গত দুই বৎসরেরও অধিক সময় ধরিয়া অদৃশ্য শত্রু করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করিতে হইয়াছে সমগ্র বিশ্বকে। করোনার অভিঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি হইয়া পড়িয়াছে বিপর্যস্ত। অর্থনীতির এই আঘাত সামলাইয়া উঠিবার আগেই বিশ্ব মুখোমুখি হইয়াছে আরেক গভীর সংকটের। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি যে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার পথে ধাবিত হইতেছে, তাহা বলাই বাহুল্য। কারণ যুদ্ধ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সমস্যা নহে, উহা সমস্ত বিশ্বের জন্যই সমস্যা হইয়া উঠিবে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করিতেছেন, যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হইবে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করিবে। সামনের দিনগুলিতে কী হইবে তাহা কেহই নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারিতেছেন না; তবে বিশ্ব যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতেছে তাহা অনুমান করিতে পারা যায়। প্রথমে করোনার অভিঘাত এবং তাহার পরপরই ভয়াবহ যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সংকট মিলাইয়া বিশ্বের সামগ্রিক উন্নয়ন, অগ্রগতি স্তব্ধ হইয়া যাইবার আশঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে সকলের মধ্যেই।
বিশ্ব যখন কোনো সংকটের সম্মুখীন হয়, তখন সেই সংকটের অভিঘাত সকলের চাইতে অধিক সামলাইতে হয়, বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিকে। করোনার অভিঘাত এবং বৈশ্বিক যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে এই সকল দেশের অর্থনীতির উপর যে প্রভাব পড়িবে তাহা কাটাইয়া উঠা দুরূহ এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইবে। শিল্প-কলকারখানার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি হইতে শুরু করিয়া জ্বালানি, পরিবহন খরচ ইত্যাদি সকল কিছুরই মূল্য বৃদ্ধি পাইয়া আকাশচুম্বী হইয়াছে; রুশ-ইউক্রেনের সংকট সমগ্র বিশ্বের খাদ্যব্যবস্হাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলিয়া দিয়াছে, যাহার প্রত্যক্ষ প্রভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে ইতিমধ্যেই খাদ্যপণ্যের মূল্য লাগামছাড়া হইয়া উঠিয়াছে। অথচ করোনার সংকট এবং যুদ্ধ-পরিস্থিতি কোনোটাই এই সকল দেশ সৃষ্টি করে নাই, কিন্তু উহার ভুক্তভোগী তাহারা। এই সকল সংকট তো রহিয়াছেই, ইহার সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে বিবদমান দুই পরাশক্তির পক্ষ হইতে যেই সকল দেশের নানাভাবে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়িবার আশঙ্কা রহিয়াছে, তাহাদের সহিত আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি সম্পর্ক থাকিবার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে। এই সকল সমস্যা, সংকট আর প্রতিকূলতার কারণে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য, উত্পাদন, আমদানি-রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে, যাহার ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাইতেছে। অথচ একশ্রেণির মানুষ বলিয়া বেড়াইতেছে যে, কেবল চুরি-দুর্নীতির কারণেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাইতেছে। উহাদের সঙ্গে তাল মিলাইতেছেন সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত মানুষজন। ইহা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক বটে, কারণ দেশে শিক্ষার হার বাড়িতেছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বিদেশ হইতে বড় বড় ডিগ্রি লইয়া আসিতেছেন। তাহারা বৈশ্বিক এই সংকটের গভীরতা অনুধাবন করিতে পারিতেছেন না, ভবিষ্যতে যে আমরা আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইয়া যাইতেছি তাহা স্বীকার করিয়া লইতে চাহিতেছেন না।
বিশ্বের যেই সকল ক্ষমতাবান পরাশক্তি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মাতিয়া উঠিয়াছেন, নিষেধাজ্ঞা আর পালটা নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বকে জর্জরিত করিতেছেন, তাহাদের কর্মকাণ্ড দেখিলে মনে হয়, তাহারা সকল কিছু ধ্বংসের উদ্দেশ্যেই উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছেন; তাহা অবশ্যই সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর জীবনের বিনিময়ে। যুদ্ধ শীঘ্রই থামিয়া যাউক আর না-ই যাউক, যুদ্ধ আর করোনা সকল কিছু মিলাইয়া বিশ্বের ধনী-গরিব সকল দেশেরই দুর্দশা, সংকট দীর্ঘায়িত হইবে। এহেন পরিস্থিতিতে বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের যাহারা নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন, তাহাদের সতর্ক হইতে হইবে। ভবিষ্যতের কথা ভাবিয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায়োরিটি ঠিক করিতে হইবে। প্রয়োজন হইলে বড় বড় যেই সকল ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্প রহিয়াছে, তাহার গতি মম্হর করিয়া বিশেষ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিতে অধিক নজর দিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও বুঝিতে হইবে কঠিন এক সংকটের মধ্যে রহিয়াছি আমরা, সকলকেই কষ্ট স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। বিশেষ পরিকল্পনা ও ব্যবস্হাপনার মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তার সহিত পরিস্থিতি সামলাইতে হইবে।