ভব হয়েছে কাজের প্রতি ডেডিকেশন ও ভালোবাসা থাকার কারণে। তার মতে, শিল্পের প্রতিটি ধারা দ্বারাই মানুষ কোনো একটি মেসেজ দিতে চায়। ফটোগ্রাফি দিয়েও প্রকৃত মেসেজ দিতে পারতে হবে। আমি কীভাবে জিনিসটাকে দেখলাম এবং আমি জিনিসটিকে কীভাবে দেখাতে চাই—এই বিষয়গুলো অনেক স্পষ্ট হতে হয় ফটোগ্রাফিতে। ফটোগ্রাফি হলো ছবির মাধ্যমে অন্য যে কারোর সাথে যোগাযোগ করার একটি শৈল্পিক মাধ্যম। ফটোগ্রাফার নিজে কী স্টেটমেন্ট দিতে চাচ্ছে সেটি আগে ঠিক করতে হবে। নিজের তোলা ছবির মাধ্যমে কী দেখাতে চাচ্ছেন, কী বোঝাতে চাচ্ছেন—এই বিষয়গুলো নিজের কাছেই স্পষ্ট হতে হবে। এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন মানুষ কাজটিকে মনে রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি শেখানোর জন্য ভালো কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। ভালো ভালো যারা ফটোগ্রাফার আছেন তারা নানা ধরনের কোর্স করান। যারা সত্যিকারের ফটোগ্রাফি করতে চায় তারা এসব জায়গায় গিয়ে ফটোগ্রাফি শিখতে পারে। বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি অনেক উন্নত হয়েছে, দিনে দিনে আরো উন্নত হচ্ছে বলে জানালেন দেশসেরা এই ফ্যাশন ফটোগ্রাফার। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফাররা তাদের কাজ দ্বারা সারা পৃথিবী থেকে সম্মান বয়ে নিয়ে আসছেন বলে উল্লেখ করলেন তিনি। তবে তার কিছু ক্ষোভের কথাও জানালেন। তার মতে, আজ থেকে তিন চার বছর আগেও ফটোগ্রাফিকে একটি সম্মানের জায়গা থেকে দেখা হতো। ফটোগ্রাফি ছিল আর্ট অব প্র্যাকটিস জাতীয় শিল্পমাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে কিছু নবীন ফটোগ্রাফারের রয়েছে যারা কিছু না শিখেই একটি ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছবি তোলা শুরু করে। তারা কেন ফটোগ্রাফি করে তাই তারা জানে না। বেশিরভাগের লক্ষ্য থাকে মেয়েদের ছবি তোলা এবং ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করা। কিন্তু এসব করার জন্য যে অনেক কিছু শিখতে হয়, জানতে হয় তা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে খুব কম লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ সদস্য ছবি তোলাকে তাদের একটি শখের বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। তারা একটি ক্যামেরা কিনে কোনো কিছু না শিখেই ছবি তোলা শুরু করে। কিন্তু সত্যিকারের ফটোগ্রাফি করতে হলে অবশ্যই নিজের মধ্যে ফটোগ্রাফি বিষয়ে ভালোলাগা থাকতে হবে এবং ফটোগ্রাফিকে নিজের মন থেকে গ্রহণ করতে হবে। তিনি আশা করেন তরুণ প্রজন্ম ফটোগ্রাফি শিখে এবং ফটোগ্রাফিকে নিজের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ফটোগ্রাফি করবে। তিনি জানালেন এই ইন্ডাস্ট্রিতে তারাই ভালো করতে পারে যারা নিজের লক্ষ্যের প্রতি একাগ্র থাকে।