আমাদের দুঃখ আছে, পক্ষ নাই

বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সজান্ডার মান্টিটস্কি স্বাক্ষরিত এক খোলা চিঠিতে দূতাবাস অসন্তোষ ব্যক্ত করিয়া জানাইয়াছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ-পরিস্হিতি লইয়া বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যম পশ্চিমা গণমাধ্যমের মতো পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষমূলক সংবাদ প্রচার করিতেছে। চিঠিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাশিয়ার সমর্থনের কথাও স্মরণ করাইয়া দেওয়া হয়। খোলা চিঠিতে মান্টিটস্কি বলিয়াছেন, ‘আমরা আশা করি, আমার এই খোলা চিঠির মাধ্যমে আপনাদের পাঠকেরা ইউক্রেন-সংক্রান্ত ঘটনাবলি পশ্চিমাদের দৃষ্টির বাহিরে গিয়া দেখিতে পাইবেন।’

যুদ্ধ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীদের নিকট অনাকাঙ্ক্ষিত। কারণ যে কোনো যুদ্ধেই নিরীহ মানুষকে বিনা যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। তাই আমরা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি আউটলেট হিসাবে দৃঢ়ভাবে বলিতে চাই, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ লইয়া আমাদের দুঃখ আছে; কিন্তু পাক্ষপাতিত্ব নাই। রাশিয়া যে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু সেই কথা অস্বীকার করিবার কোনো কারণ নাই। রাশিয়ার সহিত আমাদের রহিয়াছে ১ বিলিয়ন ডলারের অধিক রপ্তানি বাণিজ্য। ইহার সহিত রাশিয়া বাংলাদেশের প্রথম ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর রূপপুর পরমাণু প্রকল্পে নিয়োজিত দেশ। রুশ সাহিত্য ও ইতিহাস এই দেশে বহুলপঠিত। সেই অর্থে রাশিয়ার সহিত একটি সাংস্কৃতিক সেতুও রহিয়াছে দীর্ঘকাল ধরিয়া। পক্ষান্তরে ইউক্রেন ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির সহিতও বাংলাদেশের রহিয়াছে সুসম্পর্ক। রাশিয়ার মতোই ইউক্রেন হইতে বাংলাদেশে ২ লক্ষাধিক টন গম আমদানি হইয়া থাকে। ইহা ছাড়াও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির সহিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক রহিয়াছে, যাহা এই দেশের গণমাধ্যমের অজানা নহে। সুতরাং যুদ্ধ কেবল দুঃখের বিষয়ই নহে, বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ক্ষতিরও কারণ, সেই সম্পর্কে এই দেশের গণমাধ্যম ওয়াকিবহাল।

সর্বোপরি বাংলাদেশের গণমাধ্যম এই সম্পর্কেও জ্ঞাত রহিয়াছে যে, গণমাধ্যমের কোনো পক্ষ থাকিতে পারে না। তবে এই বাস্তবতা জানিতে হইবে যে, সংবাদের যেই সূত্রগুলি রহিয়াছে তাহার সিংহভাগই পশ্চিমা দেশগুলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশেষ করিয়া, আধুনিক যুগের ইন্টারনেট অ্যাকসেস বাংলাদেশের গণমাধ্যম পাইয়া থাকে যেই সার্চ ইঞ্জিনগুলির মাধ্যমে, তাহা পশ্চিমাদের। পক্ষান্তরে রাশিয়ার একটি প্রেস রিলিজও তো সঠিকভাবে গণমাধ্যমে পৌঁছায় না। অন্য কথা বলিতে গেলে এই দেশের গণমাধ্যম তো আর ইউক্রেন বা ন্যাটোর প্রেস রিলিজ প্রকাশ করে না। যেই সংবাদ ও সংবাদের ছবি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে প্রকাশ পাইতেছে তাহাই দেশবাসীকে জানাইতেছে। এই যে জার্নালিস্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্রেন্ট রেনো নিহত হইল, তাহা কি আমাদের অস্বীকার করিবার উপায় আছে, নাকি তাহা করা উচিত? তবে রাশিয়া ইহা মনে রাখিলে ভালো যে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিতে হইলে সকল ক্ষেত্রে সমান অথবা অধিক শক্তি লইয়া নামিতে হয়। রাশিয়ার উচিত ছিল গুগলের মতো শক্তিশালী ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন সৃষ্টি করিয়া তাহাতে প্রবেশের সুবিধা করা। তাহা হইলেই কেবল আমরা দুই পক্ষের সংবাদ সমানতালে প্রকাশ করিতে পারিতাম। শুধু রাশিয়া কেন, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ তৃতীয় বিশ্ব সম্পর্কে তাহারা যেই সংবাদ শুনাইতে চাহে, আমরা সেই সংবাদ শুনি; যেই সংবাদ সরবরাহ করে, আমরা সেই সংবাদই প্রকাশ করিয়া থাকি। সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম জাতীয় সত্তার বাহিরে নহে। জাতি হিসাবে বাংলাদেশিরা বিশ্বাস করে, সকলের সহিত বন্ধুত্ব, কাহারো সহিত বৈরিতা নহে। সেই বোধ গণমাধ্যমেরও রহিয়াছে। তবে আমরা যে কোনো পথে একটি শান্িত ও আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান চাই। আমরা মনে করি, প্রত্যেকটি দেশেরই স্বাধীন, সার্বভৌম মর্যাদা লইয়া চলিবার অধিকার রহিয়াছে। ইহা রাশিয়া ও ইউক্রেন—সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।